fbpx

চান্দেরপাড়ায় তাঁবুবাস-শেষ কিস্তি

কৌতুহলী জনতার আগ্রহের মধ্য দিয়েই শুরু হলো আমাদের চান্দেরপাড়া ক্যাম্পিং। একপাশে শান্ত স্নিগ্ধ মেঘনা নদী, নদীর ওপারের দৃশ্য আবছা আবছা দেখা যায়। এপারে নদীর তীরে তাঁবু সেট করা সাময়িক আশ্রয় নিয়েছে কয়েকজন ভবঘুরে পরিব্রাজক। দেশের আনাচে-কানাচেতে ঘুরে বেড়িয়ে যারা খুঁজে পায় প্রশান্তি। পাহাড় নদী মাঠ ঘাটে খুঁজে ফেরে নিজেদের পরম শান্তি। এই পরিব্রাজক দলকে দেখতেই লাইন দিয়েছে গ্রামের উৎসাহী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। ক্যাম্প সাইট ঠিক করা হলো এবার পালা রাতের খাবার তৈরির। ওয়াফি ভাইর নেতৃত্বে একটি দল ভাগ হয়ে চলে গেলো বাজারে। আজকের খাবারের গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ওয়াফি ভাই। ক্যাম্পিংয়ে আসার আগেই শর্ত দিয়েছিলেন উনি রান্না করবেন, আমরাও কেউ দ্বিমত করিনি। আমি আর মুন ভাই, তাহান ভাই রইলাম ক্যাম্প সাইট পাহাড়ায়। আরেকটি দলকে খুঁজে পাওয়া গেলোনা। তারা বেড়িয়ে গেছে শেষ বিকেলে গ্রামের প্রকৃতি দেখতে।  

ইউটিউব দেখে সালাদ কাটা। ছবি: তানিম ভাই

বাজার করে চলে আসার পরে আরাফাত ভাই ওনাদের বাড়ি থেকে হাড়ি পাতিল নিয়ে আসলো। সাথে আসলো আরাফাত ভাইয়ের আব্বা, এসেই আমাদেরকে অনুরোধ করতে লাগলেন ওনাদের বাড়িতে থাকার জন্য। এখানে এসে যদি বাড়িতে না থেকে মাঠে থাকি তাহলে ওনাদের জন্য লজ্জাজনক বিষয়। এমনকি আরাফাত ভাইয়ের আম্মা বারবার করে বলে দিয়েছে আমরা যেনো বাড়িতে গিয়ে থাকি। আমরা অনেক কষ্টে খালুকে বোঝাতে সক্ষম হলাম যে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই, আমরা এভাবে থাকার জন্যই এসেছি। এরপর চলে যাওয়ার সময় আরাফাত ভাইকে আমাদের সকল ধরনের সহযোগিতা করার জন্য নির্দেশনা দিয়ে গেলেন। 

উনুনে তৈরি হচ্ছে রাতের খাবার। ছবি: লেখক

সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নেমেছে প্রকৃতিতে, চারদিক থেকে সবাই ক্যাম্প সাইটে চলে এসেছে। চারদিক প্রচণ্ড রকমের নিশ্চুপ, কোনো কোলাহল নেই। নেই ঢাকা শহরের হাক ডাক, রিকশার বেল কিংবা গাড়ির শব্দ। খোলা আকাশের নিচে বসে, মেঘনার দিকে তাকিয়ে মনে হলো এরকম জীবনই তো চেয়েছিলাম। যদি এমনি করে কাটিয়ে দেওয়া যেতো বাকী দিনগুলো। এরমধ্যে শুরু হয়ে গেছে রান্নার সরঞ্জাম তৈরি করা। তরকারি কাটা, চাল-ডাল ধুয়ে আনা। এবার আমি তাহান ভাই বাজারে যাওয়ার সুযোগ পেলাম সাথে রাজন ভাই। বাজারে গিয়ে গরম হালিম, পুরি, দই খেলাম। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম।  

বাড়িতে সবাই কেমন খায় জানিনা তবে এখানে ভালোই খেলো। ছবি: লেখক

এসে দেখি ওয়াফি ভাইর নেতৃত্বে খিচুড়ি রান্না চলছে সাথে কয়েকরকমের ভর্তা, ডিম ভাজি হবে। মাটি গর্ত করে উপরে ইট দিয়ে চুলা বানানো হয়েছে।  সবাই সতস্ফুর্তভাবে রান্নার কাজে সহযোগিতা করতেছে,কেউ হাত লাগিয়ে সহযোগিতা করছে আবার কেউ পরামর্শ দিয়ে।  কেউ কেউ চারপাশে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। খুবই আনন্দঘন উৎসবমুখর একটা পরিবেশ। ছোটবেলায় মাটির চুলায় চড়ূইবাতি খেলার কথা মনে পড়ে গেলো। সুন্দরভাবেই রান্নার সমাপ্ত হলো কিন্তু শেষে গিয়ে দেখা গেলো খিচুড়িতে আলুর পরিমান অত্যধিক। যদিও আলু নিয়ে কারো অভিযোগ ছিলোনা। সবাই মাটিতে ম্যাট বিছিয়ে গোল হয়ে খেতে বসলাম।  এরমধ্যে আকাশে চাঁদের আলো ছড়ানো শুরু হয়েছে। মাথার উপরে চাঁদ, একপাশে মেঘনা নদী আরেক পাশে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে এরকম মনোমুগ্ধকর জায়গায় বসে রাতের খাবার খেলাম। প্রত্যেকটা খাবারই যেনো অমৃতের মতো লাগছে। খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, আলু ভর্তা, ডিম ভাজা, টমেটো ভর্তা খেয়ে মনে হচ্ছিলো জীবনের সেরা স্বাদের খাবার আজকেই খাচ্ছি। 

