fbpx

জল হাওরের সুনামগঞ্জ: স্মৃতিতে প্রথম ভ্রমণ- ২য় কিস্তি

প্রথমবার যখন সুনামগঞ্জ গেলাম মাঘ মাস ছিলো, মনে হয় শীত নেই কিন্ত  নীরবে হাড়ে কাপন ধরিয়ে দিলো। কুয়াশাজড়ানো সকালে সিলেট থেকে রওনা করলাম সাথে ছিলো আমার প্রথম কর্মস্থলের সহকর্মী বন্ধুবৎসল দাদা সুশান্ত আরিন্দা। ২০১২ সালে হীড বাংলাদেশে  যোগদানের পরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে আমাদের প্রাকৃতিক স্বর্গরাজ্যে অফিস ছিলো। এরকম একটা জায়গা অফিস হিসেবে পাওয়া ছিলো অনেক সৌভাগ্যের। প্রকৃতি কে না পছন্দ করে! তার উপর অফিসের সামনে বিশাল এক টিলায় আনারস বাগান, সামনে দিয়ে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়ক। যার কয়েকশো মিটার পরেই শুরু লাউয়্যাছড়া উদ্যান। এই কমপ্লেক্সের আয়তন ১৬৭ একর। পাহাড়, টিলা, লেক সবমিলিয়ে অন্যরকম এক মাদকতা। থাকতাম অফিসের কোয়ার্টারে।

সুনামগঞ্জ নতুন ব্রিজ থেকে। ছবি: শেখ রাফি

ওনার কাছ থেকেই গল্প শুনতাম কিভাবে কম খরচে ঘুরাঘুরি করা যায়। কক্সবাজার গিয়ে ১৫০ টাকার হোটেলে থাকার গল্প, গাইবান্ধায় গিয়ে বাস কাউন্টারের বেঞ্চেই রাত পার করে দেওয়া কিংবা গণরুমের লজে নানান রকম মানুষের সাথে রাত কাটানো। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির রাতে হীড বাংলাদেশের মতো রোমাঞ্চকর জায়গায় বসে বসে কতো রাতের খাবারের পরেই কেটেছে এমন গল্পে। আমি তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম আর বিস্মিত হতাম। একেকটা গল্প গিয়ে আঘাত করতো আমার নিউরনে। হাজার হাজার আকুলতা কিলবিল করতো আর বলতো আমিতো এরকমই চেয়েছিলাম। এটাই আমার গল্প। আমি যেতে সেইসব প্রান্তে। বিচরিত হতে চাই সেখানে যেখানে আমার অস্তিত্ব কারো অনুভুতির মতিভ্রমের কারণ হবেনা। সেই থেকেই মাথায় ঘুরাঘুরি আর অ্যাডভেঞ্চারের পোকাটা অঙ্কুরিত হলো। তখনো টিওবির নাম আমার জানা হয়নি। ততোদিনে অঙ্কুরটিও চাড়া গাছে পরিনত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে টিওবির সন্ধান পাওয়ার পরে পালে জোরে  বাতাস লেগেছে।

কুয়াশার আস্তর ভেদ করে যাত্রা শুরু, সঙ্গী সুশান্ত দাদা। ছবি: লেখক

সুশান্ত দাদার সাথে ছিলো তাহমিদ আর প্রান্ত ওদের সাথে সাজেক যাওয়ার সময়ে পরিচয় হয়েছিলো। চারজন সিলেটের আম্বরখানা থেকে রওনা দেওয়ার পরপরই  অন্যরকম এক অনুভূতি মনের মধ্যে বোধ করছিলাম। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম, হাসন রাজা, দূর্বিন শাহ, রাধারমণ রায়ের মতো কালজয়ী কবি গীতিকাররা যেখান থেকে উঠে এসেছেন, যে জল বায়ু গ্রহণ করে লিখেছেন কালজয়ী সব গান, কবিতা সেখানেই যাচ্ছি। আমার কাছে গান মানেই লোক সংগীত, জীবনের কথা বলে যে গান। সৃষ্টির সবকিছু কি নিদারুন ভাবে বর্নিত হয়েছে তাদের গানে। কবি গীতিকার হিসেবে তাদের এই কালজয়ী সৃষ্টির পিছনের প্রকৃতির এক বিশাল যোগসাজশে আছে বলেই আমার মনে হয়। সুন্দর প্রকৃতি সহজ সরল জীবনযাপন থেকেই এতো চমৎকার সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তারা। 

