উপকূলীয় এলাকায় নৌভ্রমণে: বরিশাল থেকে লক্ষ্মীপুর

ছোট বেলা থেকেই নদী দেখে বড় হয়েছি,পদ্মার পাড়ের গ্রামে জন্ম আর বেড়ে ওঠা, হয়তো এজন্যই নদীর প্রতি ভালোবাসাটা জন্মেছে ছোটবেলা থেকে। এখনো নদী পার হয়েই বাড়ি যেতে হয়। কুয়াশা ঘেরা ভোর, স্নিগ্ধ সকাল, তপ্ত দুপুরে চিকচিক করা সোনালী রঙ, কিংবা মায়াবী সূর্যাস্তের সাক্ষী হয়ে এখনো নিত্য পাড়ি দেই পদ্মা। তাই নদীর সাথে সখ্যতা আর ভালোবাসা অটুট অক্ষুণ্ন  রয়েই গেছে।

নদীর পাড়ের দৃশ্য। ছবি: লেখক

যাই হোক আসল কথায় আসা যাক, কুয়াকাটা দুইদিনের ট্যুর শেষ করে আরো এক দিন হাতে রয়ে গেলো তাই ভাবছিলাম ফেরার পথে কোথাও যাওয়া যায় কিনা!

বরগুনা/খুলনা/বাগেরহাট/ভোলা। ভেবেচিন্তে শেষতক ঠিক হলো লক্ষ্মীপুর। অনেক দিন থেকেই ইচ্ছা ছিলো বরিশাল থেকে লক্ষীপুর যাওয়ার। বিশেষ করে ওই রুটে সী-ট্র‍্যাক চলাচল করে শুনে যাওয়ার ইচ্ছেটা জেগেছিলো অনেক আগে থেকেই। সী-ট্র‍্যাকে করে উপকূলীয় এলাকায় নৌভ্রমণ ব্যাপারটাতে আগ্রহী ছিলাম অনেক দিন থেকেই, কিন্তু যাওয়া হচ্ছিলো না বিভিন্ন কারণে। এইবার সুযোগটা আর মিস করতে চাইলাম না। তাই ঠিক করলাম সকালে লক্ষ্মীপুর যাওয়ার, সঙ্গী আশিক সারোয়ার আর ওয়াফি ভাই।

ছুটে চলা গন্তব্যে। ছবি: লেখক

কুয়াকাটা থেকে বরিশাল ফিরে রাতে থাকার জন্য হোটেল খুঁজতেছি শুনে ছোটবোন রাইশা মুক্তা তাঁর বন্ধুদের সাথে বি এম কলেজের হোস্টেলে থাকার ব্যাবস্থা করে দিলো। অল্প খরচে ঘুরাঘুরি যেহেতু আমাদের প্রধান লক্ষ্য, তাই একরাতের হোটেল ভাড়া বেঁচে যাওয়া আমাদের জন্য সৌভাগ্যই বলা যায়। সেইসাথে নতুন পরিবেশে থাকার অভিজ্ঞতাও হবে তাই কেউ অমত করলো না। ব্যাগপত্র হোস্টেলে রেখে গেলাম শহর ঘুরতে। ওয়াফি ভাইয়ের পরিচিত একজনের বাসা কাঠপট্টিতে। গেলাম সেখানে পূজা দেখতে, পূজা দেখে স্ট্রিট ফুড খেতে খেতে মধ্যরাতে বিবির পুকুর পাড়ে আড্ডা দিয়ে ফিরলাম হোস্টেলে। বিবির পুকুর পাড় স্ট্রিট ফুডের জন্য বিখ্যাত, আমরাও দারুন এক খাবার পেলাম। খিচুড়ির সাথে ঘন ডাল আর মুরগির মাংস, উপরে বিভিন্ন মশলা আর সালাদ দিয়ে দারুন মুখরোচক এক উপাদান তৈরি হলো। আশিক ভাই প্রথমে খাবেনা বললেও আমাদের প্রশংসা শুনে আর তৃপ্তি দেখে লোভ সংবরণ করতে পারলেন না।

হোস্টেলে ফিরে পাহাড়াদার কুকুর এর জন্য বেশ বিড়ম্বনাতেই পরেছিলাম। আমরা তিন জন ই নতুন প্রভুভক্ত কুকুর আমাদের কাইকেই ঢুকতে দিচ্ছেনা, রাত ১২ টা পেরিয়ে গেছে। মধুর সমস্যায় পতিত হলাম, আশিক ভাই কুকুরের ভয়ে বের হয়েই যেতে চাইলো। আমরাও রাগ করে চলে যেতে চাইলাম কিন্তু ব্যাগপত্র হোস্টেলে তাই সেটাও করা গেলোনা । কুকুরের ঘেউঘেউ আর আমাদের ডাকাডাকিতে নিচতলায় থাকা একজন বের হয়ে এসে আমাদের উদ্ধার করলেন। তিনজন ঘুমালাম দুই রুমে, ঘাম-গরম আর মশার জন্য স্বরণীয় হয়ে রইলো সেই রাত্রি। খুব কম সময়ই ঘুমাতে পারলাম।  

