fbpx

ঘুরে আসি ফুলের রাজধানী: যশোরের গদখালী

জীবনের গল্প থেমে থাকে না। জীবন নদীর স্রোতের মত প্রবাহমান। শীত আসলে ফুলের রাজ্যে ঘুরে আসার প্রবনতা নর-নারী সবার মাঝেই ভাইরাস আকারে দেখা যায়৷ বিশেষ করে যশোর গদখালী সেই ফুলের রাজ্যের সিগ্ধতায় মুগ্ধ হতে প্রেমিক পুরুষ ছুটে যায়। ছুটে যায় সেই মুগ্ধতার চাঁদরে মুড়িয়ে থাকা ফুলের রাজ্যে। সেখানে হয়তো তার প্রিয়ার জন্য স্বর্গের সেই পারিজাত ফুলের সন্ধান করে৷ তবে সে যে দিবানিশির আলেয়ার মাঝে হারিয়ে যায়৷ তবুও ফুলের রাজ্যের আবেদন কমে না নর-নারীর মাঝে৷

গাদা ফুলের বাগান। ছবি: লেখক

নগর মোহাম্মদাবাদ ঘুরে তাই আমার ভ্রমণ সঙ্গী কায়েস ভাইয়ের মনে সেই ফুলের রাজ্যে সুবাস নেবার খোয়াব জাগলো৷ ঝিনাইদহ থেকে এত কাছে সেই ফুলের শহর তাই নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না৷ দুই ব্যাচেলার তাই শীতের সেই মিষ্টিমাখা রোদে ছুটে চললাম ঝিকিরগাছার গদখালী ইউনিয়নের উদ্দেশে৷ সকাল গড়িয়ে দুপুরের পথে দুই ভ্রমণকারি ছুটে চলছে দেশের পথে। যশোর আমায় কখন হতাশ করে না। বৃক্ষের সারিগুলো মহিরুহ হয়ে পরিব্রাজকের পথে ছুটে চলে। আলেন গিন্সবার্গের সেপ্টেম্বর অন যশোর রোডের কথা মনে পড়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের কত স্মৃতি বহন করছে এই যশোর রোড।

ফুলের মাঝে কোমল মন। ছবি: কায়েস আহমেদ

দেখতে দেখতে চলে এলাম ঝিকরগাছার গদখালি বাজার। পেটে ইঁদুর সেনারা দৌড়াচ্ছে। জীবনানন্দের কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল। চমৎকার ধরা যাক দুই একটা ইঁদুর এবার। ইঁদুর সেনাদের কতল করে এবার ভ্যানে করে রওনা হলাম সেই ফুলের রাজধানীর উদ্দেশে। যেতে যেতে না হয় শুনি গদখালী ইউনিয়নের ফুল চাষের ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের অন্বেষণ করতে গিয়ে নাম এসে পড়ে শের আলী সরদারের।

তার হাত ধরেই গদখালী ফুলের রাজ্যের হাতে খড়ি। তাই তাকে এই রাজ্যের অলিখিত রাজাও বলা যায়। প্রায় চার দশক পূর্বে এখানে শুরু হয় ফুলের চাষ। তাই এই অঞ্চলে শের আলী সরদারের নাম কিংবদন্তির মত ভেসে বেড়ায়। ১৯৮২ সালের কোন এক বিষণ্ণ সকালে শের আলী বসে ছিল তার বাবার নার্সারিতে। ভাবছিল হয়তো জীবনের কোন গদ্য। সে সময় কারও ডাকে ধ্যান ভাঙ্গে শের আলীর। সামনে তাকিয়ে দেখলেন এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে।

রঙ্গীন ভুবন। ছবি: লেখক

ভদ্রলোক জল তৃষ্ণা মিটাতে শের আলীর কাছে পানি চাইলো। সে এসেছে সুদূর ভারত থেকে। তার হাতে রজনীগন্ধা ফুল। ফুল দেখে কৌতুহলি শের আলী জিজ্ঞেস করলো কোথায় থেকে পেল এই ফুল। ভদ্রলোক বললো এই ফুল পশ্চিমবঙ্গে অনেক হয়। লোকটি চলে যাবার পর শের আলী ভাবতে বসলো। পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের মাটি তো এক। যে ভাবা সেই কাজ। এক বিঘা জমিতে রজনীগন্ধা দিয়ে শুরু করলেন ফুলের রাজ্যের আত্মকথন। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

সেই চার দশক আগে শুরু হয়েছিল রজনীগন্ধা দিয়ে আজ বিস্তার ঘটেছে পুরো অঞ্চল জুড়ে। এসেছে ফুলের রাজ্যে নিত্য নতুন জাতের ফুল। ধান পাটের বদলে গদখালী ইউনিয়ন পরিণত হল ফুলের রাজ্যে। ইতিহাসের মাঝে ডুবে ছিলাম। বাস্তবে ফিরলাম ভ্যানয়ালা মামার ডাকে। এসে পড়েছি ফুলের রাজধানীর খুব কাছাকাছি। ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৯০ টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার বিঘা জমিতে ফুলের চাষ করা হয়। রাস্তার দুইপাশে দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের ফুলের সমাহার দেখে মুগ্ধ এই পরিব্রাজক মন।