আব্দুজ জহুর সেতু যা নতুন ব্রিজ নামে পরিচিত। ছবি: শেখ রাফি

আম্বরখানা থেকে উঠে সিএনজিতে বসে বসেই ভাবছিলাম উপরের কথাগুলো। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে বাসে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। নব্বই টাকা করে টিকেট নিয়ে বাসে এসে উঠলাম। বাস ছাড়তেই ঠাণ্ডার তীব্রতা বাড়তে শুরু করলো। লোকে ঠাসাঠাসি বাস, বসার সিট খুব আঁটোসাটো। তবে স্বস্তি একটাই দাড়ানো যাত্রী নেই, মাঝ রাস্তায় থামাথামি নেই। ঢাকায় যেরকম সিটিং সার্ভিস বলে যাত্রীদের সাথে চিটিংবাজি করা হয় সেরকম পেলাম না। বাসের কন্ডিশন খারাপ হলেও সার্ভিস ফার্স্ট ক্লাস। তবে এখন সরকারি মালিকানাধীন বিআরটিসির আধুনিক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। চালকও বেশ জোড়ে উড়ে উড়ে চালাচ্ছেন। বেশ কয়েকবার কয়েকটা মোড়ে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। দুই ঘণ্টা পরেই আমরা সুনামগঞ্জ নেমে গেলাম।

সুনামগঞ্জ বিরতী বাস। ছবি: লেখক

তখন বাজে সকাল দশটা। কুয়াশাজড়ানো সকাল, রোদের দেখা নেই। চারপাশে শীতের আক্রমণ থেকে বাচার জন্য আবরনে ঢাকা লোকজনের চলাফেরায় ও ধীরগতি। প্রথমেই চায়ের দোকান দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সকালে তারাহুরো করে সিলেটে নাস্তা করলেও চা পানের সময় হয়নি। অপূর্ণ চা পান সম্পন্ন হলো লাউড় রাজ্যে এসে। 

বাস ছাড়ার অপেক্ষায়। ছবি: আসিফ ভাই

বাসস্ট্যান্ডে থেকে উত্তর দিকে তাকালেই প্রশস্ত পাকা সড়ক, দুইপাশে লাল রঙ দেওয়া সীমানা খুটি। চোখ ধাধানো চকচকে এক পথ। লোভ সামলানো দায় এই রাস্তা দেখে। একটু হেঁটে সামনে আসলাম। সোজা রাস্তা চলে গেছে সুনামগঞ্জ শহরে, আর বামের পশ্চিম দিকের রাস্তায় তাকালেই দেখে যায় সুনামগঞ্জের প্রতীক হয়ে যাওয়া আব্দুজ জহুর সেতু বা সুরমা ব্রিজ। হেঁটে হেঁটে ব্রিজ পর্যন্ত যেতে চাইলাম কিন্তু বাধ সাধলো সহযাত্রীরা। ব্রিজের উপর থেকে গাড়ি পাওয়া যাবেনা। তাই এখান থেকেই তাহিরপুরের সিএনজিতে উঠতে হলো। জনপ্রতি ১০০ টাকা ভাড়া। সিএনজিতে উঠেই যেনো হিম শীতল বাতাসের আক্রমণের শিকারে পরিনত হলাম। ঠাণ্ডা আটকানোর যতো চেষ্টা প্রথম থেকেই শুরু হয়ে গেলো। ব্রিজের উপরে উঠে কিছুটা বিরতি নিলাম।

সুনামগঞ্জ নতুন ব্রিজ থেকে। ছবি: শেখ রাফি

ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে কুয়াশায় অস্পষ্টতা স্বত্তেও ওপারের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো হাতে গোনা যাচ্ছে। চালকের তাড়াতাড়িতে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলাম না। মনস্থির করে নিলাম আবার আসবো অফুরন্ত সময় নিয়ে। যখন কেউ তাড়া দিবেনা। ভগ্ন মন নিয়ে সিএনজিতে বসলাম। ত্রিচক্রযান ছুটে চলেছে মাঠে ফুরে বেরিয়ে যাওয়া রাস্তা ধরে। বর্ষায় এই এলাকা অথৈ জলে ছেয়ে যায়। তখন পানির জন্য কিছু দেখা যায়না। এখন বর্ষা কাল না, তাই খাল-নদী ছাড়া পানি নেই। বিশাল বিস্তৃত প্রান্তর মধ্যখানে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, পিচ ঢালা সেই রাস্তায় একটু পরপরই ছোট ছোট সেতু।

বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝখানে রাস্তা। ছবি: লেখক

দুইপাশে যতোদূর চোখ যায় সবুজ সবুজ আর সবুজ। ধান লাগানো হয়ে গেছে, এখন সেই ধান বড় হচ্ছে। কৃষকের যত্নের হাতে লালিত হচ্ছে ছন। এই এলকার প্রধান ফসল ধান। এছাড়া তরমুজসহ অন্যান্য সবজিও হয়। সবুজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে হতে পথ পেরোচ্ছি কিন্তু তাহিরপুরের দেখা নেই। আস্তে আস্তে রোদের রেখা ফুটে উঠেছে এতেই প্রশান্তি। প্রায় দুই ঘণ্টার যাত্রা শেষে তাহিরপুর এসে নামলাম। (চলবে)

ফিচার ফটোঃ শেখ রাফি।

প্রথম পর্ব পড়ুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/tour-information/jol-haorer-sunamgonj-1/

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পড়ুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top