fbpx

শিখর ছোঁয়ার গল্প: দলিয়ান পাড়ার মায়া ও ছেড়ে আসা

রাতেই ঠিক করেছিলাম পরদিনের যোগী সামিটে আমরা যাচ্ছি না। যাঁরা যেতে চায় যাবেন, আমরা আজকে পাড়ায় বিশ্রাম করবো। পর পর দুইদিন এতো কঠিন ট্রেইল তেহজীবের জন্যে বেশিই হয়ে যাবে। মুশতাককে বলেছিলাম বাকিদের সাথে যেতে। কিন্তু সে মেয়েকে রেখে সামিট করবে না। গ্রুপের প্রো-ট্রেকাররা যাবে আজকে। ঘুম ভাঙলো যখন, ঘড়িতে বাজে ছয়টা। ঘুমের ঘোরেই শুনছিলাম, অন্য গ্রুপের লোকজন যাচ্ছে সামিটে। আমি ভাবছিলাম, আমাদের মানুষজন যায় না কেন? ওরা দেখি মাত্র আড়মোড়া ভেঙে উঠছে। তৈরি হয়ে, খেয়েদেয়ে যখন বের হলো, তখন সাড়ে সাতটার বেশি বাজে। কিন্তু ঐ যে বললাম, সব সেই লেভেলের প্রো-ট্রেকার! এর মাঝে আমাদের অনন্যা আপু, রাসেল ভাই, রিফাত ভাই, মমিনুল ভাই, পলাশ ভাই, দুরন্ত দ্য বেয়ার গ্রিল ভাই, ম্যাকলারেন মামুন ভাই, শাফায়েত ভাই এবং বিপু ভাই আছেন। পলাশ ভাই যাওয়ার আগে আমার আহত চশমাটাকে কোনরকম জোড়া লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আমার বেশ উপকার হলো তাতে।

পাড়ার সকালবেলা। ছবি: লেখক

রবিবার হওয়াতে আজকে এই পাড়ার কোন গাইড দাদা যাবেন না। আমাদের শফিউল ভাই আর ত্রিপুরা পাড়া থেকে জিসান নামে একজন গাইড যোগ দিলেন গ্রুপের সাথে। আমাদের গ্রুপ ঠিকই ঝটপট এগিয়ে গেল। মাসুম ভাই এই ইভেন্টে যাওয়ার আগেই পায়ে ব্যথা পেয়েছিলেন। আগের দিন সামিটে যেয়ে ব্যথা আরো বেড়েছে। ভাই যাবো, যাবো করেও শেষ পর্যন্ত রয়ে গেলেন। উনি অবশ্য যোগী-জো-ত্লং বছর তিনেক আগেই একবার সামিট করেছেন। এদিকে রাব্বানি ভাইয়ের শুনলাম শরীর খুব খারাপ করেছে। অটোফেজির চক্করে খালি পেটে লেবু পানি, ঘিয়ে ভাজা তিনখানা ডিম খেয়ে ১৫/১৬ ঘণ্টা ট্রেকিংয়ে শরীর সায় দেয়নি। সবাই মজা করছিল, ভোরে মোরগ ডাকার আগেই রাব্বানি ভাই ডাকছিলেন। ওয়াক্! ওয়াক্!! সবার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উনি আজকেও যাবেন। এবং যথারীতি ডিম খেয়েই যাবেন। রাব্বানি ভাই আর ওনার ডিম এই ট্যুরের বিশেষ অংশ ছিল। সেই বিষয়ে লিখতে গেলে উপন্যাস হয়ে যাবে। ঐসময় দলিয়ান পাড়ায় যারা ছিলেন, কমবেশি সবাই এই কাহিনী জানেন! এই ট্যুরে আকিকা ছাড়াই ওনার নাম হয়ে গেল ‘ডিম ভাই’।

