fbpx

মারা পড়ছে কক্সবাজারের সেই ডলফিনের ঝাক?

গত মাসের শেষের দিকে কক্সবাজারের সৈকতে দেখা যায় বিরল দৃশ্য। ১৮ ই মার্চ থেকে মাত্র পাঁচদিন পর্যটক শূণ্য থাকায় কক্সবাজারে দেখা মিলে ডলফিনের ঝাকের। ২৩ ই মার্চ নয়ানাভিরাম সেই দৃশ্য ভিডিও করেন কয়েকজন। তার পর পরই ছবিগুলো ভাইরাল হয়ে ঘুরতে থাকে ফেইসবুক ও ইউটিউবে। কিন্তু ট্যুরিস্ট পুলিস ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সৈকতে কাউকে যেতে না দেয়াতে সে দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় করতে পারেনি অতি উৎসাহি দর্শকরা। কিন্তু হায়, গতকাল থেকে মৃত ডলফিনগুলোর ছবি ফেইসবুকে আসতে থাকে। অন্তত দুটি জায়গায় ডলফিনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে বলা হচ্ছে।

গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছবি জালাল উদ্দীন

তার কয়েকদিন আগে ইনডিপেন্ডেন্ট টিভি নিউজ করেছিলো ২৩ তারিখের পরে ওই ডলফিনের ঝাককে আর দেখা যায়নি। হতে পারে তারা তাদের আবাসস্থলে ফিরে গেছে, পরিস্কার পানি দেখে হয়তো কিছু সময়ের জন্য এসেছিলো। কিন্তু গতকাল বিকেলে কক্সবাজার ও টেকনাফের প্রায় মাঝামাঝি শামলাপুর নামক জায়গায় আহত অবস্থায় একটি ডলফিনের দেখা মিলে। জালাল উদ্দিন নামক একজন ফেইসবুকে সমুদ্র সৈকতে আহত অবস্থায় পড়ে থাকা ডলফিনের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে।

স্থানীয় লোকজন চেষ্টা করেও সেটাকে আর সমুদ্রে ফেরত পাঠাতে পারেনি। ডলফিনের গায়ে বেশ কয়েক জায়গায় আঘাতের চিহ্ণ রয়েছে। ময়না তদন্ত ছাড়া সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয় এ আঘাতগুলো কিসের কারণে হয়েছে। এর আগে কক্সবাজার সৈকতে লাইফ গার্ডে দায়িত্বে নিয়োজিত সার্ফার কামরুল হাসান আমাদের জানিয়েছিলেন কক্সবাজারের সৈকতে ডলফিন আসার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে মাছ ধরার নৌকাগুলো। এসমস্ত নৌকার প্রপেলারে আঘাত পেয়ে ডলফিনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বলে তারা সাধারণত এখন সৈকতের কাছাকাছি আসেনা।

২৩ মার্চে দেখা যাওয়া ডলফিন ছবি কামরুল ইসলাম

গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় ডলফিনের মৃতদেহ ভেসে আসার খবর পাওয়া যায়। এরকম অন্তত পাঁচটি জায়গার ১০-১২ টি ডলফিনের কথা আলোচনায় আসলেও সেগুলোর সত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে শুধুমাত্র দুটি জায়গায় ডলফিনের মৃতদেহের ছবি পাওয়া গেছে এ দুটো জায়গাই কাছাকাছি।

রয়েল টিউলিপের সামনে পাওয়া মৃত ডলফিন ছবি আরাফাত রহমান

এদিকে জেলেদের দায়ী করা হলেও তারা কেউ স্বীকার করছেনা বিষয়টি। ডলফিনদের মৃতের ঘটনার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান অনুষদের সহকারী অধ্যাপক জুয়েল দাস জানান সাধারণত সমুদ্রের গভীর বড় ধরণের বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটলে মৃত ডলফিন ভেসে আসে। তবে এখন এধরনের কিছু ঘটার কোন কারণ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মানুষের কারণেই এটা ঘটতে পারে। ডলফিনের ব্যপারে জেলেরা সচেতন নয়, তাদের জালে আটকা পড়লে তারা ডলফিনকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে।

আজ ৫ এপ্রিল সকালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন আইওএমের কর্মকর্তা আরাফাত রহমান সকালে তার কর্মস্থলে যাওয়ার সময় রয়েল টিউলিপের সৈকতে ডলফিনের ভেসে আসা লাশ দেখতে পান। তার শেয়ার করা ছবি ও ভিডিওতে মৃত ডলফিনের লেজে দঁড়ি বাঁধা দেখা যায়, যাতে স্পষ্টই ‍বোঝা যাচ্ছে জেলেদের জালই মৃত্যুর কারণ। এদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন জানিয়েছেন ডলফিনের মৃত্যুর কারণ তদন্ত করা হচ্ছে এবং অচিরেই এর রহস্য বেরিয়ে আসবে। এছাড়া কক্সবাজার সৈকতে ডলফিনের অবাধ বিচরণের জন্য কয়েকটি বিশেষ জায়গা চিহ্নিত করে সেখানে মাছ ধরা ও মানুষ চলাচল নিষিদ্ধ করে তাদের জন্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হবে।

মাত্র কিছুদিন আগে গত ২১ ই মার্চ ২০২০ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতেও ডলফিনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ইঞ্জিন চালিত নৌকার প্রপেলারের আঘাতেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গত আড়াই বছরে কমপক্ষে ২৩ টি ডলফিনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে যার সবগুলোর জন্য মূলত ইঞ্জিন চালিত নৌকাকেই দায়ী করা হচ্ছে। যদিও সংরক্ষিত অভয়াশ্রম হবার কারণে সেখানে ইঞ্জিন চালিত নৌকা চালানোর ব্যপারে নিষেধাজ্ঞা আছে।

গত মাসে হালদা নদীতে পাওয়া মৃত ডলফিন

ডলফিন রক্ষায় কক্সবাজারে খুব তাড়াতাড়ি তাদের আবাসস্থল চিহ্নিত করে সেই জায়গাগুলো অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একই সাথে ডলফিন হত্যা সাথে জড়িতদেরও কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে না, না হলে এ অবস্থায় চলতেই থাকবে।

ফিচার ছবি: জালাল উদ্দিন

Back to top