fbpx

চান্দেরপাড়ায় তাঁবুবাস-১ম কিস্তি

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের কোণায় ছোট্ট একটা শহীদ মিনার, পিছনেই টলটলে নদী তার তীর ঘেঁষে দিগন্ত জোড়া সরিষা ফুলের রাজ্য । এরকম একটি ছবি হঠাৎ করে দেখলাম ঘুরতে ঘুরতে পরিচিত হয়ে যাওয়া ফেরারী হ্যাপী প্রিন্স থেকে আব্দুল ওহাব তমাল হয়ে যাওয়া ভাইয়ের ফেসবুক ওয়ালে। ছবিটা দেখেই মনে একটা দাগ কেটে গেলো। যেতে হবে এখানে, সম্ভব হলে ক্যাম্পিং করে রাত কাটানো। সাথে সাথে তমাল ভাইকে নক করলাম এটা কোথায় জানানোর জন্য। তমাল ভাইয়ের কাছে জানতে পারলাম জায়গাটা নরসিংদী সদর উপজেলার চান্দেরপাড়া গ্রামে। 

চান্দেরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার। ছবি: লেখক

তমাল ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিলো এর আগের বছর নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা জমিদার বাড়ি ঘুরতে গিয়ে। সদা হাসোজ্জল তমাল ভাইকে ক্যাম্পিংয়ের বিষয়ে জানানোর সাথে সাথেই  তিনি সবুজ সংকেত দিলেন। এই গ্রামে তমাল ভাইয়ের খালার বাড়ি, উনি কয়েকবছর এই গ্রামে ছিলেন তাই সব পরিচিত। নিরাপত্তা নিয়েও নেই কোনো সঙ্কা, ক্যাম্পিংয়ের দিনে তমাল ভাইকে না পাওয়া গেলেও পাওয়া যাবে খালাতো ভাই আরাফাতকে। 

ভ্রমণসঙ্গীরা আমাকে রেখেই ছবি তুলেছে। ছবি: তানিম ভাই

এদিকে আমরা এর আগের সপ্তাহে মুন্সীগঞ্জের পদ্মহেম থেকে ক্যাম্পিং করে এসেছি। এই সপ্তাহে আবার ক্যাম্পিং করতে যাবো কিনা, সফরসঙ্গীদের জিজ্ঞেস করতেই সবাই একবাক্যে রাজী হয়ে গেলো। এমনকি আগের সপ্তাহের আশিক ভাই, ইসমাইল ভাই, মুন ভাই, তাহান ভাইয়ের সাথে আরো যুক্ত হলো ওয়াফি ভাই, রাকিব ভাই, তানিম ভাই, পাভেল ভাই, শাহাদাত ভাই ও রাজন ভাই।  সবাই মিলে ঠিক করে ফেললাম শুক্রবার সকালে ৯ টায় গুলিস্তান সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে উপস্থিত থাকবো। একে একে সবাই উপস্থিত হয়ে গেলেও আসছেনা সবচেয়ে কাছের মুন ভাই। ওনার বাসা জয়কালী মন্দিরের পাশে অথচ উনারই দেখা নাই। প্রায় ৩০ মিনিট সবাইকে অপেক্ষা করিয়ে আসলেন ক্যাপ্টেন মুন ওরফে চান মিয়া। সবাই একসাথে হওয়ার পরে পরিচয় পর্ব সেরে নিলাম একমাত্র রাজন ভাই ও রাকীব ভাই ব্যাতিত বাকী সবাই পূর্ব পরিচিত ছিলো আমার কাছে। শাহাদাত ভাই, পাভেল ভাই ও তানিম ভাইয়ের সাথে পরিচয় টিওবির লাখের বাত্তি ১৪২৪ ইভেন্ট থেকে। বাকীরাও নিজেরা পরিচিত হয়ে নিলো সাথে সাথে আমরাও নরসিংদীর বাসের টিকেট নিয়ে উঠে গেলাম।

ক্যাম্প সাইট নির্ধারণের কাজ চলছে

বাসে উঠে দেখি আমাদের ক্যাম্পিংয়ের সরঞ্জাম দেখে লোকজন আমাদের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করলো আমরা কোথায় যাবো?  কেনো যাবো? আমাদের দেশে এখনো ক্যাম্পিং সেভাবে পরিচিত হয়ে উঠেনি সাধারণ লোকজনের কাছে তাই সারাদেশেই এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আমরাও অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। দুই ঘণ্টার বেশি সময় যাত্রা শেষে নরসিংদী গিয়ে নামলাম ১২ টার পরে। দুপুরের খাবার এবং জুম্মার নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে। বাস থেকে নেমে ঈদগাঁ পার হয়ে অনেকদূর চলে গেলাম কিন্তু হোটেল বা রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাচ্ছিনা। শেষ পর্যন্ত ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টে  ব্যাগপত্র রাখলাম, তার পাশের মসজিদে অনেকেই জুমার নামাজ আদায় করে নিলো। জুমা শেষে দুপুরের খাবারের পালা, রেস্টুরেন্ট ছোট হলেও এখানে কিছু নিয়মিত কাস্টমার আছে খেয়াল করলাম। যারা বিভিন্ন অফিসে চাকরি করে মাস হিসেবে খাওয়াদাওয়া করে। নামাজের পরপর তারাও খেতে আসলো। জায়গা কম হওয়াতে খুব ভীর হয়ে গেলো, তার উপর আমাদের এতো ব্যাগপত্র। 

