fbpx

লালন সাঁইজির দেশে: রেনউইক বাঁধ

ছুটে চলার মাঝে কেন জানি জীবনের ছন্দ পাওয়া যায়। ভ্যানে বসে অপুর সংসারের বিস্তারিত গল্প শুনছি সাথে ওয়াফি আহমেদ ও বলছে তার দুঃখের আত্মকহন। কিন্তু কথাবার্তা কখন যে আধ্যাত্মিক লেভেলে চলে গেল সে লাগাম কি ধরা যায়। চলে এলাম এবার রেনউইক যজ্ঞেশ্বর কোংয়ের দুয়ারে।

এত সকাল বেলাও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল। এইটা এখন পাবলিক প্রপার্টি নয়। দর্শনার্থিদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে দুয়ার খুলে দেওয়া হয়। সকালে মর্নিং ওয়াক করতে অনেকেই ভিতরে ঢুকছে। তবে আমাদের কাঁধে ব্যাগ দেখে মৃদু সন্দেহের উদয় হতেই পারে। ঢাকাবাসি শুনে হালকা কেশে, মৃদু হেসে ছেড়ে দিল আমাদের। এবার শুধু হেঁটে চলা পুরান গন্তব্যে।

রেনউইকের যাবার পথে এভাবেই বৃক্ষ ছায়া দেয়। ছবি: লেখক

সেই পুরান গন্তব্যে হাঁটার পথেই না হয় নতুন করে শুনাই রেনউইকের ইতিহাস। নামটির মধ্যে আছে এক আভিজাত্য। থাকবেই না কেন? ডব্লিউ বি রেনউইক নামক এক স্কটিশ ভদ্রলোক ১৮৮১ সালে প্রতিষ্টা করেন এই ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯১৪ সালের নাগাদই লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় প্রতিষ্টানের মর্যাদা পায়। ১৯৭৩ সালের নাগাদ কারখানাটি বাংলাদেশে চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থাধীনে অন্তঃভুক্ত হয়।

বর্তমানে এই প্রতিষ্টানে নির্মাণ হয় বিভিন্ন সুগার মিলের জন্য যাবতীয় খুচরা যন্ত্রাংশ, কৃষিযন্ত্র, আখ মাড়াই কল ও তার যন্ত্রাংশ। গড়াইয়ে তীরে একেবারে প্রকৃতির নীড়েই তার অবস্থান। মেঘাচ্ছন্ন সকাল। আবার ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির পায়তারা করছে আকাশটা। তারই মাঝে হেঁটে যায় পথিক। কুষ্টিয়ার বাতাসে কি কিছু আছে। এত মায়া জড়ায় কেন?

স্বাগতম। ছবি: লেখক

কি চমৎকার রাস্তা। যেন সবুজের অরণ্যে ঘেরা প্রকৃতির মাধবীলতা। এখানেই কি হারিয়ে যেতেন রবীন্দ্রনাথ, লালন সাঁই। আশেপাশে শোভা পাচ্ছে নানান জাতের বৃক্ষ। নাম তার জানি না। তবে ফলেই তার পরিচয়। সামনে দেখতে পেলাম বিশাল আকৃতির একটি বৃক্ষ। মহীরুহ হয়ে ছায়া দিয়ে যাচ্ছে সে কত যুগ ধরে। তার ছায়াতলেই কি বসেছিল লালন সাঁই। দেখতে দেখতে চলে এলাম রেনউইক বাঁধের কাছে। ঐ তো দেখা যায় গড়াই নদী।

যে নদী মিশে আছে রবি ঠাকুরের কবিতায়। যে মিশে আছে লালনের আধ্যাত্মিকতায়। সে নদীর নাম গড়াই। এখন বর্ষাকাল। নদীতে থই থই পানি। বর্ষা শেষে গড়াই তার যৌবন পরিপূর্ণ করে আবার বার্ধ্যকে প্রবেশ করে। তখন চারদিকে ধু ধু বালুচর, মানুষ তুই বড় স্বার্থপর। এই প্রথম বর্ষার সময় এসেছি গড়াই নদীর পাড়ে।

শুকনো মৌসুমে গড়াই নদী। ছবি: লেখক

মনে পড়ে যায় রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত কবিতা –

গোড়াই নদীর চর
নূতন ধানের আঁচল জড়ায়ে ভাসিছে জলের পর
একখানা যেন সবুজ স্বপন একখানা যেন মেঘ
আকাশ হইতে ধরায় নামিয়া ভুলিয়াছে গতিবেগ

