fbpx

ঘোল খেতে ভাগ্যকুল: এক অজানা ঐতিহ্যের সন্ধানে

চান মিয়ার সাথে আমার এক অদ্ভুত সম্পর্ক। দুজন দুই মেরুর মানুষ। একমাত্র ভ্রমণ আমাদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। আর একটা কারণ ও থাকতে পারে সে আর আমি একই জেলার মানুষ। আর নিজের জেলা এক্সপ্লোর করার মত আনন্দ তো হতে পারে না। এমনই এক শুক্রবার প্ল্যান হল ঘোল খেতে যাব ভাগ্যকুল। সাথে অন্বেষণ করবো ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ির ইতিহাস। সেই জমিদার বাড়ির পাশেই নাকি বিক্রমপুর জাদুঘর। এর সাথে আবার যুক্ত হয়েছে নৌকা জাদুঘর। যদিও বেশ কয়েকবার যাওয়া পড়েছে ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি। তবে মাঝে মাঝে পুরানো গন্তব্যেই যেন ফিরে পাই নতুনের স্বাদ।  

যথারীতি শুক্রবার রওনা হলাম ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ির পথে। পোস্তগোলা থেকে বালাসুরের বাসে উঠলাম দুজন। কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ তার ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ গ্রন্থে বলেছিলেন ভাগ্যকুলের এই জমিদার বাড়ি নিয়ে। তার দৃষ্টিতে বিলের ধারে প্যারিস শহর গড়ে উঠেছিল এই মাটির বুকে। হয়তো লেখকের ছোটবেলায় তেমনেই ছিল। আমাদের বের হতে একটু দেরি হওয়ায় রাস্তায় বেশ ভাল জ্যাম পেলাম।

দুপুরের মিষ্টিভোগ। ছবি: লেখক

শুক্রবার জুম্মার নামাজ পড়তে হবে। সে জন্য নেমে গেলাম শ্রীনগর ফেরিঘাটের আগে। জায়গারটার নাম মাসুরগাও। যেখানে নামলাম সেখানে থেকে ডানে একটা রাস্তায় নেমে গেলাম। একদম মেইন রাস্তার কাছ ঘেষা রাস্তায়। এ রাস্তার শুরুতেই আছে অনেক রকম খাবারের দোকান। নামাজের সময় প্রায় হয়ে গেল। আশেপাশের মানুষজনের কাছে মসজিদের সন্ধান করছি। লোকাল গুগল ম্যাপদের জিজ্ঞেস করে পেয়ে গেলাম নূরে ছামাদ জামে মসজিদ।

ঘোল খেতে ভাগ্যকুল। ছবি: লেখক

জুম্মার নামাজ শেষে পেটে ক্ষুধাটা বেশ চাগিয়ে উঠলো। চান মিয়া তার মতই আছে খোঁচাখুঁচির ফুর্তিতে। এই কাজে সে বিশেষ আনন্দ পায়। তপ্ত দুপুর, আশেপাশে গ্রামীণ জনপথ। আমরা হাঁটছি খাদ্যের সন্ধানে। আবার সেই প্রধান সড়কে ফিরতে হল। এখানে বেশ কয়েকটা মিষ্টির দোকান দেখতে পেলাম। একটা দোকানে ঢুকে মিষ্টি দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। পাশের দোকান থেকে বাকরখানি আনালাম। এরপর অর্ডার করলাম ছানার সন্দেশ, স্পঞ্জের রসগোল্লা আর দই। স্বাদে এক কথায় অতুলনীয়। স্পঞ্জের মিষ্টি মুখে দেওয়া মাত্র যেন গলে যাচ্ছে। খাটি দুধের ছানা, দই আর সাথে বাকরখানি যোগ করলো ভিন্ন মাত্রা।

পদ্মার তীরে মেঘের সারি। ছবি: লেখক

দুপুরের ক্ষুধাটা মৃতপ্রায়। পুরোপুরি সমাধি দিতে আমরা ছুটে গেলাম পদ্মার পাড়ের সেই চিত্তরঞ্জনের মিষ্টির দোকানের উদ্দেশে। মাসুরগাও থেকে সরাসরি বালাসুরের রিক্সা নিলাম। রিক্সা ছুটছে গ্রামীণ জনপথের সৌরভ মেখে। এসে পড়লাম পদ্মার একদম পাড় ঘেষা সেই ছোট্ট মিষ্টির দোকানে। ঢাকা থেকে বিশাল বাইকার গ্রুপ এসেছে ঘোলের স্বাদ নিতে।

চিত্তরঞ্জনের দোকানের এক কোণে দুজন বসলাম। এখানকার ঘোল আগে খাওয়া হয়নি। অর্ডার করার এক মিনিটের মধ্যেই এসে পড়লো হীম শীতল ঘোলের গ্ল্যাস। লেবুর টুকরো কাব্যিক ছন্দে ভাসছে ঘোলের উপর। প্রথম চুমুক দিয়ে টক-মিষ্টি একটা স্বাদ পেলাম। ঘোলের সাথে লেবুর ব্লেন্ড এক লোভনীয় বস্তুতে পরিণত করেছে। এই ঘোলের এত সুনাম দূরদূরান্ত থেকে এখানে ছুটে এসে পড়ে পথিক।

উড়ে যায় ভুবন চিল। ছবি: লেখক

এই ঘোলের দোকানের প্রতিষ্ঠাতা চিত্ত রঞ্জন আচার্য প্রয়াণের পর তার তিন ছেলে শক্ত হাতে হাল ধরেছে এই দোকানের। খাঁটি দুধ ও দইয়ের মিশ্রণে এই ঘোল এই জনপথের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়ও বটে। ঘোল খাবার পর পদ্মার পাড়ে চলে এলাম দুজন।

