ঘুরে আসি ভরতের দেউল

বাস যখন খুলনা পৌঁছালো ঘড়িতে প্রায় তিনটা বাজে। এখান থেকে যেতে হবে চুক নগর। সেও তো কম দূরে নয়। পেটটা ক্ষুধায় চো চো করছে এরপরও চুক নগরের চুই ঝাল দিয়ে খাসির গোস্ত খাওয়ার লোভে নিজেকে বিরত রাখলাম। দুপুরের খাবার আর বিকালের নাস্তা না হয় এক সাথেই হবে চুক নগরে। চুই ঝাল দিয়ে খাসির মাংস জিভে জল আনা কম্বিনেশন।

প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল খুলনা থেকে চুক নগর যেতে। আকাশে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। টক টক গন্ধের বদলে আকাশে ঝাল ঝাল গন্ধ পাচ্ছি। তবে এই ঝাল যে পুরা সফরে ঝাল লাগিয়ে দিবে কে জানতো। আমরা আছি এখন খুলনার ডুমরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারে। আর এই বাজার বিখ্যাত হয়ে আছে আব্বাস হোটেলের চুই ঝাল দিয়ে রান্না করা খাসির মাংসের জন্য।

চুকনগরের বিখ্যাত সেই চুইঝাল মাংস। ছবি: লেখক

মাথায় ব্যাকপ্যাক চাপিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না। পেয়ে গেলাম আব্বাস হোটেল। হাত মুখ ধুয়ে বসে পড়লাম সিট দখল করে। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী চুইঝালময়। সেই চুই ঝালের গামলা যখন আমাদের প্লেটের সামনে আনলো তখন ঝালের একটা ম ম ঝাঝ যেন আমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। মুখে প্রথম লোকমা দেবার সাথেই সাথেই ঝালের সেনসেশনে ডুবে গেলাম। আহ ঝাল!

খুলনা জেলার ব্র্যান্ডিং হিসাবে চুই ঝালকে লিস্টে ঢুকিয়েছে কিনা তা জানি না। তবে খুলনায় আসলে কেউ চুই ঝাল মিস করতে চায় না। আপনাদের নিশ্চয়ই কৌতুহল হচ্ছে চুই ঝাল ঠিক দেখতে কেমন। অনেকটা দেখতে পানের লতার মত। পাতা একটু লম্বা ও পুরু। তবে এর পাতায় ঝাল পাবেন না। চুই ঝালের কাণ্ড বা লতা কেটে টুকরো করে মাংস রান্নায় ব্যবহৃত হয়। রান্নার পর মাংসের সাথে গলে যায় চুই ঝাল। আর সেই ঝালের রাজ্যে ডুবে যেতে চুই ঝালে চুষে বা চিবিয়ে খায় ভোজন রশিক। চুই ঝাল স্বাদ ও ঘ্রাণে অন্যান্য।

ঝালের পর মিষ্টি দই না হলে কি চলে! ছবি: লেখক

খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর দিয়ে বের হলাম। বাহিরে এখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আব্বাস হোটেলের পাশেই একটা মিষ্টির দোকান। সেই দোকানে দই ছানা যেন ঝালের লেয়ারে ডেজার্ট হিসাবে মোলায়েম স্পর্শ দেবার জন্য সৃষ্টিশীল আহ্বান জানাচ্ছিল। সেই আহ্বান কি ওয়াফি আহমেদ দূরে ঠেলে দিতে পারে। ঝালের পর মিষ্টি আহা আকাশে টক টক গন্ধটা যেন আবার ফিরে আসছে। সেই প্রকোপেই কি বৃষ্টির বেগ আরও বেড়ে গেল।

যাই হোক আমরা ভরতের দেউল দেখার উদ্দ্যেশে অটো ঠিক করলাম। আমাদের দেখিয়ে আবার চুকনগর বাজারে নামিয়ে দিবে। ভরত ভায়নার দেউল যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলা পড়লেই চুক নগর থেকে খুবই কাছে। কেশবপুরের দক্ষিণ কূল ঘেষা ভদ্রা নদীর তীরের কাছাকাছি এই দেউলের অবস্থান। সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আনুমানিক দেড় হাজার বছরেরও বেশি আগের ভরত রাজার দেউল।

