fbpx

লালন সাঁইজির দেশে: জগতি স্টেশন

রবীন্দ্র কুঠি বাড়ির পর্ব শেষে আমাদের অটো আবার ধেয়ে যাচ্ছে মজমপুর মোড়ে। চিড়চিড়ে রোদ পড়েছে ধরণির বুকে, বেপরোয়া মেঘগুলো এখনও সূর্য কে ঢাকতে নতুন করে আয়োজন করছে। এর মধ্যেই চলছে আমাদের যাত্রা। চো চো ক্ষুধা পেটে নিয়ে আবার হাজির হলাম মজমপুর মোড়ে। ইঁদুর সেনাদের না মারলে হচ্ছেই না। সেই সকাল থেকে চরকির মত ঘুড়ছি কাঁধে ব্যাকপ্যাক নিয়ে। দুপুরের খাবার সেড়ে আমুদে আমেজে হোটেলে চেক ইন করলাম। এবার ব্যাগগুলো হোটেলে রেখে খানিকটা রেস্ট নিয়ে বের হলাম।

একি অবস্থা? এ যেন লন্ডনের আবহাওয়া। বের হতেই না হতেই আবার ঝিরিঝিরি বৃষ্টির হানা। এর মাঝেই ঠিক করে ফেললাম জগতি স্টেশন যাবার জন্য অটো। সো সো বেগে ছুটে চলছে অটো আমাদের নিয়ে। এই চলার পথেই না হয় শুনি বাংলাদেশের প্রথম রেল স্টেশনের ইতিহাস।

কোন রৌদ্রজ্জ্বল দিনে তোলা জগতির স্মৃতি। ছবি: লেখক

স্টিম ইঞ্জিন রেলের যাত্রা শুরু হয় জর্জ স্টিফেনসনের হাত ধরে। তিনি ১৮২৫ সালের ২৭ই সেপ্টেম্বর লোকোমোশন নামের স্টিম ইঞ্জিনের আবিষ্কৃত প্রথম ট্রেন নিয়ে ব্রিটেনের স্টকটন থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরের ডালিংটন পর্যন্ত গিয়েছিলেন। বিশ্ববাসি সাক্ষী হয় এক নতুন ইতিহাসের। আর এই ইতিহাসের অংশ হতেই যেন স্টিফেনসন চালকের আসনে নিজেই চড়ে বসলেন। উঠে গেল এই কিংবদন্তির নাম ইতিহাসের পাতায়। বিশ্বজুড়ে রেলপথের গুরত্ব বাড়তে শুরু করে তখন থেকেই।

সেই যুগের হাওয়া ব্রিটিশদের হাত ধরে এসে পড়ে ভারতীয় উপমহাদেশে। রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে বিবেচনার রেখে ব্রিটিশ রাজ ভারতীয় উপমহাদেশে রেলপথ স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করে। তার ফলপ্রসুতে ১৮৪৩ সালে ভারত উপমহাদেশে রেল সম্প্রসারণের কাজের জন্য আসেন ব্রিটিশ রেল ইঞ্জিনিয়ার রোনাল্ড ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনসন। তার একান্ত তত্ত্বাবধায়নে ১৮৪৪ সালে রেললাইন নির্মাণের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি গঠন করা হয়৷ এই কোম্পানির অধীনে ১৮৫৪ সালে হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৮ কিলোমিটার রেল লাইন চালু করে ব্রিটিশ সরকার।

জগতির সেই রেল মাস্টারের ভবন। ছবি: লেখক

এরপর ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে রাণাঘাট পর্যন্ত রেলপথ চালু করে ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি। পরবর্তীতে সেই একই বছর ১৫ নভেম্বর কুষ্টিয়া জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইনের শাখা নির্মাণ করা হয়৷ ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাণাঘাট থেকে জগতি পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথটি চালু হয়৷ আর এম স্টিফেনসনের এই অসামান্য অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে।

এর প্রায় ১০ বছর পর ঢাকার সাথে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করার জন্য ১৮৭১ সালের পহেলা জানুয়ারি জগতি রেলস্টেশন থেকে বর্তমান রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত ট্রেন চালু করা হয়। কলকাতা শহরের মানুষ ট্রেন করে তখন এসে পড়তো সরাসরি গোয়ালন্দ ঘাট। কলকাতা থেকে অনেক ব্যবসায়ী এসে ভিড় জমাতো গোয়ালন্দ ঘাটে। রাজবাড়ির গোয়ালন্দ ঘাট ছিল তখন জমজমাট। আর সেই গোয়ালন্দ ঘাটেই ভিড়তো ঢাকার স্টিমার। পদ্মা পাড়ি দিয়ে স্টিমার চলে আসতো ঢাকার সদরঘাট।

গামছা কাঁধে ঝাকড়া চুলের অপু জগতির সাথে চলে তার লেনদেন। ছবি: লেখক

আমরা অন্য কোন টাইম জোন ঘুরে আবার বাস্তবে ফিরে এলাম। অটো আমাদের একেবারে জগতি স্টেশনের সামনে নামিয়ে দিল। দূর থেকে দেখছি জগতি স্টেশন। ভাবা যায় দেড়শ বছরের পুরনো এই রেলওয়ে ট্রাক দিয়ে এককালে চলতো কলকাতার ট্রেন। এখন সবই কালের সাক্ষী। রেল লাইনের পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, বৃষ্টি ভেজা এক সোদা মাটির গন্ধ আমায় গ্রাস করে।