নদীর পাড়ের দৃশ্য। ছবি: লেখক

দেশের যেকোনো প্রান্তে নৌরুটের যেকোনো তথ্যের জন্য ভরসার অনন্য নাম জাহিদ ইবনে জাহান। রাতে শুয়ে শুয়ে জাহিদ ভাইর কাছ থেকে জানতে পারলাম এখন বরিশাল-লক্ষ্মীপুর রুটে সী-ট্র‍্যাক চলাচল করে না, সকাল ৬ টায় বরিশাল থেকে এম ভি পারিজাত লঞ্চ ছেড়ে যায় লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর ঘাটের উদ্দেশে। এই রুট বরিশাল-চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেছে। ভোর ৫ টায় উঠে প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়ে গেলাম। এই ভোরবেলাতেও লঞ্চ ঘাটে এসে দেখি লোকে লোকারণ্য, হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত চারপাশ। হকারের হাক ডাক, যাত্রীর লঞ্চ ধরার জন্য দৌড়াদৌড়ি, যাত্রী ধরার জন্য লঞ্চ স্টাফের ডাকাডাকি কিংবা টানাটানি। বরিশাল নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটে ছোট ছোট লঞ্চ ছেড়ে যায়, সেইসব লঞ্চে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এই ভোর সকালেও এতো লোকের সমাগম। পল্টুনে ঢুকে দেখি বিভিন্ন বাহারি নাম, রঙ আর ঢঙের বিভিন্ন লঞ্চ। কোনোটা তিনতলা কোনোটা চারতলা। যেগুলো বেশিরভাগই দেশের প্রধান নৌরুট ঢাকা-বরিশাল নৌপথে চলাচল করে। ভাবতে লাগলাম এদের মধ্য থেকেই কোনোটাই হয়তো হবে আমাদের আজকের বাহন, যাতে করে তিন পরিব্রাজক পৌঁছে যাবো বরিশাল থেকে নোয়াখালী অঞ্চলে।

উপকূলীয় এলাকার প্রধান বৈশিষ্ট্য সুপারি গাছ। ছবি: লেখক

কিন্তু খুঁজে খুঁজে আমাদের কাঙ্ক্ষিত এম ভি পারিজাত লঞ্চের দেখা যখন পেলাম কিছুটা আশাহত হলাম হালের চারতলা আর বিশাল বিশাল বিলাসবহুল লঞ্চের কাছে দুইতলা আর সেমি মিডিয়াম লঞ্চকে বাচ্চাই বলা যায়, কিন্তু যেহেতু কোস্টাল এরিয়ায় চলাচলের জন্য আলাদা লাইসেন্স প্রয়োজন হয় এবং পারিজাত লঞ্চ সেই লাইসেন্স প্রাপ্ত তাই খুব একটা বিচলিত হলাম না। লঞ্চে উঠে ঠিক বুঝতে পাচ্ছিলাম না কি কি সিস্টেম বসার। নিচতলায় ডেকে দেখলাম প্লাস্টিকের চেয়ার বসানো, দুইতলায় এক পাশে সোফা একপাশে কেবিন। কিন্তু কোথাও জায়গা খালি নেই, সোফার এরিয়া টোটালি দখল করে রাখছে এক রঙের টিশার্ট পরা এক পিকনিক পার্টির সদস্যরা, ওনারা চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার যাচ্ছেন আনন্দ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। মাস্টার ব্রিজে গিয়ে আসন বিন্যাস আর ব্যাবস্থা সম্পর্কে জানতে পারলাম, কেবিন ব্যাতিত সোফা, চেয়ার, বারান্দা যেখানেই বসেন বা দাঁড়িয়ে থাকেন ভাড়া একই শুধু জায়গাটা দখল করতে হবে আগে থেকে।

জলের মাঝে সবুজ। ছবি: লেখক

তারপর অনেক খুঁজে খুঁজে তিনটা চেয়ার জোগাড় করে আসন পাতলাম মাস্টার ব্রিজের সামনে। সকাল ৬টায় ঠিক সময়মত লঞ্চ ছাড়লো সাথে সাথে শুরু হলো আমাদের জন্য অন্যরকম শান্তিময় চোখ জুড়ানো, প্রাণ জুড়ানো এক নৌভ্রমণ।

প্রবাদ আছে ‘ধান-নদী-খাল তিনে মিলে বরিশাল।’ তো বরিশালের নদী আর খাল যে কতো সুন্দর তা যারা গিয়েছেন তারাই বুঝবেন, এ এমন এক ভ্রমণ যার নেই কোনো তাড়াহুড়ো, নেই ক্লান্তি, নেই কোলাহল, আছে শুধু প্রশান্তি।