ঐতিহ্যের ফলক। ছবি: লেখক

ছুটে চলছে অটো বৃষ্টিকে সাথী করে। পুরো ধরনিতে যেন ভর করেছে আধারের ঘণঘটা। বৃষ্টির ছটা গায়ে লাগছে। বাঁচার কোন উপায় নেই। একটু আগে যেইটা গুড়িগুড়ি বেগে পড়ছিল তা রূপ নিয়েছে মুষলধারায়। বৃষ্টির প্রবল এই বর্ষণের ভিতর আমরা ছুটে চলছি ভরত ভায়না গ্রামের পথে। বৃষ্টির পরসে যেন জেগে উঠেছে আশেপাশের প্রকৃতি। বাতাসের বৃষ্টির গন্ধ, কাদার এটে গন্ধ মিলিয়ে এক মাদকিয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কাদা মাটি মেখে বড় হওয়া গ্রামের শেকড় তো এখনই ভুলে যায়নি। কিছুক্ষণের জন্য যেন ভরতের দেউলের কথা ভুলে গিয়ে ডুব দিলাম গ্রাম বাংলার মাঝে।

টানা ঝুম বৃষ্টির মাঝে আকাশের গর্জন, পানিতে পানিতে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে মাঠ ঘাট, খাল বিল। ধানের ক্ষেতের আইলগুলোও মিলিয়ে যাচ্ছে জলের রাজ্যে। দূর থেকে দেখা যায় কোন কৃষক কাস্তে হাতে আইল ধরে হেঁটে আসছে, মনে হচ্ছে অকুল দরিয়ার মাঝে সে এক মরিয়া নাবিক। আমরা যেখানে ডুবে আছি প্রকৃতি উপভোগ করতে সে হয়তো ভাবছে ফসলের কথা। জীবন কি এমনই। কিছুটা লজ্জাবোধ জাগ্রত হল নিজের মাঝে।

বৃষ্টির সাজে ভরতের ভায়না। ছবি: লেখক

কৃষকের জন্য সেই চিরচেনা পথটি যেন নরম হয়ে উঠে। ক্ষণে ক্ষণে তার পায়ের চিহ্ন মুছে যাচ্ছে মাটি থেকে। একটু পরেই হয়তো বৃষ্টি থেমে যাবে। জগৎপিতা নিশ্চয়ই তার ফসলের খেয়াল রাখবে। হাজার বছর ধরে তো এভাবেই চলে আসছে গ্রাম বাংলার জীবন। এভাবেই তো কাটে হাজার বছর ধরে বিনিদ্র রাত। তাই কি সাহিত্যিক জহির রায়হান বলেছিলেন রাত বাড়ছে, হাজার বছরের পুরানো সেই রাত!

দেখতে দেখতে চলে এলাম ভরত ভায়না গ্রামের সেই দেউলের গেটে। বৃষ্টির কারণে বের হতে পারছি না অটো থেকে। ভরতের দেউল পুরো এরিয়াটা বাউন্ডারি ওয়াল করা আর সামনে গেট, গেটের পাশে টিকেট কাউন্টারের মত। ভবিষ্যতে একে যে পর্যটনের জন্য ব্যবহার করবে বুঝা যায়। আমাদের অটোয়ালা মামা তার ছাতাটি দিলেন। তবে এক ছাতার তলে দুজন গেলে দুজনই ভিজবো তাই টং দোকানের একটা ভাঙ্গা ছাতা নিলাম যেইটা সামনের দিকে সামান্য নুয়ানো। সেই ছাতা নিতেও গিয়েও এক পশলা ভিজে নিলাম।  দুজনের অবস্থা দেখে টং দোকানের ভিতর বসা কিশোরির দল খিল খিল করে হাসছে। জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম এই পরিস্থিতিতে থাকলে হয়তো লিখে ফেলতেন কোন কাব্য। কিন্তু আমি তো জাতীয় কবি নই, মেজাজটা তীব্র খারাপ হলে মেনে নিয়ে সামনের দিকে আগালাম।

জং ধরা সাইনবোর্ড। ছবি: লেখক

গেট দিয়ে ঢুকতেই সামনে দেখতে পেলা, বিরাট এক প্রাচীন বট বৃক্ষ স্থানটির একাংশ আগলে রেখেছে। আশেপাশে খেজুর আম জাম কাঠাল গাছগুলো চিনতে বেশি অসুবিধা হল না। জায়গাটা অনেকটা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের মত দেখতে। এইটাই দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম বৌদ্ধ স্থাপনা যা ভরত রাজা বা ভরত ভায়নার দেউল হিসাবে পরিচিত। এই দেউলকে ঘিরেই যেন গ্রামের উৎপত্তি। তাই তো গ্রামের নাম ভরত ভায়না।