পদ্মার পাড়ের আকাশটা আজ মেঘে ঢাকা ছিল। মেঘ আর জলের মিতালির এক অদ্ভুত দৃশ্য আমাদের পথের সাময়িক বাধা যেন সৃষ্টি করলো। যেন বলতে চাইছে প্রমত্তা পদ্মা হে পথিক আজ এখানে থমকে দাঁড়ালে ক্ষতি কি। উড়ে যায় ভুবন চিল, আকাশে হারিয়েছে আজ জলের মাঝে। এর মাঝেই পথিকের আত্মা বাঁচে। হাতে সময় বেশি নেই তাই এখান থেকে ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি যাবার ডিরেক্ট রিক্সা নিয়ে নিলাম।

ভাগ্যকুলের জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

ভাগ্যকুলের জমিদারদের অনেক জমিদার বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও যদুনাথ রায়ের বাড়ি বিশেষ গুরত্ব রাখে। কারণ এ যে ভাগ্যকুলের শেষ জমিদারের বাড়ি৷ দেখতে দেখতে চলে এলাম ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি। বাড়ির উঠানে প্রবেশ করে আমরা অবাক হয়ে গেলাম। আহা কী সুন্দর জরাজীর্ণ কারুকাজে সজ্জিত পাশাপাশি দুটি বাড়ি৷ আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাচারী ঘর, দূর্গামন্দির, লক্ষ্মীমন্দির। ৷ নানান প্রজাতির দুর্লভ সব ফুল ও ফলজ গাছগাছালি, লতাগুল্মে ভরপুর ভাগ্যকুল প্রাঙ্গন।

বাড়ির পাশে বিশাল পুকুর। পুকুরের চারদিকে শ্বেতপাথরে নির্মাণ করা শানবাঁধানো ঘাট। ঘাট ভিড় করেছে সাম্পান নৌকা। চারদিকে পাখিদের কলকাকলি শব্দে মুখরিত। পুকুরের অথৈ জলে হারিয়ে গেছে চোখজোড়া। এই পুকুরখানা না কি প্রতিকি নৌকা জাদুঘর৷ জমিদার যদুনাথ রায়ের এ বাড়িটির স্মৃতি রক্ষার্থে প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গা জুড়ে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগেও সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে বিক্রমপুর জাদুঘর।

ভাগ্যকুলের জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

দেশ ভাগের পর ভাগ্যকুলের বেশির ভাগ জমিদার দেশত্যাগ করলেও রয়ে গেলেন যদুনাথ রায়। এই মাটির প্রতি তার অন্যরকম টান ছিল। ১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর সরকার থেকে চাপ আসে তার দেশ ত্যাগের ব্যাপারে। কথিত আছে, দেশ ত্যাগের পূর্বে তিনি এ দেশের মাটি অঙ্গে মেখে কেঁদেছিলেন। কলকাতা যাবার পর বেশি দিন বাঁচেননি ভাগ্যকুলের শেষ জমিদার। নবাবগঞ্জের কোকিলপ্যারী জমিদার বাড়ি, তেলিবাড়ি, উকিল বাড়ি সমূহও ভাগ্যকুলের জমিদারদের ছিল৷ এখন সবই কালের স্মৃতি।

ভাগ্যকুলের জমিদাররা ব্রিটিশ আমল থেকেই এই উপমহাদেশে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গ ছিলেন৷ তাদের মতো ধনী বাঙালি বাড়ি তৎকালীন আমলে খুবই কম ছিল৷ জমিদার বংশের সবাই ছিল উচ্চ শিক্ষিত কলকাতা, বিলেত ফেরত সাহেব বাবু। জমিদারদের মধ্যে ব্রিটিশদের তাবেদারি করায় শ্রীনাথ রায় রাজা হিসেবে ভূষিত হন। শ্রীনাথ রায়ের বাড়ি বর্তমানে মুন্সিগঞ্জের র‍্যাব অফিস৷ রাজা শ্রীনাথ রায় ছিলেন ভাগ্যকুলের জমিদারদের মধ্যে সর্বশেষ্ঠ। তিনি ১৮৪১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে ঢাকা ও পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষা লাভ করেন।

বিক্রমপুর জাদুঘর। ছবি: লেখক

ইতিহাসের পাতা থেকে এবার বাস্তবে ফিরলাম। জমিদার বাড়ির নাক বরাবর দেখা যাচ্ছে একটা টকটকে দু’তলা লাল বিল্ডিং। এই সেই আমাদের বিক্রমপুরের ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতির ধারক বাহক বিক্রমপুর জাদুঘর৷ বিক্রমপুরের হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা হয়েছে এই জাদুঘরে। একতলার দুইটি গ্যালারি যদুনাথ রায় ও স্যার জগদীস চন্দ্র বসুর নামে উৎর্সগিত৷ আর দ্বিতীয় তলার গ্যালারিটি মুক্তিযোদ্ধা গ্যালারি নামে নামকরণ করা হয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম হাজার বছরের ইতিহাস৷ নাটেশ্বর ও রঘুরামপুর বিহার থেকে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন এই জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।

দেখতে দেখতে ফেরার যে সময় হয়ে গেল৷ এবার যে ফিরে যেতে হয় পথিকের পথে সেই বন্ধুর পথে। ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ী তুমি থেকো আমার সাথে এই স্মৃতি বিস্মৃতির নগরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top