fbpx

লালন সাঁইজির দেশে: কুঠিবাড়ির পথে

দাঁড়িয়ে আছি আমরা মজমপুর মোড়ে। রবীন্দ্র কুঠি বাড়ি যাবার জন্য দাম দস্তুর শুরু করলাম। আকাশচুম্বি ভাড়া শুনে মেজাজটা খিচড়ে ছিল। রবার্ট ব্রুসের মত ধৈর্য্য ধরে বসে আছি। তার ফলও পেলাম হাতেনাতে। রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি যাবার জন্য ব্যাটারি অটো গাড়ি পেয়ে গেলাম। এবার শুধু ছুটে চলা। আজকে বৃষ্টি আর মেঘপুঞ্জি আমাদের সাথে যেন আপন খেয়ালে ছুটছে। কখন আসে কখন যায় তার নেই কোন ঠিক। অটো দেখতে দেখতে গড়াই ব্রিজের এসে পড়লো। যেখানে ২০১১ বিশ্বকাপের একটি বিজ্ঞাপণের শুট্যিং হয়েছিল। একজন সাধু এই গড়াই নদীর পাড়ে ধ্যানে বসে ছিল।

যাত্রা পথে খানিকটা বিরতি খুব ক্ষতি কি হবে। উপভোগ করা যাক না হয় গড়াই ব্রিজের সৌন্দর্য্য। ফারাক্কা বাঁধের কড়াল গ্রাসে গড়াই শুধু ভরা বর্ষায় তার যৌবনের রূপ দেখায়। আর সারা বছর গড়াইয়ের বুকে থাকে ধূ ধূ বালুচর। এই তো সেই গড়াই আর পাশে রেলসেতু। অটো থেকে নেমে তুলে নিলাম কিছু সেলফি। এবার আবার পথের চলা শুরু।

গড়াই ব্রিজ কুঠি বাড়ি যাবার পথেই পড়ে। ছবি: লেখক

আমার এই পথেই আছে মায়া
সেই পথেই পড়ে পাগলা দাশুর ছায়া;
ও দিদি কোথায় যাবি,
আমায় একটা চুমু দিবি
আমি যে তোর পাগলা দাশু, সেই ছোট্ট বাবু
ডাকিস না তো আর হাবু।

আমি পথে ঘুরে ধূলো কুড়াই
সবাই কে মায়ার চাঁদরে জড়াই;
একদিন লোকালয় ছেড়ে চলে যাব দূরে,
ডাকবি আমায় পাগলা দাশু কোথায় গেলরে
পায়ের নিচে সর্ষে বিশ্ব দেখবো আমি
যাযাবর, পরিব্রাজক আর কি বলবে তুমি?

দেখতে দেখতে যেন চলে এলাম শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির প্রাঙ্গনে। আবার ঝুম করে বৃষ্টি শুরু হল। আজ মনে হয় সারা দিন ভর বৃষ্টি চলবে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতেই দৌড় দিলাম কুঠিবাড়ি লাগোয়া ডাকবাংলোর দিকে। অল্প ভিজে গেলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হল। ডাক বাংলোর বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে কুষ্টিয়া বিখ্যাত কুলফি মালাই বিক্রেতারা। জিভে জল আসা কুলফি মালাই নিয়ে তারা রবীন্দ্র কুঠি বাড়ির দুয়ারেই বসতো। বৃষ্টি তাদেরকেও এখানে আসতে বাধ্য করেছে। খাঁটি দুধের কুলফি মালাই কি মিস করা যায়। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। কুলফি মালাইয়ের রসে ডুবেই না হয় শুনাই কুঠিবাড়ির ইতিহাস। 