কার্বন টেস্টের মাধ্যমে জানা গেছে এই স্থাপনাটি খ্রিস্টিয় সাত থেকে নয় শতকে  নির্মিত একটি মন্দির। এখানকার ব্যবহৃত ইট ও প্রাপ্ত বিভিন্ন পোড়ামাটির মূর্তি গবেষণা করে বিশেষজ্ঞরা এই মতে আসেন এটি এই অঞ্চলের আদি ঐতিহাসিক যুগে নির্মিত একটি স্থাপনা। এই স্থাপনার সাথে পাহারপুর, শালবন, মহাস্থানগড়ের বেশ মিল আছে। সমসাময়িক পাল রাজাদের আমলেই এই স্থাপনা তৈরি হয় বলে ধারনা করা যায়।

হালকার উপর ঝাপসা। ছবি: লেখক

১৯২২ সালে ভারতের প্রত্মতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ এই ঢিবিটি সংরক্ষণ করে এবং ১৯২৩ সালে কাশিনাথ দীক্ষিত ঢিবিতে জরিপ পরিচালনা করা হয়। তখন ধারনা করা হয় ঢিবিতে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আছে যা হিউয়েন সাং বর্ণিত সমতটের ৩০টি সংঘারামের একটি। প্রাচীন মন্দিরটি ভরত নামধারী এক প্রভাবশালী রাজা নির্মাণ করেছে বলে প্রচলিত আছে। এখানে ১৯৮৫ সালে প্রথম এবং ২০১৭ সালে শেষ খনন হয়। মাঝখানে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু খননের কাজ চলে। খনন এখনো শেষ হয়নি।

খননের ফলে একটি স্থাপনার ধ্বংসাবশেষের উন্মোচিত হয়, যা থেকে অনুমান করা যায় স্থাপনাটির উপরিকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে আমরা যা দেখছি তা সম্ভবত বিনষ্ট হওয়া অট্টালিকার ভিত্তি বা উঁচু মঞ্চ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের করা স্কেচ থেকে দেখা যায়, মোট ৮২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে গেছে।

বৃষ্টির দিনে তুমি থাকবে স্মরণে। ছবি: লেখক

মূল মন্দিরের চারদিকের ছিল চারটি প্রবেশ পথ। গঠনশৈলী দেখলে পূর্ব দিকে মূল প্রবেশ পথ ছিল ধারনা করা যায়। সব চেয়ে মজার ব্যাপার হল ভরতের দেউল নির্মাণে যে ইট ব্যবহার করা হয়েছে তার পরিমাপ পরিমাপ ৩৬ সেন্টিমিটার, ২৬ সেন্টিমিটার ও ৬ সেন্টিমিটার। এত বড় ইট খুলনা বিভাগের আর কোন প্রাচীন পুরাকীর্তিতে পাওয়া যায়নি। স্থাপনা ও ধ্বংসস্তুপ আবিষ্কার করা ছাড়াও এখানে অনেক নির্দশণ পাওয়া গেছে।তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল গুপ্তযুগের একটি পোড়ামাটির মাথা, পোড়ামাটির মানুষের হাত ও পায়ের কয়েকটি ভগ্ন টুকরা, কয়েকটি মাটির প্রদীপ, অলংকৃত ইটের টুকরা, পদচিহ্ন-সংবলিত দুটি ইটের টুকরা এবং একটি মাটির ক্ষুদ্র পাত্র।

এই নিদর্শণগুলো বর্তমানে খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বৃষ্টি আজ পিছু ছাড়বে না। তবে আমাদের পিছু ছাড়তে হবে ভরতের দেউলের। সামনের অনেক পথ পারি দিয়ে যেতে হবে সাতক্ষীরা। তবে সাতক্ষীরা যাবার আগে ইচ্ছা আছে মাইকেলের মধুসূদনের বাড়িঘরে যাবার। অটো আমাদের আবার সেই চুক নগরে নামিয়ে দিল। অপেক্ষা আর একটি রাত্রি শেষের গান শুনানোর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top