পাড়ার বিনোদন ছাউনি। ছবি: লেখক

যাইহোক, সবাইকে বিদায় দিয়ে আমি, মাসুম ভাই আর মুশতাক কিছুক্ষণ আগুন পোহালাম। পাড়ায় খুব অন্ধকার থাকতেই আগুন জ্বালানো হয়। সবাই মিলে হাত-পা গরম করে। আগুনের কমলা শিখার ফাঁকে সূর্যের কমলা আভা উঁকি দেয়। পাহাড়ে এভাবে ভোর আসে। কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর খেলার ছাউনিতে যেয়ে বসলাম তিনজন। জয় আর আশিক ঘুমাচ্ছে। তেহজীবও ঘুমাচ্ছে সুমাইয়ার সাথে। ছাউনিতে বসে এই আলাপ, সেই আলাপের ফাঁকে মাসুম ভাই দিদিকে গরম পানি দিতে বললেন। তারপর যেয়ে কফি বানিয়ে আনলেন। আহা! শীতের সকালে একটু আধটু রোদ সবে আলো ছড়াচ্ছে। তার মাঝে গরম কফির কাপটা যা ওম দিচ্ছিলো না! হঠাৎ তেহজীবের কণ্ঠ শুনলাম। মা, মা করে ডেকে উঠলো। আগের রাতে আমাদের অন্য ঘরে শুতে হয়েছিল। এই ঘরটাও বেশ। বিশেষ করে ঘরের বাইরের দিকে দুইটা বেঞ্চি দেয়া। গিয়ে দেখি আমার বুড়ি বেঞ্চিতে চুপ করে বসে আছে। কাছে যেতেই বললো, ‘মাসুম চাচ্চু পাহাড়ে যায়নি?’ বললাম, ‘তুমি যাওনি তো মা। তাই বাবা, মাসুম চাচ্চু কেউ যায়নি।’ বুড়ি স্বর্গীয় হাসি দিল! সুমাইয়াও উঠে পড়েছে। জয় আর আশিককে ডেকে নিলাম। সবাই হাতমুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়ে খেতে গেলাম। পাহাড়ে প্রায় তিনবেলাই ভাত-ভর্তা হয়। হঠাৎ হয়তো কখনো খিচুড়ি-মুরগী থাকে। যখন যাই খাওয়া হয়, স্বাদটা জিভে লেগে থাকে। তারপর ঢাকায় ফিরে রাজভোগও আর মুখে রুচে না। 

কফির ওম। ছবি: লেখক

খেয়েদেয়ে এসে আবার ছাউনিতে গেল সবাই। টিজিবির কয়েকজনও পাড়ায় আছেন। সবাই মিলে ক্যারম খেলার আয়োজন করছেন। আমি আর সুমাইয়া একটা গাছের নিচে বসলাম। একটু পর রঙ চা দিয়ে গেলেন মাসুম ভাই। চায়ে আলতো চুমুক আর অনেক গল্প হচ্ছিলো সুমাইয়ার সাথে। তেহজীব পাড়াময় ছুটে বেড়াচ্ছে। কয়েকটা বাচ্চা কুকুর ওর পায়ে পায়ে ঘুরছে। মাসুম ভাই একবার আমাদের সাথে এসে আড্ডায় যোগ দিচ্ছেন, আবার তেহজীবের সাথে যাচ্ছেন। কতো ছবি তুলছে দুইজন মিলে! সেই সময়টা আমার অনেকদিন মনে থাকবে।

অলস দুপুরের আড্ডা। ছবি: তেহজীব

বাকিরা ক্যারম খেলা শেষ করে আসলো। তেহজীব ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই ফাসকা ভাইয়ার সাথে দেখা করতে যাবে বলে বায়না করছে। তখন বেলা হয়ে গিয়েছে। বললাম, এখন গিয়ে কাজ নেই। যদিও আপা আমাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন, নিজে রান্না করে খাওয়াবেন বলে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, আগের দিনের সেই ভয়াবহ ট্রেকিংয়ের পর রান্না করার মতো অবস্থা ওনার নেই। তেহজীবকে গোসল করিয়ে দিলাম। সুন্দর রোদ আছে, পানিও তেমন ঠাণ্ডা না। তারপর আমরা মাসুম ভাইদের ঘরের মাচাংয়ে যেয়ে বসলাম। মামুন ভাই আগের রাতে বলছিলেন, উনি নাকি আমাদের জন্যে লাড্ডু নিয়ে এসেছেন। ওনার ব্যাগ খুলে সেই লাড্ডু ছাড়াও পাওয়া গেল ক্রিমরোলের দুইটা বক্স। অর্ধেক লাড্ডু আর এক বক্স ক্রিমরোল খালি করে সুন্দরমতো আবার ঢুকিয়ে রাখা হলো ব্যাগে। এরপর আশিকের মোবাইলে সবাই মিলে লুডু খেলা শুরু করলো। ব্যাপক হইচইপূর্ণ খেলা হচ্ছে। এর মধ্যেই আমি বালিশে মাথা রেখে সেখানেই ঘুমিয়ে গেলাম। হয়তো আধঘণ্টা হবে। কিন্তু এরকম আরামে বহুদিন ঘুমাইনি সত্যি। এদিকে খেলা কিন্তু তখনও চলছে।