বৃষ্টির জলে ভেজা কুঠিবাড়ি। ছবি: লেখক

আজকের আধুনিক শিলাইদহ পূর্বে খোরশেদপুর নামে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় এ গ্রামে পদধূলি পড়ে জোড়াসাকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের। সে সময় ঠাকুর পরিবার ছিল অনেক বিত্তশালী। তারা কিনে নেয় পুরো গ্রাম। তারা এই গ্রাম কেনার পূর্বে এই গ্রামে বাস ছিল শেলী নামক এক নীলকর ব্যবসায়ির। সেই এই গ্রামেই নির্মাণ করেছিল একটি নীল কুঠি। আবার গড়াই ও পদ্মা নদীর মিলিত প্রবাহের ফলে সৃষ্ট গভীর একটি ঘূর্ণিস্রোত বা দহ থেকে গ্রামের নামকরণ হয়েছিল শেলী-দহ। কালক্রমে লোকমুখে বির্বতিত হয় তাহা শিলাইদহ-এ পরিণত হয়। 

এই সেই রবি ঠাকুরের বিখ্যাত পদ্ম বোট। ছবি: লেখক

রামলোচন ঠাকুরের উইল অনুসারে ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে রবি ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এ জমিদারির মালিক হন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই জমিদারির দেখাশোনার দ্বায়িত্ব নিয়ে প্রথম শিলাইদহের মাটিতে পা রাখেন ১৮৮৯ সালের নভেম্বর মাসে। এরপর ১৮৯১ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে অনিয়মিত বিরতিতে এই শিলাইদহের মাটির গন্ধ নিতে আসতেন বিশ্বকবি। এই মাটির গন্ধ নিবেন না কেন। তার যে ছিল সখা গগণ হরকরা। গগন হরকরা আনুমানিক ১৮৪৫ খ্রিঃ শিলাইদহের কসবা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যে বাউলের গানে মিশে আছে আমার সোনার বাংলা। রবীন্দ্রনাথের ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’ ও ‘আমার সোনার বাংলা’ গান দুটি, গগন হরকরার যথাক্রমে ‘ও মন অসাড় মায়ায় ভুলে রবে’ ও ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গান দুটির সুর ভেঙে রচিত হয়।

অন্ধ বাউল মজমা বসায় এই প্রাঙ্গনে। ছবি: লেখক

‘আমি কোথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে।।
হারায় সেই মানুষে তার উদ্দেশ্যে
দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে।।’

রবি ঠাকুরের সেই প্রিয় গগণ যে কাজ করতো শিলাইদহ ডাকঘরে। চিঠি বিলি করতো মানুষের ঠিকানায়। অথচ লালনের এই ভাবশিষ্যের নিজের আপন কোন ঠিকানা ছিল না। বিভিন্ন বাউল গানের আসরে গান গাইতেন গগণ হরকরা। প্রকৃতির রূপ ও রসে ডুবে থাকা এ রকম সাধক পুরুষ কোথায় পাবে? আর গগণের গানের একনিষ্ট ভক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। ছবি: লেখক

একদা কবি তার প্রিয় বজরা ছাদে বসে পদ্মার নৈঃস্বর্গিক সৌন্দর্য্যে ডুবে ছিলেন। এমন সময় দূরে কোথা থেকে গুণগুণিয়ে ভেসে আসে কোন বাউল সঙ্গীত। সে গান শুনে কবি মুগ্ধ শ্রোতার মত শুনতে থাকেন। কাছে আসলে দেখতে পান পোস্ট অফিসের এক ডাক হরকরা চিঠির থলে কাঁধে নিয়ে আপন মনে গান করতে করতে পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। গুণি চিনে গুণিন। ডাক পড়লো সেই হরকরার। কবি জানতে চাইলেন তার পরিচয়। সে আর কেউ নয় গগণচন্দ্র দাম। চিঠি বিলিয়ে গ্রামের মানুষের কাছে তার নাম হয়ে গিয়েছিল গগণ হরকরা।

সেই বাউলিয়ানার সুরে এমন ভাবে ডুবলেন বিশ্বকবি শিলাইদহ আসলেই ডাক পড়তো গগণের। সন্ধ্যার পর তার পদ্ম বোটের ছাদে অথবা কুঠিবাড়িতে জমতো বাউল গানের জলসা। সেই বন্ধুর বন্ধুত্বের দাম রাখতেই কি আমার সোনার বাংলায় ধার করলেন গগণের সুর। জাতীয় সঙ্গীতের রচিয়তার কথা সবাই বলে কিন্তু একজন গগণ হরকরাকে কয়জন চিনে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top