fbpx

তাড়াশ ভবনের খোঁজে পাবনা শহরে

পাকশী রেল স্টেশন থেকে বের হলাম আমরা। সকাল প্রায় ১১টা বেজে গেছে। সারা রাতের ক্লান্তি যেন শরীর জাকিয়ে বসেছে। লক্কর ঝক্কর গাড়িতে ভাল ঘুম হয়নি। ঘুম ভাঙ্গানো বটিকা এক কাপ কড়া লিকারের চা। কিন্তু সাথে যদি থাকে ওয়াফি আহমেদ কেমন যেন বাতাসে গায়েল গাভীর গন্ধ ভাসে। মালাই মারা ছাড়া চা তো তার মুখে রুচে না। স্টেশনের বাজারে পাবনার সিএনজির জন্য অপেক্ষা করতে করতে তাই হয়ে গেল এক চা চক্র। সঙ্গ দোষে মালাই চা আমারও খেতে হল। মেজরটি ভোটে সে বিজয়ি, তবে সূক্ষ্ম কারচুপি করা যেত। কিন্তু এ সকালে বেলা ঈশ্বরদীর আলাভোলা মানুষের কথায় মনটা ভাল হয়ে গেল।

এখন তো নেই শীতের চোদন। কিন্তু বেশ গরম লাগছিল বিধায় চা খেতে অনীহা প্রকাশ করবার মাত্রই টংয়ের মামা বলে উঠলেন। মামা চা খাইয়া গরমের চোদন কমান। দেখবেন ঠাণ্ডা হইয়ে গেছেন। বাহিরের মানুষের কাছে এ ভাষা অশ্লীল লাগলেও। চোদনের ভাষা এখানে পরিবর্তিত হয়ে ভাল অর্থে ব্যবহার হয়। এখানে চোদন মারা খাওয়ার বিকল্প অর্থ। পাবনার সিএনজিতে উঠার পর দেখলাম হাসি গল্পে ঘড়িতে প্রায় ১২টা বেজে গেছে। এবার ছুটে যাবার পালা।

দোতলা যাবার সিঁড়ি। ছবি: লেখক

আমার এই পথের চলার মাঝেই যে নতুন পথের সন্ধান নিয়ে আসে আত্মার ভিতর লুকিয়ে থাকা যাযাবর। পাবনা শহরে কোথায় কোথায় ঘুরবো তা নেট ঘেটে ঘেটে বের করলাম। প্রথমেই আমরা তাড়াশ ভবন দেখবো ঠিক করলাম। তবে তার অবস্থান নিয়ে তেমন ধারনা ছিল না। সিএনজি আমাদের রায় বাহাদুর গেটের সামনে অটো/সিএনজি স্ট্যান্ডের সামনে যখন নামিয়ে দিল তখন ঘড়িতে প্রায় ১টা ছুই ছুই করছে। নেমে আড়মোড়া ভাঙ্গলাম। হালকা বামে দিকে তাকাতে পেয়ে গেলাম সেই তাড়াশ ভবনের সেই বিখ্যাত সিংহ দুয়ার। সেই দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম তাড়াশ ভবনের হালকা ঝলক।এত সহজেই তার সন্ধান পেয়ে যাব তা ছিল ধারনা বাহিরে। তবে জুম্মার সময় সামনের দিকে গেট বন্ধ দেখতে পেলাম।

আলো আধারির খেলা। ছবি: লেখক

মূলত তাড়াশ ভবনের এই সিংহ দুয়ারকে রায় বাহাদুর গেট বলে। এই ভবনের সাথে যে জড়িত জমিদার বনমালি রায় বাহাদুরের স্মৃতি। প্রাসাদ ভবনের ঢোকার এই বিশাল তোরণ যে এক সমৃদ্ধশালী জমিদারের গল্প শোনায়। সিংহ দুয়ারটি ৮টি থামের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। তোরণটি যে শোনায় প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার ইতিকথা। ডোরিক অর্ডারে নির্মিত তোরণটি গ্রীক স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম নির্দশন। সামনের গেট বন্ধ পেয়ে আমরা পিছনের দিকে গেলাম। অদ্ভূত ভাবে পিছনের গেটটি খোলা পেলাম। পিছনের গেটের সাথে লাগোয়া একটি মসজিদ আছে। নামাজ পর্ব সেরে আমরা পিছনের গেটে দিয়ে ঢুকে গেলাম বনমালি রায় বাহাদুরের জগতে। দূরের সেই তাড়াশ ভবন এখন আমার থেকে দু কদম দূরে। সে যে জমিদার বনমালী রায় বাহাদুরের জমিদারির স্বাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

ভিতর বাহির। ছবি: লেখক

ঐতিহাসিক এই ভববটিকে ১৯৯৮ সালের ৮ জানুয়ারি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে সমর জারি করে প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর। রায় বাহাদুরদের শেকড়ের সন্ধান খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্গত তাড়াশ উপজেলার প্রায় ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্ব দিকে দেবচাড়িয়া গ্রামে। সেই গ্রামেই বাস ছিল কায়স্থ জমিদার বাসুদেবের। তিনি ছিলেন তাড়াশের রায়বংশের আদি পুরুষ।