সেই ক্যারমবোর্ডটা! ছবি: মাসুম ভাই

এমন সময় দেখি রাব্বানি ভাই আসছেন খুব দ্রুতবেগে, হাসিমুখে। আমরা হাততালি দিয়ে উঠলাম। বাহ! ডিম ভাই এতো তাড়াতাড়ি যোগী সামিট করে ফিরছেন! কাছে এসেই ধপাস করে বসে গেলেন মাচাংয়ে। তারপর যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে, পথে ওনার শরীর খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ওয়াই জংশনে ওনার জন্যে অনেকটা সময় বসে ছিল গ্রুপের বাকিরা। ওনাকে বারবার মানা করছিল আর আগাতে। কিন্তু উনি তবুও যাচ্ছিলেন। শেষমেশ বুঝতে পেরেছেন যে, আরো সামনে গেলে এবং শরীর বেশি খারাপ করলে গ্রুপের বাকিদের আর সামিটে যাওয়া হবে না, তাই ফিরে এসেছেন। সাথে এসেছে জিসান দাদা। ওনার পুরাই মেজাজ খারাপ। উনি যাচ্ছিলেন মূলত যোগীর পথ চিনে নিতে। ফেরত আসতে হয়েছে তাই উনি ডিম ভাইকে বকাঝকা করছিলেন। ভাই বললেন, আর কতো বলবেন? দাদা উত্তর করলেন, সারাজীবন বলতে থাকবো! অসুস্থ একজনকে নিয়ে আমরা নিষ্ঠুরের মতো হাসাহাসি করছিলাম। আসলে ব্যাপারটাই এতো হাস্যকর ছিল! রাব্বানি ভাই এইবার নিজেই আগে চলে গেলেন খেতে। আজকে উনি ভাত খাবেন। আর কোন কথা হবে না, শুধু খাওয়া হবে।

অতঃপর খাওয়া। ছবি: মোস্তাক হোসেন

আমাদের ম্যাকলারেন মামুন ভাইও চলে আসলেন। স্পিডের কারণেই ওনার এই যথার্থ নামকরণ করেছেন পলাশ ভাই। আমরা একসাথে খেতে গেলাম। মোটামুটি সন্ধ্যার আগেই আমাদের কয়েকজন চলে আসলেন সামিট শেষ করে। খাওয়া শেষে মামুন ভাই, মুশতাক, আমি, সুমাইয়া, তেহজীব, মাসুম ভাই গেলাম আবার চায়ের দোকান সামিট করতে! আসল উদ্দেশ্য ফাসকাদের সাথে দেখা করা। চায়ের দোকান থেকে নিচের দিকে যে ঘরবাড়ি, তারই একটাতে ফাসকারা আছে। সেখানে সালমা আপা, ফখরুল ভাইদের সাথে দারুণ একটা আড্ডা হয়ে গেল, সাথে তাদের গাইড দাদার করা চমৎকার স্বাদের লেবু চা। ফেরার পথে চায়ের দোকানে আবার সবুজ ভাইদের সাথে দেখা। সেখানেও আরেক দফা আড্ডাবাজি হলো। আমাদের যোগী টিমের শেষ গ্রুপ ততোক্ষণে চলে এসেছে পাড়ায়। ফিরে যেয়ে সবার গল্প শুনছিলাম। ডিম ভাইয়ের ডায়েট, পলাশ ভাইয়ের ঝাড়ি, যোগীর রিজ লাইনের কথা, অনন্যা আপুর ময়মনসিংহের একসেন্টে দম ফাটানো একেকটা ডায়লগ… উফ্! গাল ব্যথা হয়ে গিয়েছিল হাসতে হাসতে। ঘরের ভেতর দলে দলে ভাগ হয়ে লুডু খেলা হচ্ছিলো। কতো এনার্জি এদের! আমি দেখছিলাম তখন গাছের ফাঁকে ঝুলে থাকা চাঁদটা। আজকের রাতটাই! সকালে উঠে মায়াবী এই পাড়াটা ছেড়ে যেতে হবে। 