গড়াইয়ে পাশে দুইটা পরী দাঁড়িয়ে ছিল। যেন স্বাগতম জানাচ্ছে আমাদের তার ভুবনে। এই নদীতে স্বপ্ন বাস করে। এই নদী বুকে হাহাকার তুলে। মনে হয় কোন সুনিপুন চিত্রকরের রঙ তুলিতে উঠে এসেছে ছবির মত সুন্দর এই নদী। আকাশের বিষণ্নতা এখনও কাটেনি। এই যা টুপটাপ শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি। আমরা রেনউইকের বাঁধের পাড় দিয়ে জোর কদমে পা চাললাম। সামনেই দেখা যাচ্ছে সিমেন্টের ছাতায়ালা ছাউনি এবং বসার সুব্যবস্থা। সেখানে গিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এতক্ষণ পর কাঁধের ব্যাগ বেঞ্চে রেখে একটু অলুসে আমেজে বসলাম। আসো গড়াই এবার তোমার রূপ উপভোগ করি।

সকালের বিষণ্নতা, ভেজা বর্ষা। ছবি: লেখক

চারদিক শান্ত, নিশ্চুপ। শুধু নদীতে জলের টুপটাপ শব্দ ছাড়া যেন চারপাশে এক নৈশব্দিক পরিবেশ বিরাজ করছে। গড়াইয়ের বুকে দোল খাচ্ছে কচি কচি ঢেউ। ফিকে হওয়ায় আলোয় যেন ধোঁয়াশার মত উঠে এলেন রবি ঠাকুর। একি মোর কল্পনা? গুরুদেব তার প্রিয় বজরা পদ্মায় করে ভেসে বেড়াচ্ছেন নদীর জলে। প্রিন্স দ্বারকানাথের নির্দেশে তিনি দীর্ঘ ১০টি বছর কাটিয়ে গেছেন এই পূর্ব বঙ্গে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারির কাজে এই দেশের নদী খাল বিল চষে বেড়াতেন। আর নিজেকে মায়ায় জড়াতেন। আজ শিলাইদহ, কাল সাজাদপুর, পরশু পতিসর এভাবে করে তার দিন কেটে যাচ্ছিলো বেশ। পদ্মা, গড়াই এই দুই নদীর নাম কবির কবিতায় অনেকবার এসেছে। গড়াই নদীকে কবি লিখতেন গৌরী নামে। আবার কখনো গোড়াই নাম উঠে আসতো তার কবিতায়। এই গড়াই ছিল তার কাছে খুব প্রিয় ভালোবাসার নাম।

এই তো ছাতায়ালা ছাউনি। ছবি: লেখক

এই নদীর পাড় ঘিরে গড়ে ওঠা ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন এক সাধক পুরুষ। তার টানেই তো আবার ফিরে এলাম সাঁইয়ের দেশে। লালন সাঁইজি কি এই রেনউইক বাঁধের কোন সুশীতল বৃক্ষের নিচে বসে বয়ে যেতে দেখতেন এই অদ্ভূত মায়াবী গড়াই নদী। ঝিরিঝির বাতাসে বৃষ্টির ছটা। খানিকক্ষণ পর ধরণি আবার নিরব হয়ে গেল। কুল কুল করে বয়ে চলছে গড়াইয়ের জল। আমি ডুবে যাই তার মাঝে পাই না কোন তল।

বিদায় গড়াই। ছবি: লেখক

এই গড়াইয়ের পাড়ে বসে নাকি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায়। সূর্য আজ মেঘের কোলে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। আমুদে আমেজে সূর্য উঠছে আজ গড়াইয়ের পাড়ে। আমি নদীর পাড়ে গড়ে তোলা পার্কের দোলনায় বসে দেখছি তার সৌন্দর্য্য। ওয়াফি অপু দুজন এক সাথেই সংসার করতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েছে। আমি একা নির্জন এই সকালে দেখছি গড়াই নদী। সত্যি জীবন সুন্দর, জলের মত সুন্দর, নদীর মত সুন্দর।

One thought on “লালন সাঁইজির দেশে: রেনউইক বাঁধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top