fbpx

লালন সাঁইজির দেশে: দূরন্ত যাত্রা

কুষ্টিয়া এক প্রাণের শহর। সংস্কৃতির শহর। এ শহরে আসলে ডুবে যেতে হয় এর ইতিহাস ও সংস্কৃতির রসে। রোজার ঈদে কোথায় যাওয়া যায় এ ভাবনায় যখন মশগুল, তখনই খুঁজিয়া পেলাম কূল। আর একবার আমার প্রাণের শহরে ফিরে গেলে কেমন হয়। যে শহর কথা কয় লালন সাইজির। যে শহরের কাব্য শোনায় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যে ভাবা সেই কাজ। ভ্রমণ পিপাসু ওয়াফি আহমেদ কেটে ফেললো কুষ্টিয়ার চারখানা টিকেট।

তবে বিধাতার মনে হয় জোড় সংখ্যা পছন্দ নয়। তাই কি শিলিগুড়ি ঘুরে এসে ঈসমাইল হোসেন ভাই বললেন হেসে যাওয়া হবে না কবি আমার। তাই ছবিয়াল কবিকে রেখেই শুরু করতে হল যাত্রা। যথারীতি ওয়াফি এবং তার বন্ধু অপু’র সংসারকে নিয়ে শুরু হল যাত্রা। এ যে বিভূতির অপু নয়। তার ফেসবুক আইডিতে বড় জটিল বাংলা নাম ঠুকে দিয়েছে সে। মুচকি হেসে যখন বন্ধু হবার অনুরোধ জানালো আমিও দেখে তব্দা খেয়ে গেলাম। এ বাংলা ভাষা নাকি চর্যাপদ। যাই হক সে গল্প না হয় পথের গল্পে হারিয়ে যাক।

হরিপুর ব্রিজ ঢোকার মুখে। ছবি: লেখক

রোজার ঈদের পর রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা ছিল। তাই বলে কি ওস্তাদ আমাদের সেই মজমপুর মোড়ে কাক ডাকা ভোরে নামিয়ে দিবে। ধুমায়িত চায়ের কাপের ছোঁয়ায় গায়ে উষ্ণতা পাবার বৃথা চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কুয়াশাচ্ছন্ন কুষ্টিয়া শহর এখন জাগেনি। কিন্তু সারা রাত জেগে রয় টংয়ের দোকানগুলো। হোটেলের রুম খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা হৃদয় ব্যথিত করেনি। বরং সব বন্ধ দুয়ার গল্প শোনার ব্যবস্থা করেছিল। তাই টং এর দোকানে বসে শুনছি প্রান্তিক মানুষের গল্প।

দেখতে দেখতে অন্ধকারচ্ছন্ন ভোরের আলো ফুটে উঠেছে ধরণিতে। সেই আলোয় উষ্ণার ছোঁয়া নিয়ে আসবে দিনের প্রথম সূর্য। তাই বলে পথিকের বসে থাকা চলে। ভোর ছয়টা ছুই ছুই সময়ে রওনা হলাম কুষ্টিয়া হরিপুর সংযোগ ব্রিজের উদ্দেশে। সেখানে বসে না হয় আর একটু সকাল হবার অপেক্ষা করবো।

বিষণ্ণ গড়াই নদী। ছবি: লেখক

এত সকালে রোড ঘাটে মানুষের আনাগোণা দেখা যাচ্ছে। সকালে হাটতে বের হয়েছে কুষ্টিয়াবাসি। আস্তে আস্তে জেগে উঠছে শহর। পিঠে ৩০ লিটারের ব্যাগ নিয়ে আমিও হেঁটে যাচ্ছি তাদের সাথে। হাতে অফুরন্ত সময়। স্থানীয় মানুষদের জিজ্ঞেস করতে করতে এসে পড়লাম হরিপুর-কুষ্টিয়া সংযোগ সেতুর দাড়প্রান্তে। 

বিষণ্ন ভোর আর গড়াই নদী। ভোরের নদী ছুঁয়ে যেতে চায় আকাশের নীলিমা। আকাশে আজ সূর্য উঠার তাড়া নেই। মেঘ জমেছে এখনই নামবে বৃষ্টি। মুক্ত বাতাস, বিষণ্ন আকাশ শোনায় কবে উঠবে বেপরোয়া রৌদ্দুর। সুরঞ্জনা কি এখানেই নক্ষত্র রূপালি ভরা রাতে ভালোবাসা ছড়িয়েছিল। শহরটা যে কুষ্টিয়া।