জারবেরা ফুল। ছবি: লেখক

এর মাঝে কায়েস ভাই জিজ্ঞেস করে উঠলো ভাই এই ইউনিয়নের নাম গদখালী হল কিভাবে। এই গদখালী নিয়ে আছে এক কিংবদন্তির গল্প। লাইলি মজনুর গল্প তো অনেক শুনলেন এবার না হয় রডারিক মাদলসার প্রেমের গল্প শুনুন।

লোক মুখে শুনা যায় প্রেমিক পুরুষ রডারিক ও মাদলসার প্রেমের আত্মকহন। মাদালসার সাথে সাক্ষাতের পূর্বে রডারিক ছিল পর্তুগিজ দস্যুদের সর্দার। রডারিকের অত্যাচারে এ অঞ্চলের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। নিষ্ঠুর রডারিকের মাঝেও ছিল একটা কোমল আত্মা। হরিহর নদীর পাশেই ছিল মাদলসার বাস স্থান। মাদলসা ছিল কমলেসের কন্যা। সে ছিল সবার প্রিয় আদুরে মেয়ে। রডারিকের হৃদয়ে নতুন সূর্যের মত উদয় হয়েছিল মাদলশা। একদিন কমলেসের বাসায় হানা দিতে গিয়ে দেখা হয়ে যায় মাদলসার সাথে।

আহা পাই না কূল, লাল জারবেরা ফুল। ছবি: লেখক

অন্ধকার ঘরে ভিত হরিণীর মত তির তির করে কাপছিল মাদলসা। মাদলসার ঘরে রডারিক প্রবেশ করে। থমকে যায় সময়। মাদলসার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ রডারিক তার সতীত্ব রক্ষা করে ফিরে যান। ক্ষমা চেয়ে পণ করেন আর ডাকাতি করবে না রডারিক। প্রেম রাজাকে ফকির বানায়, ডাকাতকে সন্ন্যাসী। মাদলসার প্রেমে রডারিক ফিরে আসে এই হরিহরে পারের গ্রামে সন্ন্যাসী বেসে।

গড ও কালীর প্রতি ভক্তি দেখিয়ে তৈরি করেন ‘গডকালী মন্দির’। রডারিকের চোখে মাদলসা প্রেম দেখেছিল। এক রাতে তার বাড়ির সামনে এসে রডারিক প্রেম নিবেদন করলে মাদলসা আর ফিরাতে পারেনি। দুজনই সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে ফিরে যায় তাদের আপন নিরালয়ে। সেই গডকালী মন্দির এখনও আছে এই গ্রামে। তবে কালের বির্বতনে আজ তাই গদখালী নামে পরিচিত। এবং এই মন্দির নামেই এই ইউনিয়নের নাম।

তোমার খোপায় দিব রজনীগন্ধা। ছবি: লেখক

এসে পড়েছি গ্রামের পিচ ঢালা পথ ধরে এক গ্রামে। এখানেই বেশি মানুষের ভিড় দেখলাম। এক চায়ের দোকানে ভ্যান থামলো। মামা কে রেখে আমরা নেমে গেলাম মেঠো পথ ধরে ফুলের রাজ্যের দর্শনে। ফুলের সুঘ্রানে চারদিকে ম ম করছে, রঙিন প্রজাপতি মেলেছে ডানা, বাতাসে শুনি মৌমাছির গুঞ্জন। আহা প্রকৃতি তুমি সুন্দর। রজনীগন্ধা, গ্লাডিওল্যাস, গোলাপ আর গাঁদা ফুলের ক্ষেত গুলাতে ললনারা জমিয়েছে ভীড়। ঘড়িতে প্রায় ৪টার কাছাকাছি বাজে। সকালে আসলে হয়তো আরও ফুলের সমাহার দেখতে পারতাম। এখান থেকে দেশের নানান প্রান্তে পৌঁছে যায় ভালোবাসার ফুল। যা বিয়ে বাড়ি থেকে শুরু করে প্রেম নিবেদনসহ হরেক রকম কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের পানিসারা, হাড়িয়া, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, পটুয়াপাড়া, সৈয়দপাড়া, মাটিকুমড়া, বাইসা, কাউরা ও ফুলিয়া গ্রামের প্রতিটি গ্রামেই মিলবে এমন চিত্র। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ জুড়ে গাঁদা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, কসমস, ডেইজি জিপসি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ আরো বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ, যেন এখানেই স্বর্গের বাস।

রজনীগন্ধার ক্ষেত। ছবি: লেখক

এখানে প্রকৃতি আপন খেয়ালে একেছে যেন বেখেয়ালি চিত্র। রঙিন চাঁদর বিছিয়ে জানিয়েছে আমায় আমন্ত্রন। গোলাপ, রজনীগন্ধার ক্ষেত ঘুরে আশে পাশে গ্লাডিওল্যাস, জারবেরা ক্ষেত দর্শণে গেলাম। তবে ক্ষেত মালিক ললনাদের দেখলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। না বলে ফুল ছিড়ে নিয়ে যাওয়া, গাছের নরম ডাল ভেঙ্গে ফেলার কারণে অনেক ক্ষেতে ঢুকতে দিচ্ছে না। দিবেই বা কেন। আমাদের কমন সেন্স দিন দিন নন সেন্স হয়ে যাচ্ছে।

দেখতে দেখতে সময় হয়ে এল ফুলের রাজধানীকে বিদায় জানানোর। পরিব্রাজকের পথের দাবি যে এখনও শেষ হয়নি। ছুটে চলছি দুই পরিব্রাজক আবার অদ্ভুত ভ্রমণে এই বাংলার পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top