fbpx

ঘূর্ণিঝড় নিয়ে মজা করা বন্ধ করুন

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। আমরা থাকি চট্টগ্রামের মাঝির ঘাটে। সকাল থেকেই ঝির-ঝির বৃষ্টি, সাথে মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া। আম্মা আর আমি বাসার বাইরে এসে বুঝার চেষ্টা করছি আবহাওয়া কেমন । ইতিমধ্যে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে আঘাত হানতে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড়। দশ নাম্বার মহা বিপদ সংকেত।

তার কিছুদিন আগেই একবার ১০ নাম্বার বিপদ সংকেত দেয়া হয়। অনেক লোক আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়ে ফিরে আসে। এর সুযোগে গ্রামের অনেকের বাড়ীতে ব্যপক চুরিও হয়। ফলে এবার মানুষের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যপারে তীব্র অনীহা দেখা দেয়। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং, রেডিও ও টিভিতে বার বার সতর্কবার্তা দিয়েও মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলাফল ছিলো প্রায় ২০ লাখ লোক বিপজ্জনক এলাকায় ছিলো।

রাত দশটা নাগাদ পুরো আকাশ যেন লাল হয়ে গেল। আমি ঘুমিয়ে পড়েছি পড়েছি সোফার উপরেই। বারটার দিকে জানালার কাঁচ ভাংগার শব্দে জেগে যাই। আমার আশে পাশে ছড়িয়ে আছে কাঁচের টুকরা। ভাইদের চিৎকার কানে আসলো পানি আসছে, পানি। বড় ভাই ছুটে এসে বলল দোতলায় উঠো সবাই, দোতলায় উঠো।

দোতলার দৃশ্য যেন কোন এক বন্দী শিবিরের। অন্ধকার বাড়ীটার দোতলায় শুধু পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের সব তলার লোকজনই নয়, চলে এসেছে প্রতিবেশীরাও। গাদাগাদি করে চার রুমে বসে আছে প্রায় একশ মানুষ। একটা বড় মোটা মোমাবাতি জলছে শুধু। পাঁচতলার বাড়ীওয়ালী খালাম্মা জানালো পাঁচতলা শুধু দুলছে। বাইরে বাতাসের তীব্র গর্জন। থেমে থেমে আসছে, কিন্তু মনে হচ্ছে পরেরটা আগেরটার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আসছে।

মেঝো ভাইয়ের জ্বর। তার গায়ে একটা কম্বল বা কাথা জড়ানো। আমার সেটা নিতে খুব ইচ্ছা করছে। ঠান্ডায় কাপছি। কিন্ত লজ্জায় কাথাটা চাইতে পারছিনা। মুরব্বীরা দোয়া দূরুদ পড়ছেন সবাই। জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখলাম পাশের বাসার টিনগুলো একটা একটার পর একটা উড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ ফু-দিয়ে কাগজের টুকরো উড়াচ্ছে।

হঠাৎ সাইরেনের শব্দ! অবাক হয়ে দেখলাম নেভীর বেশ বড় একটা জাহাজ সোজা আমাদের বিল্ডিংয়ের দিকেই আসছে। অখচ নদী প্রায় ১ কিমি দূরে। লাল-নীল রংগের অনেক বাতি জলছে জাহাজের গায়ে। কিছুদূর এসে থেমে গেল জাহাজ। পানির শব্দ চারদিকে।

নিচ থেকে বড়ভাই জানালো কোমর সমান পানি উঠেছে। বিল্ডিং মোটামুটি নিরাপদ, বাসার উঠানের অন্য পাশের একটা দোতলা বিল্ডিংয়ের আংশিক ধ্বসে পড়েছে। নারিকেল গাছ পড়ে গেছে। অবশেষে সেই দীর্ঘ রাত গড়িয়ে সকাল হল। কমে গেল বাতাসের বেগ। পানিও নেমে গেছে। কিন্তু যে ক্ষতি করে দিয়ে গেল তা বর্ণনাতীত।

একমাসেরও বেশী সময় চট্টগ্রামের খাল গুলোতে লাশ ভেসে আসতো। বিদ্যুৎ সহ টেলিভিশন নেটওয়ারর্ক আসতে সময় লেগেছিল প্রায় একমাস। নেভাল ড্রাইভের রাস্তার পিচ খুলে নিয়ে গিয়েছিলো ঝড়। বেসরকারী হিসেবে মারা গেছে ২০০,০০০ এর বেশী মানুষ। গাছের উপরের ডালেও পাওয়া গেছে মানুষের মৃতদেহ। কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সন্দীপের অনেকের পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিংবা পরিবারের অনেক সদস্যই নেই। তাদের সমাধি হয়েছে সমুদ্র।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী অবস্থা: ছবি স্টীমইট.কম

কাল রাতে হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ের খবরে অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারিনি। যতগুলো গ্রুপে সম্ভব শেয়ার করেছি বিপদের বার্তাটা। এ বছরের এপ্রিল মাসে ঘূর্ণিঝড় ফণীর সময় আমি খুলনা থাকতাম। বিপদের বার্তাটা এবারও ভুলভাবে দিয়ে অনেক মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া হয়েছিলো। এখন সেই মানুষজনকে আবার আশ্রকেন্দ্রে নেয়া কতোটা কঠিন হবে বুঝায় যায়।

অবাক হয়ে দেখলাম ঘূর্ণিঝড় নিয়ে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ধরণের মজা করে যাচ্ছে। একদল আবার এক কাঠি সরস, তারা অ্যাডভেঞ্চারের লোভে ছুটে যাচ্ছে খুলনার দিকে। যেখানেই যাক তাদের ইচ্ছার ব্যপার, কিন্তু ঘোষণা দিয়ে বাকি দূশ্চিন্তায় থাকা মানুষের সাথে এরকম নিষ্ঠুর প্রহসন না করলেই পারে। ফণীর সময় কলকাতার দুজন লোক একই রকম ঘোষণা দিয়ে পুরীতে যেয়ে প্রায় মরতে বসেছিলো, সে কাহীনি হয়েতো অনেকেই জানেন।

যেকোন দালানে বসে এরকম ঝড় রীতিমতো উপভোগ করা যায়। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন সন্দীপের সেই মানুষটার কথা যে তার মা ও বোনকে গামছার দিয়ে নারিকেল গাছের সাথে নিজেকে সহ বেঁধে রেখে পুরোটা রাত অপেক্ষা করেছে ঝড় শেষ হবার অথবা কুতুবদিয়ার সেই মায়ের কথা যে তার মেয়েকে নিয়ে সাঁতরাচ্ছে বেড়ী বাধ লক্ষ্য করে, জানেনা তার স্বামী এবং অন্য মেয়ে কোথায় আছে বা বেঁচে আছে কিনা।

কিছু করতে পারেন বা নাই পারেন অন্তত এসব মানুষের জীবন-মরণের সংগ্রামের কথা ভেবে তাদের জন্য দোয়া করুন এবং ঘূর্ণিঝড় নিয়ে মজা করা বন্ধ করুন।

ফিচার ছবি: উইন্ডি.কম থেকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top