fbpx

শতবর্ষী অনুকূল ঠাকুরের সৎসঙ্গ আশ্রম

সকালের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আবহাওয়া দুপুর আসতে আসতে তপ্ত রোদে পরিণত হল৷ তার মাঝে ছুটে চলছে আমাদের অটো৷ রায় বাহদুর গেট থেকে অটো ভাড়া করলাম পাবনা মানসিক হাসপাতাল আর অনুকূল ঠাকুরে আশ্রম ঘুরার জন্য। ক্রিং ক্রিং বেল দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে সাইকেল। শরতের শুভ্রতা মোড়ানো শহরের আমুদ যেন ভর করেছে চাচা মিয়ার বুড়ো শরীরে। কিছুক্ষণ তার সাথে পাল্লা দিয়ে টানার পর ক্ষেমতা দিল আমাদের অটোয়ালা৷ ততক্ষণে চাচা নিয়া বহুদূরে ধূসর পথের সাথে যেন মিশে গেছে।

অনুকূল ঠাকুরের সৎসঙ্গ আশ্রম। ছবি: লেখক

মেঘ রোদ্দুর খেলা চলছে আকাশ জুড়ে। এবার বিলম্বিত বর্ষায় প্রকৃতির বুকে হাজির হয়েছে এলোমেলো বর্ষা৷ শহরের মানুষ জেগে উঠেছে বৃষ্টিস্নাত একটি বিকালের অপেক্ষায়৷ পাল্লা দিয়ে বাড়ে সূর্যের তেজ, আবার সেই তেজ হারিয়ে মেঘপুঞ্জির আড়ালে৷ প্রকৃতির বুকে এই অদ্ভুত শরৎ দেখার জন্যই বিধাতা হয়তো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। যেন হাতে কলমে দেখিয়ে দিচ্ছেন দেখ মানব তোমরা প্রকৃতির কত বড় নিকৃষ্ট সন্তান৷ মেঘের কোলে এখন রোদ খেলে না বরং মেঘের কালো থাবায় ঢেকে গেছে বেপরোয়া রৌদ্দুর৷

অমৃত বাণী। ছবি: লেখক

এসব ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেলাম কাঙ্খিত গন্তব্যে৷ গন্তব্য পৌঁছে ঐতিহ্য দর্শন করতে ওয়াফি আহমেদের বড় অনাগ্রহ৷ ওয়াফি আহমেদের দেহটা ২৫ বছরের কিন্তু মনের ভিতরে বাস ৬ বছরের শিশুর৷ বডি বিল্ডিং করা পেটানো দেহ দেখলে শুধু তিন গোয়েন্দার মুসা আমান কারেক্টারের কথা মনে পড়ে৷ যেন বইয়ের জগৎ ফুঁড়ে বের হয়ে এসেছে মুসা আমান৷ মুসা আমানরা যে বড় লেভেলর খাদক তাদের সাথে সফরে না বের হলে বুঝা যায় না৷ নেমেই বলে উঠলো দুপুরের খাবারের তো দেরি আছে আমি চটপটি খামু আশিক ভাই৷ চটপটির ঝাঁঝে বলে উঠলো মামা বানিয়েছো বড় বাজে৷ এই বাজে স্বাদ মুখ ধরে রাখলে তো পাপ হয়ে যাবে৷

আশ্রমের পূজো ঘর। ছবি: লেখক

আশেপাশে তাকাতে লাগলো ওয়াফি৷ কুলফি মালাইয়ের পাতিলা দেখে তার চোখ চিক চিক করে জ্বলে উঠলো যেন৷ মুখে ভুবন ভুলানো হাসি৷ আমার মনে হয় কোনদিন ওয়াফি অজ্ঞান হলে পপাই দ্য সেলার ম্যানের মত নাকে বিরিয়ানির প্যাকেট চেপে ধরলে তড়াক করে জ্ঞান ফিরে আসবে৷ প্রতি সফরে খাদ্য বিশেষজ্ঞ হিসাবে তাকে রাখা হয়৷ সে স্বাদ নিয়ে গ্রিন সিগন্যাল দিলে সে খাদ্য খারাপ হতেই পারে না৷ কুলফি মালাই কামড় দিয়ে সে যেন হারিয়ে গেল স্বাদের জগৎতে। চোখে বুজে অনুভব করছে। আর বুড়ো আঙ্গুল উঁচু করে জানান দিল কুলফি মালাই এর স্বাদ গ্রহণ না করলে আমাদের গ্রহিত পাপ হয়ে যাবে৷ কুষ্টিয়ার কুলফি মালাই খেয়েছি, পাবনার কুলফি মালাই এই প্রথম৷ তবে বলতে হবে স্বাদে অতুলনীয়৷