একটু এগিয়ে উঠে পড়লাম জগতি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। সামনে দেখতে পেলাম সাদা ফলকে বড় করে লেখা জগতি স্টেশন। ঐ তো দেখা যাচ্ছে রেল মাস্টারের ইট রঙের দ্বিতল লাল ভবনটি। সময় যেন থমকে দাঁড়ালো। লাল ভবনটির দোতলার ছাদে বাসা বেঁধেছে আগাছা, ফাটল ধরেছে পরতে পরতে। তবুও টিকে থাকুক বাংলাদেশের প্রথম রেলওয়ে স্টেশন। পরিত্যক্ত এই ভবনের দোতলায় মানুষের পদধূলি পড়েনি বহু বছর। যাত্রীদের জন্য তৈরি করা সেই অপেক্ষা ঘর ভেঙে গেছে বহু বছর হল। এ যেন এক ভূতুড়ে স্টেশন।

মেঘলা দিনে ভেজা রেল লাইন। ছবি: লেখক

এখানে থামে না কোন ট্রেন। নীরব খুবই নীরব তুমি জগতি স্টেশন। যেন মহাকালের এক বুক হাহাকার তোমার বুকে বয়ে বেড়াচ্ছো। নেই লোকজনের হাঁক-ডাক, বাঁশি বাজিয়ে ট্রেনের আসা-যাওয়া, কুলিদের হৈ চৈ। নেই তোমার জৌলুস। আজ সবই স্মৃতি, সবই স্মৃতি। সন্ধ্যার পর কি এখানে আদি পুরুষদের আত্মার হাট বসে। আসে কি ঝক মকিয়ে স্টিম ইঞ্জিনের সেই ট্রেন। জর্জ স্টিফেনসন তার লোকোমোশন নিয়ে কি আবার ফিরে আসবেন এই জগতি বুকে। কয়লা পুড়িয়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে কুই ঝিক ঝিক শব্দে আবার কি চলবে ট্রেন?

শাটল, লোকাল ট্রেনের ধাক্কা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে জগতি স্টেশন। কালের কষাঘাতে ঐতিহ্যমণ্ডিত রেল স্টেশনটির রূপ জৌলুস কোথায় হারিয়ে গেছে। তবুও যে এখানে থামে ট্রেন, রেখে জীবনের সব লেনদেন। এখন শুধু স্টপেজ রয়েছে খুলনা থেকে গোয়ালন্দ ঘাটগামী মেইল ট্রেন নক্সিকাঁথা এক্সপ্রেস আর পোড়াদহ থেকে গোয়ালন্দ ঘাট চলাচলকারী শাঁটল ট্রেনের।

প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে অপুর সংসার। ছবি: লেখক

এই দুটি ট্রেনের খুবই অল্প সংখ্যক যাত্রী এই ভূতুড়ে স্টেশন থেকে উঠানামা করে। শুধুমাত্র ট্রেন আসার আগের মুহূর্তে খুলে যায়  স্টেশন মাস্টারে ঘর। আবার ট্রেন চলে যাবার পর মুহূর্তেই জাদুবলে গায়েব হয়ে যায় সব। যেন কর্মকর্তারা অভিশপ্ত আত্মার মত ঝুলে আছে এই জগতি স্টেশনে।

ওয়াফি আর আপুর উত্তেজিত ডাকে ঘোর আমার কাটলো। ওরা ট্রেনের কথা বলছিল। আরে ঐ তো দেখা যাচ্ছে ধুকে ধুকে আসছে মেইল ট্রেন। চারপাশে হঠাৎ করে যাত্রীর সমাগম দেখা গেল। যেন মৃত্যুকূপ থেকে উঠে এসেছে তার। ঐ তো ফেরিয়ালা তার জাদুর ঝাপি নিয়ে ট্রেনের ভিতর হারিয়ে যাচ্ছে। খুলে গেছে রেল মাস্টারে ঘর। জেগে উঠেছে জগতি।

ট্রেন থামে এই ভূতুড়ে স্টেশনে। ছবি: লেখক

চলে গেল ট্রেন। বিষণ্ণতার শত বছরে ডুবিয়ে দিয়ে গেল আবার। ১৫৭ বছরের গ্লানি টানতে টানতে প্লাটফর্মের ইটও ভেঙে গেছে, ক্ষয়ে গেছে গাঁথুনি। স্টেশন মাস্টার ঘর এখনও খোলা। ঘরে উঁকি দিয়ে দেখতে পেলাম ঘুনে খাওয়া সময়ের স্মৃতি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আসবাবপত্র, অকেজো টেলিফোন, টাকা রাখার লকার। ভূতুড়ে রেল মাস্টার অফিস বন্ধ না করেই গায়েব হয়ে গেছে। অবশ্য এখানে চুরি করার মত কিছুই নেই।

এক সময় মোহিনী মিল, কুষ্টিয়া চিনি কলের জন্য ভিড় জমাতো এখানে কলকাতা থেকে আসা ব্যবসায়িরা। জম জমাট ছিল জগতি স্টেশন। আজ সবই স্মৃতির ধূসর দিগন্তে হারিয়ে গেছে। যেতে নাহি চাই, তবু চলে যেতে হয়। বিদায় জগতি। ফিরে আসবো হয়তো কোন দিন আবার এই ভূতুড়ে স্টেশনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top