ক্যাম্প ফায়ারের পরিচর্যা। ছবি: তানিম ভাই

খাবার শেষে ওয়াফি ভাই, মুন ভাই ইসমাইল ভাই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলেন। বাকীরা রয়ে গেলাম। গল্প জমে উঠেছে এরকম সময় একজন বললো চা হলে খুব ভালো হতো, বাকীদেরও একমত হতে দেরী হলোনা। তখন রাত ১০ টা পার হয়ে গেছে, আরাফাত ভাইকে ক্যাম্প সাইটে রেখে ওনার বন্ধু লিটন ভাইকে নিয়ে চায়ের সন্ধ্যানে বের হলাম। পাশে একটা ছোট বাজার সেখানে গিয়ে সব দোকান বন্ধ পেয়ে গ্রামের মেঠোপথে, নদী তীর ঘেঁষে চাদের আলোয় হেঁটে হেঁটে ক্যাম্প সাইটে ফিরে এলাম। আবার নতুন করে গল্পের দানা বাধা শুরু হলো। কেউ কেউ বেসুরো গলায় গান গাওয়া শুরু  করলো বাকীরা তাতেই মজে উঠলো। রাত প্রায় ১ টার দিকে সবাই তাঁবুতে প্রবেশ করলাম ঘুমানোর জন্য। আশিক ভাই এক তাঁবুতে, তাহান ভাই এক তাঁবুতে, রাজন ও রাকীব ভাই এক তাঁবুতে, শাহাদাত ও পাভেল ভাই এক তাঁবুতে, তানিম ভাই ওনার তাঁবুতে একা। আমার তাঁবুতে আমি আর আরাফাত ভাই।

ভোর হলো দোড় খোলো। ছবি: লেখক

এখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ার উপক্রম এর মধ্যে তানিম ভাই সবাইকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করতেছে, কতোক্ষণ পরপর এটা ওটা বলেতেছেন। কি সমস্যা বুঝতে পারছিলামনা,পরে আন্দাজ করলাম হয়তো ভয় পাচ্ছে, জিজ্ঞেস করলাম ভাই ভয় পাচ্ছেন?

একা সমস্যা হচ্ছে?

শুভ সকাল প্রকৃতি। ছবি: তানিম ভাই

বেচারা বোধহয় লজ্জায় পড়ে বলছে না ভয় পাচ্ছিনা, কিন্তু যখন বললাম আরাফাত ভাইকে আপনার তাঁবুতে পাঠাবো?

তখন লাজলজ্জার মাথা খেয়ে বললেন উনি কি আসবে? 

তারপর আরাফাত ভাইকে ওনার তাঁবুতে পাঠালাম এরপরে শান্তির ঘুম। আর কোনো আওয়াজ পেলাম না সারারাতে। তখন মনে পড়লো তাঁবু সেট করার সময় থেকেই বারবার ওনার তাঁবুটা মাঝখানে রাখার চেষ্টা করতেছিলেন, কিন্তু তখন কেনো মাঝখানে রাখতে চাচ্ছিলেন এখন সেটা বুঝলাম। 

সকাল বেলার আড্ডা। ছবি: রাকীব ভাই

এরপর বাকীরাত আরামেই ঘুম হলো, সকালে ঘুম থেকে উঠলাম একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে। নদীর তীরে সকাল শুরু হলো  কুয়াশাভেজা প্রকৃতির সাথে। লোকজনের চলাচল শুরু হচ্ছে চারদিকে। কৃষক ছুটছে মাঠে, নদীতে জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা। স্কুল সংলগ্ন মসজিদের মক্তবে ছোট ছোট বাচ্চারা আরবি পড়ার জন্য আসা শুরু করেছে। আমরাও আড়মোড়া ভেঙে সবাইকে ডেকে তুললাম। তাঁবুতে বসে বাইরে তাকিয়ে গল্প হলো কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে বিদায় নেওয়ার পালা। আমি পাভেল ভাই ও শাহাদাত ভাই অফিস থাকাতে সকালেই চলে আসলাম। চান্দেরপাড়া থেকে অটো রিজার্ভ নিয়ে চলে আসলাম মাধবদী বাজারে সেখান থেকে বিআরটিসি এসি বাসে কুড়িল বিশ্বরোড। এই রাস্তায় আসাতে খুবই কম সময় লাগলো।

আমরা ক্যাম্পসাইট ত্যাগ করার পূর্বে আমাদের ব্যবহৃত ময়লা আবর্জনা সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে এসেছি,এই বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। অন্যথায় পরবর্তী প্রজন্ম ঘুরতে যাওয়ার জায়গা খুঁজে পাবেনা।

প্রথম কিস্তি পড়ুন এই লিঙ্কেঃ https://www.vromonguru.com/tour-information/chanderpata-1st/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top