গড়াইয়ের বুকে নৌকা। ছবি: লেখক

কুষ্টিয়ামুখি হয়ে ব্রিজের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখতে পারছি ওপারের হরিপুর। এই হরিপুর-কুষ্টিয়া সংযোগ সেতুর দুপাড়ের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছি। ১০ বছরের গ্লানি টেনে ২০১৭ সালের মার্চ মাসে উদ্ধোধন হয় এই সেতু। এখান থেকেই পাখির চোখে হয়তো দেখা যাবে রেনউইক বাঁধ। আর একটু সামনে আগালেই গড়াই ও পদ্মার মোহনা।

শীত, শুষ্ক মৌসুমে ধূ ধূ বালুচরের মাঝে এক চিলতে গড়াই নদীর ঝলক দেখা যেত। আর এই ভরা বর্ষায় থই থই জল উঠেছে গড়াইয়ের বুকে। বর্ষা মৌসুমে অল্প সময়ের জন্য প্লাবিত হলেও বছরের অধিকাংশ সময় পলি পড়ে নদীর বুকজুড়ে থাকে সাহারা মরুভূমির মত বালুচর। নদীর পানি শূণ্য থাকায় এখানে দেখা যায় না জলপুত্রদের। তাই কি গড়াইয়ের মনে অনেক ব্যথা। আহা তুমি যদি সারা বছর স্রোতস্বিনী থাকতে। তুমি যে ছিলে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, লালনের সাধনায়।

একটি সেলফি

হেঁটে হেঁটে চলে এলাম হরিপুর। এখানে খেলা করে সবুজ। অপেক্ষায় ছিল এই পথ কখন আসবে পথিক। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির আলতো চুমুতে লাবণ্য বাড়িয়ে দেওয়া এক মাদকতা নিয়ে যেন হাজির হল এই পথ। হঠাৎ বৃষ্টি আবার হারিয়ে গেল মেঘের কোলে। সদা অস্থির ওয়াফি বলে উঠলো আশিক ভাই চলেন রেনউইক যাই। ঝাকড়া চুলের অপুও দিল সায়। বাতাসে বাংলা মায়ের মাটির সোঁদা গন্ধ। সেই গন্ধ অঙ্গে মেখে হেঁটে হেঁটে আবার ব্রিজের মাঝখানে চলে এলাম আমরা। গড়াই এখনও বিষণ্ন।

গড়াই রেল সেতু। ছবি: লেখক

একপাশে দাঁড়িয়ে কিছু ছবি তুলে নিলাম। আর সাথে দুই একটা সেলফি না হলে কি চলে। ব্রিজ থেকে গড়াইয়ের দুপাড়ের উপচে পড়া সৌন্দর্য্য দেখে ভাববে না কেন পথিক। খেয়াল করলাম গড়াইয়ের পাড়ে নদী রক্ষা বাঁধ। সেই বাঁধ ধরে হেঁটে হেঁটে চলে যাওয়া যায় পদ্মার একেবারে সংযোগস্থলে। যেখানে গড়াই ও পদ্মা মিলেমিশে একাকার। ভারত থেকে গঙ্গা মাতা রাজশাহীর পদ্মা হয়ে মিলিত হয় মেঘনায়। গড়াইয়ের এখানে মিলিত হয় তিনটি নদী পথ। পদ্মার এক কূলে পশ্চিমবঙ্গে অপর কূলে বাংলাদেশ। অপরূপ এক মোহনা সৃষ্টি হয়েছে এই হরিপুরের গড়াইয়ের বুকে। একেই বলে ত্রিমোহনা।

দূরে জলপুত্রদের দেখা যাচ্ছে। মাল টানা ট্রলারও চলছে গড়াইয়ের বুকে। চলে যেতে না চাই কিন্তু চলে যেতে হয়। তবে গড়াইয়ের সাথে আড়ি নিয়ে নয়। হরিপুর ব্রিজ থেকে নামার পর আমরা ঠিক করলাম একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যান। ঘড়িতে বাজে সাতটা। ভোরের পিচঢালা পথে সো সো বেগে উড়ে চলছে আমাদের পংখিরাজ ভ্যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top