আশ্রমের গম্বুজ সমূহ। ছবি: কায়েস আহমেদ

এবার চল না হয় স্বাদ ভুলে ঘুরে আসি ঠাকুরের আশ্রমে৷ শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র চক্রবতী ছিলেন একজন বাঙালি ধর্মগুরু৷ পাবনার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হেমায়েতপুর গ্রামেই অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম৷ ব্রিটিশ ভারতে ১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এই হেমায়েতপুর গ্রামেই তিনি জন্মগ্রহণ করে৷ মৃত্যুবরণ করেন ১৯৬৯ সালে ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে৷ তিনি সৎসঙ্গ নামের সংগঠনের প্রবর্তক। এই সংগঠন উপমহাদেশে বেশ বিখ্যাত। ভারত থেকেও এখানে দর্শনার্থি আসে দীক্ষা নিতে৷ অনুকূল চক্রবর্তী আর একটি কারণেও বিখ্যাত বটে৷ তিনি পাবনা মানসিক হাসপাতাল তৈরি করার জন্য হেমায়েপুরের তার সম্পত্তি থেকে জায়গা দান করেন।

সৎসঙ্গ সংগঠন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেক বড় রচনা হয়ে যাবে। তৈরি হবে অনেক তর্ক বিতর্ক। সে তর্ক বিতর্কে না গিয়ে না হয় ঘুরে আসি অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম। আজ আশ্রমের ভিতরে বেজায় ভিড় দেখলাম। আমাদের ভাগ্য প্রসন্ন বলতে হবে আশ্রম প্রাঙ্গনে মেলা চলছে। সেখানে আছে ওয়াফির খাদ্য ভাণ্ডার৷ আবার মালাই কুলফির স্বাদে ডুব দিল ওয়াফি। মেলা থেকে একটু সামনে তাকাতে দেখতে পেলাম আশ্রমটি৷

দূর থেকে পথিকের চোখে সৎসঙ্গ আশ্রম। ছবি: লেখক

একেবারে সাদামাটা নিরামিষ টাইপ স্থাপনা বলা চলে৷ নেই কোন উল্লেখ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য। বর্গাকৃতি ভবনের শীর্ষদেশে চারটি ত্রিভুজ আকৃতির ক্রমহ্রাসমান ছাদ দ্বারা আচ্ছাদিত৷ শিখরে ক্ষুদ্রাকৃতির কলস ফিনিয়াল বিশেষ ভাবে আর্কষণ করে৷ কারণ এই রকম নকশা ঢাকার বেশ কয়েক্টা মোগল আমলের মসজিদে দেখেছি৷

আশ্রমের পাশেই অনুকূল ঠাকুরের পূজোর ঘর দেখতে পেলাম। এ ক্ষুদ্র ভবনটি গম্বুজবিশিষ্ট এবং ধনুক বক্র কার্নিশ ও গম্বুজের চারকোণে চারটি দৃষ্টিনন্দন শিখর ধারণ করে এক বৈচিত্রময় বৈশিষ্টের অবতারনা করেছে। অনুকূল ঠাকুরের পিতা মাতার স্মৃতি সংরক্ষণে মূলত এই আশ্রমটি গড়ে তোলা হয়েছে৷ তবে নব নির্মিত সৎসঙ্গ-আশ্রম-মন্দির সমন্বয়ে গঠিত স্থাপনাটা চুম্বকের মত দর্শনার্থিকে আর্কষণ করবে। নির্মাণে বেশ নান্দনিকতার ছোয়া ছিল দেখলেই বুঝা যায়৷

বিদায় সৎসঙ্গ আশ্রম। ছবি: লেখক

আশ্রমের দর্শনার্থিরা খোলা মাঠে শিতল পাটি বিছিয়ে বসেছে। চার পাশে পুলিশের পাহাড়া৷ থাকবেই বা না কেন৷ ২০১৬ সালে এই আশ্রমের এক সেবক কে কুঁপিয়ে হত্যা করা হয়৷ রক্ত রঞ্জিত হয় এই আশ্রমের প্রাঙ্গন জঙ্গিবাদের কড়াল থাবায়৷ অথচ আজ তিন বছর পর এসে এখানে পেলাম না কোন ধর্মে ধর্মে ভেদাভেদ। এই সংঘাত কবে থামবে, আর কত রক্ত ঝড়লে থামবে তার উত্তর আজও খুঁজে ফিরি৷ এবার আশ্রম থেকে বের হয়ে বুক ভরে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের নির্যাস নিলাম। বুকটা ভারি হয়ে গিয়েছিল রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা ভেবে। এবারের গন্তব্য পাবনা মানুসিক হাসপাতাল৷

ফিচার ইমেজ: কায়েস আহমেদ

Back to top