fbpx

লালন সাঁইজির দেশে: রবীন্দ্র কুঠি বাড়ি

জমিদারি পরিচালনা সূত্রে এসে রবি ঠাকুর এই শিলাইদহের মাটি, বাউলিয়ানা ও লালনের আধ্যাত্মিকতায় মিশে গিয়েছিলেন ওতপ্রোত ভাবে। তাই তো এই মাটির গন্ধে মিশে আছে রবি ঠাকুরের স্মৃতি। বিশ্বকবির জীবনে লালন সাঁইজির ছিল বিশেষ প্রভাব। তিনি যখন প্রথম এই শিলাইদহে আসেন তখনও লালন ফকির জীবিত ছিলেন। এক দীর্ঘ আয়ুকাল পেয়েছিলেন লালন সাঁই।

লালনের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়েছিল কি না তা নিয়ে নানা গবেষকের নানা মত ছিল। তবে লালনের দর্শণের সাথে রবি ঠাকুরের পরিচয় হয়েছিল। রবি ঠাকুরও লালনের মত খুঁজে বেড়াতেন মনের মানুষকে। রবীন্দ্রমানসে বাউল প্রভাবের মূলে রয়েছে তার ব্যক্তিগত লালনচর্চা ও লালন শীষ্য সম্প্রদায়ের সাহচর্য।

ছিন্নপত্র। ছবি: লেখক

আজকে বৃষ্টি আর থামবে না। সাথে ছাতা এনেছি। তাই রবীন্দ্র ভুবনে প্রবেশের আগে নিয়ে নেই প্রস্তুতি। গায়ের গেঞ্জি খুলে পাঞ্জাবি আর রুদ্রাক্ষের মালা পড়ে নিলাম। অন্তরে ধারন করলাম দুই কৃতি পুরুষ ধ্যান ধারনা। বৃষ্টির ছটা থেকে ছাতা দিয়েও রক্ষা পাবার উপায় নেই। কুঠি বাড়ির দুয়ারে এসে দেখতে পেলাম দুই বছর আগে ফেলে যাওয়া সেই স্মৃতি। সেই লাল রংয়ের দুই তলা বাড়ি আগের মতই আছে। শুধু ঋতু পরিবর্তন হয়ে গেছে।

টিকেট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম। কুঠিবাড়ি ভবনটি একটি বেষ্টনী প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি সাধারণ অথচ আকর্ষণীয় প্রবেশ তোরণ পেরিয়ে এতে প্রবেশ করা যায়। আবার হল দেখা গুরুদেব তোমার সাথে। কুঠিবাড়ির সেই আম, কাঁঠাল ও চির সবুজ বৃক্ষের বাগান সে তো সব আগের মতই আছে। বদলে যায়নি সেই পুষ্পোদ্যানের পুষ্পের ঘ্রাণ। সে পুকুরেও পদ্ম বোট আছে। শুধু নেই গুরুদেব। বৃষ্টির ছটা গায়ে নিয়ে পুরো আঙ্গন এক চক্কর ঘুরে নিলাম। এবার প্রবেশ করলাম কুঠিবাড়ির ভিতরে।

কাজী নজরুল ইসলামকে লেখা চিঠি। ছবি: লেখক

এ বাড়ির নিচতলা ও দোতলায় বিশাল কেন্দ্রীয় হলসহ এতে বিভিন্ন আকারের মোট ১৬টি কক্ষ রয়েছে। দ্বিতল এই ভবনের উন্মুক্ত ব্যালকনি সমূহ রানীগঞ্জ টালি দিয়ে তৈরি ঢালু ছাদ দ্বারা আংশিক আচ্ছাদিত। দোতলার পিরামিড আকৃতির ছাদ ভবনটিকে দিয়েছে নান্দনিক বৈচিত্র। পুরো ভবনই এখন জাদুঘর হিসাবে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত। আমরা তিন সহযাত্রী রবীন্দ্র ভুবনে প্রবেশ করলাম।

জাদুঘরের নিচ ও দোতলা জুড়ে জড়িয়ে আছে কবি গুরুর নানান বয়সের, নানান ভঙ্গিমার ছবি। মৃণালিনি দেবীর সাথে কবির অন্তরঙ্গ মূর্হুতের পারিবারিক ছবিগুলোও যেন সুখী পরিবারের কথা বলে। কিন্তু অদ্য সুখী কি ছিল কবি গুরুর পারিবারিক জীবন। বাল্যকাল থেকে মৃত্যশয্যা পর্যন্ত ছবি সংরক্ষিত আছে এখানে। আরও আছে গুরুদেবের নিজ হাতে আকা শিল্প কর্ম। এতক্ষণ পর ভ্রমণসঙ্গীদের সত্যিকার অর্থে রবীন্দ্র ভুবনে ডুবতে দেখলাম। আগের বার ভদ্রতা দেখালেও এবার তার ছিটেফোঁটাও দেখলাম না। রবীন্দ্রনাথের বাউলের ভুষার একটি পোট্রেটের সাথে আমরাও তুলে নিলা, সৃজনশীল ছবি। এই জাদুঘের বিশ্বকবির ব্যবহার্য জিনিষের মধ্যে আরো আছে চঞ্চলা ও চপলা নামের দুটো স্পিডবোট, পল্টুন, ৮ বেহালা পালকি, কাঠের চেয়ার, টি টেবিল, সোফাসেট, আরাম চেয়ার, পালংক ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস ।

রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা ইংরেজি চিঠি। ছবি: ওয়াফি

এখানে পরতে পরতে রবীন্দ্রনাথ, পরশে পরশে তার সগৌরব উপস্থিতির জানান দিচ্ছে। আমরা এখন কুঠিবাড়ি দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছি। রবীন্দ্রনাথ এখানে এসেছিলেন। দক্ষিণা বাতাস বইছে। চারদিকে বর্ষার মাতালি হাওয়া। এখন মুষলধারা বৃষ্টি পড়ছে ধরণিতে। আর আমরা ডুবে আছি গুরুদেবের ভুবনে। এতো অন্য রকম রোমান্টিসিজম। দূরে নারিকেল গাছ গুলো যেন প্রহরী হয়ে পাহাড়া দিচ্ছে কুঠি বাড়ি। তারই মাঝে গুণগুণিয়ে উঠি রবি ঠাকুরের পদ্যের দুয়েক লাইন।

এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,
গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা।।
দুলিছে পবনে সনসন বনবীথিকা,
গীতময় তরুলতিকা।’

বাউল কবিগুরুর সঙ্গে মোরা। ছবি: লেখক

বর্ষা এসেছে আমার দুয়ারে অমোঘ প্রেমের বাণি নিয়ে। তখনও আমার মস্তিকে ছোট্ট পরী সিন্দাবাদের ভূতের মত চেপে বসেনি। এই বর্ষা ছিল প্রেমহীন এক যুবকের বর্ষা। এই বর্ষা ছিল তাকে অনুভব করার বর্ষা। এই বর্ষায় যেমন আনন্দ ছিল, তেমনেই ছিল বিরহের আত্মকথন। বৃষ্টির দিনেই বুঝি প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি হৃদয়ে কড়া নাড়ে। যত্মে রাখি তাকে মনের দরবারে। তাই কি কবি গুরু বলে গিয়েছেন –

‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে
দুয়ার কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে,
ঘরের বাঁধন যায় বুঝি আজ টুটে।।
ধরিত্রী তাঁর অঙ্গনেতে
নাচের তালে ওঠেন মেতে,
চঞ্চল তাঁর অঞ্চল যায় লুটে।।’

কুঠিবাড়ির বারন্দা থেকে দেখি প্রকৃতি। ছবি: লেখক

এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘন ঘোর বরষায়… কিন্ত কারে বলা যায় আর কী ই বা বলা যায়, তাতো কেউ বলে দেয়না। এবার না হয় আবার ডুবা যাক ইতিহাসে। এ কুঠিবাড়ির ব্যালকনিতে বসেই রচিত হয়েছে কত গদ্য কত কাব্য। সাক্ষী ছিল পুকুরে পাড়ে তরী ভিড়ানো সেই পদ্মা বোট। গসোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, কথা ও কাহিনী, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য ও খেয়ার  অধিকাংশ কবিতা, পদ্মাপর্বের গল্প, নাটক, উপন্যাস, পত্রাবলী এবং  গীতাঞ্জলি ও গীতিমাল্যের গানের মত অনবদ্য সৃষ্টি এই বাড়ির আঙ্গিনায় বসেই রচিত হয়।

বিদায় কুঠিবাড়ি। ছবি: লেখক

এখানে বসেই গুরুদেব গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের কাজ শুরু করেন। যা তাকে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরষ্কারের সম্মান এনে দেয়। শিলাইদহ ও পদ্মার প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছিল গভীর অনুরাগ, ছিন্নপত্রাবলীতে এর পরিচয় আছে। কবি একটি চিঠিতে লিখেছেন: ‘আমার যৌবন ও প্রৌঢ় বয়সের সাহিত্যরস-সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মা-প্রবাহচুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে।’

ইতিহাসের পাতা থেকে বাস্তবে ফেরার পালা। দেখতে দেখতে থেমে গেল বৃষ্টি। এবার যেতে হয় রবীন্দ্র ভুবন ছেড়ে। তবে এ যাওয়া শেষ যাওয়া নয়। আবার আসিবো ফিরে এই রবীন্দ্র ভুবনে।

ফিচার ইমেজ: ওয়াফি

One thought on “লালন সাঁইজির দেশে: রবীন্দ্র কুঠি বাড়ি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top