দলিয়ান পাড়ায় আমরা। ছবি: মাসুম ভাই

পরদিন সকালেই ঘুম ভাঙলো। আজকে ১৬ই ডিসেম্বর, আমাদের মহান বিজয় দিবস। দেশের লাল-সবুজ পতাকাটা হাতে সবাই মিলে ছবি তোলা হলো। সকালের খাবারে দিদির রান্না শেষবারের মতো খেলাম। তারপর বিদায় জানিয়ে হাঁটা ধরলাম। চশমার পর এবার আমার ছেঁড়া জুতাটাও নি-গার্ড দিয়ে পেঁচিয়ে মেরামত করা হলো। একজন ভাঙাচোরা ট্রেকার! রাব্বানি ভাইয়ের প্লে-লিস্টে দেশের গানের মারাত্মক সব সংগ্রহ আছে। দল বেঁধে আমরা হাঁটছি, ব্যাকগ্রাউন্ডে গানগুলো বাজছে আর ভেতরে রক্ত টগবগ করে ফুটছে। এই অনুভূতি বলে বোঝানো সম্ভব না। দলিয়ান পাড়া থেকে রেমাক্রির পথটাও একসময় শেষ হয়ে গেল। নৌকায় উঠে পড়লাম। আবারও সাঙ্গুর বুকে এগিয়ে চলা।

পাড়া থেকে রেমাক্রির পথে। ছবি: মোস্তাক হোসেন
একটি বাংলাদেশ! ছবি: মোস্তাক হোসেন

থানচি পৌঁছেই পেগাসাসের সেই বিখ্যাত স্যান্ডেল জোড়া কিনে নিলাম। এবার সত্যিকার অর্থে ট্রেকারের খাতায় নাম উঠে গেল, ভাবছিলাম আমি। চান্দের গাড়িতে চড়ে বসলাম। যথারীতি পুরো রাস্তায় গান গাচ্ছিলাম আমরা। তেহজীবও ঘুমাতে পারছিল না। কারণ সব গান ওর কমন পড়েছিল! বান্দরবান নেমে মামুন ভাই আমাদের আইসক্রিম ট্রিট দিলেন। ঢাকায় ফিরে আবার সুলতান’স ডাইনে দেখা হবে, এই প্রতিশ্রুতিও দিলেন। সাড়ে আটটার বাস আমাদের তাড়া দিচ্ছিলো। সব মায়া কাটিয়ে ফেরার পালা! 

ঢাকায় ফিরে তেহজীব বলেছে আমাকে, ‘মা, এরপর আবার আমরা পাহাড়ে যাবো। একদিন যোগী সামিট করবো। আর একদিন দলিয়ান পাড়ায় থাকবো। মা, আমি পাড়াটাকে মিস করছি!’ 

দলিয়ান পাড়া থেকে বান্দরবানের ফিরতি যাত্রার ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন এই লিংকে: https://youtu.be/1WNCZ9DNyuI

আমরা গিয়েছিলাম Hit the Trail এর সাথে। তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দিয়ে দিচ্ছি:
https://www.facebook.com/groups/HitTheTrailBd/

মাসুম ভাই: 01672970714
রিফাত ভাই: 01931800139
রাসেল ভাই: 01873340122

আমার পুরানো ভ্রমণকাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন এই লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে আমরা জায়গা নোংরা করি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবি: আতাউল ইসলাম মাসুম

One thought on “শিখর ছোঁয়ার গল্প: দলিয়ান পাড়ার মায়া ও ছেড়ে আসা

  1. আমিও আবার যোগী যাবো আমার ছোট্ট ছোট্ট তেহজীবের সাথে শুধু পাড়ায় বসে আড্ডা দেওয়ার জন্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top