fbpx

শেষ হতে যাচ্ছে বাজেট এয়ারলাইন্সের দিন?

পুরো বিশ্বের চেহারা পরিবর্তন করে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। বিশ্বায়নের এ যুগে একসাথে সব দেশের সীমানা বন্ধ করে দেওয়া হবে, এ কথা হয়তো কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। স্বাভাবিকভাবেই এর ধাক্কা প্রথম এসে লেগেছে বিমান সংস্থাগুলোর উপর। প্রথমে চীনের সাথে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করেছে সবাই। ভাইরাস যতটা ছড়িয়েছে সেই সাথে এর আওতা বেড়ে এখন পুরো পৃথিবীই যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীবাহী সকল বিমান তাদের ফ্লাইট সংখ্যা কমাতে কমাতে একসময় অনেকে বন্ধই করে দিতে হয়েছে। গত ২৬ই মার্চ এমিরেটস তার সকল যাত্রীবাহী বিমান গ্রাউন্ডেড করে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকের বেতন অর্ধেক করে দেয়া হয় তিনমাসের জন্য। তবে একেবারে কম বেতনে যারা ছিলেন তাদের বেতন পুরোটাই দেয়া হচ্ছে মানবিক কারণে।

বড় এয়ারলাইন্সগুলোর টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে। ছবি: এমিরেটসের ফেইসবুক পেইজ

বিমান সংস্থাগুলোর দুঃস্বপ্নের মতো এসময়টার মাধ্যমে শেষ হতে চলেছে কম দামে বিমান ভ্রমণের যুগ। দুঃসংবাদই বটে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অজস্র ‘বাজেট’ ট্র্যাভেলারদের জন্য। আশিক করা হচ্ছে আশির দশকে যেমন শুধুমাত্র অতি ধনীরাই বিমানে চড়তে পারতো, এখন আবার পৃথিবী সেদিকেই চলে যেতে পারে। অধিকাংশ বিমান সংস্থায় এ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে পারবেনা যদিনা তাদেরকে রূপকথার গল্পের মতো কেউ উদ্ধার করতে পারে।

এই উদ্ধারকারী হতে পারে বিমান সংস্থাটির দেশের সরকার। এই যেমন ইতালির বিমান সংস্থা আলিতালিয়াকে বন্ধ হয়ে যাবার হাত থেকে রক্ষা করেছে সে দেশের সরকার। এ সময়টা ঋণ দিয়ে পার করিয়ে দিবে তারা। বাংলাদেশ বিমান বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে, নাহলে তাদের পক্ষেও আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন তাদের দেশের বিমান সংস্থাগুলোর পাশে থাকবে তার সরকার। বিমান সংস্থাগুলোর এ পরিণতিতে তাদের কোন রকম দোষ নেই। আমেরিকার বিমান সংস্থাগুলো এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের জন্য সরকারের কাছে ৫০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য চেয়েছে। সাধারণ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সংস্থাগুলো লাভেই থাকে, বিশেষত তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে।

করোনা পরবর্তী সময়ে আর হয়তো কম মূল্যে যাওয়া যাবেনা এ বিমানে। ছবি: রায়ান এয়ারের ফেইসবুক পেইজ থেকে

ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট এসোসিয়েশনের (IATA) এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান পিয়ার্স ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিমান সংস্থাগুলোর বর্তমান অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন একদিন যেমন বিমানের টিকেটের চাহিদা পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে অন্যদিকে ফ্লাইট বাতিলের পরিমাণও আশংকাজনকভাবে বেড়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই কেউ তার পূর্ব নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল কররে প্রচলিত আইন অনুসারে তাকে টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে সব এয়ারলাইন্সকে।

তার মতে ত্রিশটি বড় এয়ারলাইন্স ছাড়া বিশ্বের সব এয়ারলাইন্সের তিন মাসের বেশি এ অবস্থায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। বড় এয়ারলাইন্সগুলোও বেশিদিন টিকে থাকতে পারবেনা। তাদের করা হিসেবে শুধুমাত্র ৫ই মার্চ পর্যন্তই এয়ারলাইন্সগুলো অন্তত ১১৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, দিন দিন তার চক্রবৃদ্ধিহারে বেড়ে চলেছে। অন্তত ৭৫ ভাগ বিমান সংস্থার সরকারী সাহায্যের দরকার পড়বে।

করোনভাইরাসের সংক্রমণ শেষ হলেও বিমানে যাত্রী পরিবহন স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লাগতে পারে। কেউ কেউ বলছেন অন্তত একবছর লাগবে এ খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে। এ সময়টাতে যে ক্ষতির মুখে পড়েছে বিমান সংস্থাগুলো সেটা সামলিয়ে উঠে প্রথমদিকে হয়তো সীমিত আকারের সেবা দিতে পারবে। অনেক বিমান সংস্থা তাদের অর্ধেকের বেশি কর্মী ছাটাই করে ফেলেছে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের যাত্রা শুরু হবে সীমিত পরিসরে হাতে-গোনা কয়েকটা গন্তব্যে।

আবার ক্ষতি পুষিয়ে উঠে বিমান সংস্থগুলো কখনোই হয়তো আর সস্তায় কোন টিকেট দিতে পারবেনা। ফলে আশির দশকের মতোই বিমানের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। কমদামে সহসা ভ্রমণের দিন ফুরিয়ে যাবে তাহলে। সারা বিশ্বেই বাজেট ট্রাভেলারদে খরচ কমানোর একটা বড় জায়গা থেকে আগে থেকে বাজেট এয়ারলাইন্সে টিকেট করে অবিশ্বাস্য কম খরচে গন্ত্যব্যে পৌঁছে যাওয়ার মাধ্যমে।

পৃথিবী বিখ্যাত রায়ান এয়ারের কথাই ধরুণ না। ১০ ইউরোতে বুদাপেস্ট থেকে তেল আবিবের টিকেট বিক্রি করে চমকে দিয়েছিলো পুরো পৃথিবীকে। ২০-৫০ ইউরোতে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে অহরহ টিকেট কেনা সম্ভব ছিলো এ বিমান সংস্থা থেকে। তাদেরকেও এ করোনা বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করতে ঋণ নিতে হয়েছে ৪ বিলয়ন ডলার। করোনা পরবর্তী সময়ে যখন অনেক বিমান সংস্থাই হারিয়ে যাবে তখন রায়ান চালু হলেও এ বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে তারা কি কম দামে টিকেট দিতে পারবে?

অপরদিকে এশিয়া জুড়ে বিশ্বস্ত বাজেট বিমান সংস্থার নাম এয়ার এশিয়া। করোনা মহামারীতে তাদের ৯৬ শতাংশ বিমানই বসে আছে অলস হয়ে। সংস্থাটির এয়ারবাসে আগে থেকে অর্ডার করে রাখা ৬টি বিমান নিলামে তুলছে বলে খবর বেরিয়েছে। এয়ার এশিয়াকে বাঁচানোর শেষ উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে মালেশিয়ার সরকারী বিমান সংস্থা মালেশিয়ান এয়ারলাইন্সে সাথে একে একত্রীভূত করে নেয়া। সেক্ষেত্রে নতুন করে সহসাই দেখা যাবেনা স্বল্প ব্যয়ের বিমান।

ফিচার ছবি: আনোয়ার হোসেন চৌধুরী

Back to top