জলেই মোদের জীবন সংসার। ছবি: লেখক

যাত্রাপথে একে একে পাড়ি দিলো কীর্তিনখোলা, মাছকাটা, ইলিশা এবং মেঘনা নদী। আমরা মাস্টার ব্রিজের সামনে বসেই উপভোগ করলাম নদীর পাড়ের অপরূপ সব দৃশ্য। এ এমন এক দৃশ্য যাতে প্রকৃতি ও মানবজীবনের পার্থক্য মুছে যায় নদীর দিকে তাকিয়ে থাকার আনন্দে। ঠিক কবে এরকম চমৎকার ভোর আর মনোমুগ্ধকর সকাল উপভোগ করেছি সেটা স্মৃতি হাতড়ে মনে করতে পারলাম না কেউই।

পারিজাতের বারান্দায়। ছবি: জি এম সীমান্ত

পারিজাত ছুটে চলছে নিজ গতিতে আর আমরা উপভোগ করছি কখনো পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া স্বল্প দূরত্বের কোনো ছোট ছোট লঞ্চ বা ট্রলারের গতি অথবা কোনো চরে এই সকাল বেলা মহিষের গড়াগড়ি, নদীতে ভাসমান সংসার আর কখনো কখনো কোন উড়ন্ত পাখির ডানাঝাপ্টার শব্দ।

ভোরে উঠে রওনা দিয়েছি তাই সকালের নাস্তা করা হয়নি, খুঁজে খুঁজে লঞ্চের ক্যান্টিনে গেলাম। সেখানেও প্রচুর ভির। হয়তো অনেকেই আমাদের মতো নাস্তা করার সময় পায়নি, দুই পিস ব্রেড আর ডিম মামলেট ২০ মিনিট সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকে খেয়া আসলাম ৩০ টাকায় সাথে চা ১০ টাকা।

পথিমধ্যে মেহেন্দিগঞ্জ এর পাতারহাট, ভোলার ইলিশা ঘাটে বিরতি দিলো পারিজাত। ইলিশা ঘাটে এসে দেখা পেলাম সী-ট্র‍্যাকের। এখান থেকে ফেরি চলাচল করে এবং সী-ট্র‍্যাক চলাচল করে লক্ষ্মীপুরে। ইলিশা ঘাট থেকে ১:৩০ ঘণ্টা লাগলো শুধুমাত্র মেঘনা পাড়ি দিতে।  সুবিশাল মেঘনার বুক চিরে যার এপার থেকে ওপার দেখা দুষ্কর, এই চ্যানেলের পাশেই বে অব বেঙ্গল তাই চোখ মেললেই সুবিশাল জলরাশি আর জলের উপর রোদের কিরণ যেন সৃষ্টি করেছে সোনালী-মায়াবী আভা যার রেশ শেষ হবার নয়। নদী খুব শান্ত ছিলো তাই নিরাপদেই পাড়ি দিলাম। এখানে হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়লে অথবা নদী উত্তাল হলে কি অবস্থা হবে সেটা ভাবতেই গা শিউরে উঠলো। মেঘনা পাড়ি দেওয়ার কালেই গল্প জমে উঠলো পশ্চিম বঙ্গ থেকে শেকড়ের সন্ধানে ছুটে আসা মধ্যবয়সী এক দম্পতির সাথে। সুলতানী আমল থেকে শুরু করে হালের শিক্ষা ব্যাবস্থা সব কিছু নিয়েই আলাপ হলো।   

গল্পে মশগুল ভ্রমণসঙ্গী। ছবি: লেখক

মেঘনা পাড়ি দিয়েও আরো সবুজ কয়েকটা চর কে পাশ কাটিয়ে এলো আমাদের বহনকারী পারিজাত, সূর্যটা ঘুরে ঘুরে মাথার কাছাকাছি চলে আসার প্রাক্কালে আমরাও নোয়াখালী অঞ্চলের মাটির দেখা পেলাম। সকাল ১১:৩০ মিনিটে সাড়ে চার ঘণ্টার এক স্মরণীয় ভ্রমণ শেষে আমরা লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর ঘাটে নামলাম। প্রথমে সাইজ দেখে আশাহত হলেও যথেষ্ট শক্তিশালীই  মনে হয়েছে এম. ভি. পারিজাত লঞ্চটিকে।

এম ভি পারিজাত। ছবি: জি এম সীমান্ত

ভ্রমণ সময় ২/১০/২০১৭

*লঞ্চের ভাড়া ৩০০ টাকা, অল্প সময়ের পথে ভাড়াটা খুব বেশি মনে হয়েছে। 

*যারা এখান থেকে ঢাকা আসতে চাইবেন তারা মজু চৌধুরী হাট থেকে ৪০ টাকা সি এন জি ভারায় লক্ষীপুর গিয়ে বাসে চলে আসতে পারবেন অথবা চাঁদপুর হয়ে আসতে পারেন।


*আমাদের ভ্রমণ কালীন সময়ে আমরা কোনো অপচনশীল দ্রব্য নদীতে ফেলিনি, আপনারা ও ময়লা না ফেলে পরিবেশ ও নদী দূষণ মুক্ত রাখুন।

ফিচার ছবি: জাকারিয়া পারভেজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top