জানলা ফ্রেম। ছবি: লেখক

১৭ শতকের প্রথম দিকে বাসুদেব তালুকদার (মতান্তরে তিনি নারায়ণ চন্দ্র চৌধুরি নামেও পরিচিত ছিলেন) তৎকালীন সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলায় এই জমিদারির গোড়াপত্তন করেন। সে সময় সিরাজগঞ্জ মহকুমা পাবনা জেলার একটি অংশ ছিল। বাসুদেব নবাব ইসলাম খাঁর অধীনে চাকুরি করতেন। ইসলাম খাঁ তার কাজে এতটাই সন্তুষ্ট ছিলেন তাকে তাড়াশ অঞ্চলে জায়গীর দান করেন। সেই জায়গীর পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ মৌজা। পরগনা কাটার মহল্লা থেকে সেই ২০০ মৌজা জায়গীর নিয়ে সৃষ্টি হয় তাড়াশ জমিদারির।

খুলে দাও দুয়ার। ছবি: লেখক

এই জমিদারির অষ্টম পুরুষ গৌরসুন্দর ছিলেন নিঃসন্তান। মূল বংশের রক্তধারার এখানেই সমাপ্ত হয়। গৌরসুন্দরের দত্তক পুত্র বনওয়ারি লাল এই বংশধারা পরবর্তিতে এগিয়ে নিয়ে যান। এই বনওয়ারি লালকে ব্রিটিশ সরকার রায় বাহাদুর উপাধি দেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে বনওয়ারি থেকে শুরু করে পরবর্তি চার উত্তরাধিকারি ছিল দত্তক পুত্র। বনওয়ারি দত্তক পুত্র ছিলেন বনমালি রায়। বনমালি ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে পিতার মত রায় বাহাদুর উপাধি পান।

পাবনার ঐতিহাসিক সেই তাড়াশ ভবন ব্রিটিশ ঔপনেবেশিক শাসনামলে নির্মাণ করেন বনমালি রায়। রেনেসা স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবে নির্মিত এই জমিদার বাড়িটি বনমালি রায়ের স্মৃতি বহন করছে যুগ যুগ ধরে। জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত নান্দনিক এই স্থাপত্যটি তাড়াশ রাজবাড়ি নামেও স্থানীয় মানুষদের কাছে এখন পরিচিত।

জানাল ফ্রেম ২। ছবি: লেখক

ভবনের উত্তরদিকে খেয়াল করলাম দোতলা উঠার জন্য কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে। তবে তাতে বেড়া দেওয়া কথা না বাড়িয়ে প্রবেশ করা যাক রায় বাহাদুরদের ভুবনে। বাহির থেকে ভবনটির দ্বিতল গাড়ি বারান্দা যেন আমাদের চুম্বকের মত ভিতরে প্রবেশ করার জন্য আর্কষণ করছে। চারটি কোরিনথিয়ান স্তম্ভ দ্বারা নির্মিত এই গাড়ি বারান্দা জমিদারদের রুচিশীলতার পরিচয় তুলে ধরছে নতুন প্রজন্মের কাছে। আহা কি নান্দনিক শিল্পবোধ না ছিল আমাদের পূর্বজদের। এর অর্ধবৃত্তাকার খিলান পথগুলোর সুষম অবস্থান জানান দিচ্ছে প্রাচীন কীর্তির এক অপূর্ব নিদর্শণ।

নিচতলা ঢুকবার মাত্রই ওয়াফির পেটে বিপদ সংকেত দেয়া শুরু করলো। রাত থেকে যে রকম ইনপুট নিচ্ছে দেহে আউটপুট তো বের করতে হবে। বাড়ির রেনোভেশনের কাজ চলছে বিধায় ভিতর বাহিরে প্রচুর মানুষ কাজ করছে। খুব শ্রীঘই জাদুঘর হিসাবে উদ্ধোধন হয়ে যাবে। কায়েস ভাই আর আমি একতলা ঘুরে ফিরে দেখছি। একতলায় মোট আটটি কক্ষ আছে। নিচতলার বেশির ভাগ কক্ষই কর্মচারিদের জন্য বরাদ্দ ছিল। উপরতলায় থাকতেন জমিদারদের পরিবার বর্গ। ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম নিচ তলার কেন্দ্রীয় কক্ষে। এতক্ষণে ওয়াফি আহমেদও এসে পড়লো।

পথিকের চোখে তাড়াশ ভবন। ছবি: লেখক

কেন্দ্রীয় কক্ষের ছাদের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। পিতলের পাতে বিশেষভাবে জ্যামিতিক ফুলেল নক্সা করা হয়েছে। নিচতলা ঘুরে এবার দুই তলা যাবার পালা। দুই তলাতেও নিচতলার মত আটটি কক্ষ। এই ভবনে মোট ৮০টি দরজা ও ৫৩টি জানালা রয়েছে। ঘুরে ঘুরে সেই গাড়ি বারান্দার সামনে এসে পড়লাম। এখানকার জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাহিরে সিংহ ফটকটি। এই গাড়ি বারান্দায় ব্যবহৃত গোলাকার স্তম্ভগুলোতে সাসানিক থামের পাদপট্ট ব্যবহার করা হয়েছে। পিলার গুলো নরমান থামের শিরাবরকে সজ্জিত। সময় যে বহমান। ঘড়িতে বাজে প্রায় দুইটা। পেট চো চো করছে। পেটপূর্তি ও নতুন গন্তব্যের খোঁজে এবার বের হলাম তাড়াশ ভবন থেকে। এক সোনালী ইতিহাসকে পিছে ফেলে এবার বের হতে হবে নতুন ইতিহাসের খোঁজে। 

ফিচার ছবি: কায়েস আহমেদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top