বিখ্যাত ত্রয়ী। ছবি: লেখক

তবে খাওয়াটা ছিলো অত্যন্ত মজাদার, বিভিন্ন রকমের ভর্তা, শাক, ভাজি, শিং মাছ, বোয়াল মাছ, গরুর গোশতসহ আরো অনেক আইটেম ছিলো। ঘরোয়া খাবারের মতোই সবগুলোর স্বাদ ছিলো দারুন। পেটপুরে ১১ জন খেয়েও খুব বেশি বিল হলোনা। মোট বিল আসছে ১৪০০ টাকা। তারপর দুইটা ব্যাটারিচালিত অটো রিজার্ভ করে চলে গেলাম চান্দেরপাড়া স্লাইস গেট বাজারে। গ্রাম্য বাজার, হরেক রকম পণ্যের পসরা নিয়ে বসে আছে দোকানীরা। এরমধ্যে শীতের শাকসবজি নিয়ে বাইরে বসে আছে অনেক কৃষক, সবচেয়ে বেশি চোখে পড়লো বেগুন। হয়তো এদিকে বেগুনের চাষ বেশি হয়।

তাবু গোছগাছের কাজ চলছে। ছবি: তানিম ভাই

এরমধ্যে তমাল ভাইয়ের থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ হলো আরাফাত ভাইয়ের সাথে, ওনার নির্দেশনা মেনে আমরা পৌঁছে গেলাম চান্দেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে। মাঠে নেমেই পেয়ে গেলাম আমার কাঙ্ক্ষিত সেই শহীদ মিনার। যার পিছনেই বয়ে চলেছে মেঘনা নদীর একটি শাখা। এখানেই শীতকালে চারিদিক পরিনত হয় সরিষা ফুলের রাজ্যে, হলুদে হলুদে ছেয়ে যায় গোটা এলাকা। তখন মনে হয় হলুদের সমুদ্র। হিমুরা সব খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে ভরিয়ে তুলেছে প্রকৃতি। তবে আমরা যেহেতু নভেম্বর মাসেই গিয়েছি তখনো সরিষা ফুলের গাছ বড় হয়নি, মাত্র কয়েকদিন হলো চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে আরাফাত ভাই ও তার বন্ধুদের সাথে দেখা হলো। সবাই খুব খুশী আমাদের দেখে। এর আগেও ‘লুতুপুতু সাইক্লিস্ট’ এখানে ক্যাম্প করেছিলো সেই গল্প শোনালো আমাদের। 

তাঁবু দেখতে জন সমাগম। ছবি: লেখক

আমরা ক্যাম্প সাইট ঠিক করার কাজে লেগে গেলাম, আরাফাত ভাই তাদের বাড়ির সামনে নদীর তীরে ক্যাম্প করার পরামর্শ দিলো কিন্তু আমরা চাচ্ছিলাম একটু ফাঁকা জায়গায় ক্যাম্প করার জন্য যাতে আমরা একটু রিলাক্স থাকতে পারি আবার আমাদের দ্বারা অন্য কেউ বিরক্তও না হয়। গ্রাম থেকে একটু দূরে দুই-তিন মিনিটের হাঁটা পথ এরকম জায়গায় তাঁবু ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। সবাই যখন গ্রাম থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলাম তখন পিছনে তাকিয়ে দেখি বিশাল মিছিলের মতো হয়ে গেছে। গ্রামের ছোট বড় বাচ্চা এমনকি অনেক বয়স্ক লোকও আমাদের সাথে সাথে হাঁটতেছে। তাঁদের কৌতুহল আমাদের নিয়ে, এই শীতের দিনে আমরা কিভাবে থাকবো নদীর তীরে? 

উৎসাহী জনতার দৌড়াদৌড়ি। ছবি: রাকিব ভাই

কিভাবে ঘর বানাবো? এর আগে বেদে সম্প্রদায়ের লোক এসেছিলো এই এলাকায়, পলিথিন দিয়ে ঘর বানিয়েছিলো আমরা কি সেরকমই বানাবো কিনা এমন প্রশ্ন মুখে মুখে।

তাঁবুগুলো সেট করে ফেললাম সবাই মিলে, তাঁবু সেট করার পরে লোকজনের ভীর আরো বেড়ে গেলো। সবাই আসছে তাঁবু ধরে ধরে দেখছে আর নানান প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছে। কোথা থেকে কিনেছি, দাম কতো, বৃষ্টিতে পানি ঢুকবে কিনা, কুয়াশা আটকাবে কিনা এমন কি বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে কিনা?

(চলবে…)

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোষ্ট দেখুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top