fbpx

স্বরণীয় বাগেরহাট ভ্রমণ

ষাটগম্বুজ মসজিদ, সুন্দরবন, ঘোড়া দীঘি, দুবলার চর সহ অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্য বিখ্যাত বাগেরহাট জেলা। বেশ কয়েকবার যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও বিভিন্ন কারনে যাওয়া হচ্ছিলো না। তাই গত বছর জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে আশিক ভাইয়ের সাথে বাগেরহাট যাওয়ার একটা পাকা প্ল্যান তৈরি করলাম এবার যাবোই যাবো। যেহেতু খান জাহান আলীর স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক জায়গায় যাবো তাই ঠিক করলাম বাহন ও হবে ঐতিহাসিক।

হুলারহাট ঘাটে রকেট স্টিমার এম ভি মধুমতি। ছবি: লেখক

রকেট স্টিমারে চড়ে যাবো পিরোজপুরের হুলারহাট, স্টিমার থেকে নেমে রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি ও মঠ দেখবো ঘুরে ঘুরে তারপর সারাদিন ঘুরতে ঘুরতে বাগেরহাটের পথে আগাবো। বাগেরহাটে ভ্রমণ পরিকল্পনা এর আগের পূজার ছুটিতেও ছিলো কিন্তু মাঝ নদীতে হঠাৎ বাগেরহাটের প্ল্যান উলটে চলে গিয়েছিলাম কুয়াকাটা। ফেরার পথেও বরিশাল থেকে বাগেরহাট যাওয়ার কথা থাকলেও গিয়েছিলাম লক্ষীপুর। আমাদের প্ল্যান গুলো অনেক সময় এরকম হয়,একজন উল্টাপাল্টা প্রস্তাব করলে বাকীরাও একবাক্যে রাজ্বী হয়ে যায় এবং প্রমান করতে উদগ্রীব থাকে যে আমি ঠিক এটাই বলতে চেয়েছিয়াম।

রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। ছবি: লেখক

এতো পাকাপোক্ত প্ল্যান করার পরেও আশিক ভাইয়ের সাথে জানুয়ারিতেও যাওয়া হলো না, কি এক ঝামেলা যেনো হয়েছিলো। অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো দেশসেরা যাত্রীবাহী নৌযান আধুনিক স্টিমার এম ভি মধুমতির যাত্রাসঙ্গী হয়ে অন্যতম দীর্ঘতম নৌপথে ধান-নদী-খালের বরিশালের সৌন্দর্য দেখার জন্য পাড়ি দিবো বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা, মেঘনা,ডাকাতিয়া,কীর্তনখোলা, সুগন্ধা, বিষখালী , গাবখান , সন্ধ্যা, কালিগঙ্গা, কচা নদী আর উপভোগ করবো স্টিমারের ঐতিহ্যবাহী সব খাবার। পরম যত্নে কামড় দিবো ফিস ফ্রাই কিংবা কাটলেটে আর ডানা ঝাপটানো দেখবো বিভিন্ন জলজ পাখির। সেটাও যখন ভেস্তে গেলো তখন নতুন করে পালে হাওয়া দিলো খলিল ভাই।

ষাটগম্বুজ মসজিদের সম্মুখভাগ। ছবি: লেখক

শেষ পর্যন্ত খলিল ভাইয়ের খোঁচাখুঁচিতে রমজান মাসে এই সুযোগ হয়ে গেলো,সেই সাথে বোনাস হিসেবে নিয়াজ ভাইর নেতৃত্বে তালাশ ভাই, সজীব ভাই, কনক ভাই, টুম্পা আপু আর জাহাজ ফেইল করে পরের লঞ্চে আসা চুলোব্রেটি নয়ন যুক্ত হলেন চাঁদপুর পর্যন্ত। এম ভি মধুমতি জাহাজের সুবিশাল ছাদে ইফতার করলাম বিভিন্ন ফলজ আইটেম দিয়ে আর স্টিমারের মুখরোচক খিচুড়ি দিয়ে হলো রাতের খাবার। মাস্টার ব্রিজের সামনের অংশে বসে শুয়ে চলতে লাগলো আকাশ দেখা নদী দেখা, তারার সাথে গল্প। রাত ১১ টার পরে ওনারা চাঁদপুর নেমে গেলেন। ইলিশ মাছ দিয়ে সেহরি শেষে ফিরতি স্টিমারে ঢাকা ফিরবেন বলে। এবার বাগেরহাটের পথে আমি, সঙ্গী জাহাজী খলিল ভাই।

বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ। ছবি: লেখক

খলিল ভাইর শিফট শেষে ভোররাতে চা পান করতে করতে পরের দিনের প্ল্যান হচ্ছিলো, আমার প্ল্যান হ্যামক ঝুলিয়ে জাহাজের বারান্দায় শুয়ে শুয়ে নদী দেখবো, আর মাঝেমধ্যে ফিস ফ্রাই, কাটলেট, ফিস চিপসে কামড় বসাবো। কিন্তু খলিল ভাই বললো মোটরসাইকেলটা জাহাজেই আছে, আমি বললাম তাহলে হুলারহাট নেমে যাই রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি আর মঠ দেখে বাগেরহাট হয়ে মোড়লগঞ্জ গিয়ে জাহাজে উঠে যাবো, বলতে দেরী খলিল ভাইর রাজী হতে দেরী হলো না। ভদ্রলোকের এককথা, সকাল ১০ টায় জাহাজ হুলারহাট আসতেই নেমে গেলাম হুলারহাট। পিরোজপুর ঘুরে যাত্রা মসজিদের শহর বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে, অবশেষে বাগেরহাট যাত্রা শুরু।

বাগেরহাট জাদুঘর। ছবি: লেখক

বর্ষায় সবুজ সতেজ প্রকৃতি রাতে বৃষ্টি হওয়ার ফলে যেনো আরো বেশি চকচক করছে, হুলারহাট লঞ্চ ঘাট থেকে পিরোজপুর সদর পর্যন্ত রাস্তাটা মন কেড়ে নিলো, পিচঢালা মসৃন রাস্তা পাশেই বয়ে চলেছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী খাল, সেই খালে নৌকায় করে বিভিন্ন পন্য নিয়ে যাচ্ছে লোকজন, বাহারি সব নৌকার ছড়াছড়ি। কেউ হাতে বাওয়া নৌকা নিয়ে যাচ্ছে, কেউ ইঞ্জিনচালিত আবার কেউবা পাল তোলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি, জরাজীর্ণ আর আমাদের অবহেলার স্মৃতি নিয়ে কোনো রকমে টিকে আছে শেষ চিহ্নটুকু তবে মঠের কিছু সংস্কার করা হয়েছে। খুব ভালোভাবেই শুরু হলো যাত্রা আস্তে আস্তে এগিয়ে চলছি আমরা আর প্রকৃতি দেখছি। গ্রাম্য পরিবেশ দুইপাশে গাছগাছালি পরিপূর্ণ মসৃন পিচঢালা রাস্তা। কিন্তু না বাকীপথ টুকু আর এতো মসৃন ছিলোনা। কচুয়া থানায় প্রবেশ করার পরে পথিমধ্যে ঘটে গেলো ভয়ানক দূর্ঘটনা, হঠাৎ সামনে থেকে বাস কে সাইড দিতে গিয়ে বাইক পরে গেলো,চোখের পলকে ঘটে গেলো সব, দুইজন ই রাস্তায় পরে গেছি বাইক চলে গেছে আমাদের রেখে দুই-তিন ফুট সামনে, আশেপাশের মানুষজন দৌড়ে চলে আসছে কিন্তু আমরা এখনো বুঝেই উঠতে পারছিনা কি হলো।

মসজিদ সংলগ্ন ঘোড়াদিঘি। ছবি: লেখক

লোকজন যখন উঠানোর জন্য ধরতে আসলো তখন সম্বিত ফিরে পেলাম, আস্তে আস্তে দাঁড়ালাম দেখি আলহামদুলিল্লাহ দাঁড়াতে পারছি মানে পা আছে, তারপর হাত ঝারা দিলাম দেখি হাতও আছে, খলিল ভাই তখনো উঠে নাই, উঠাতে গেলাম আস্তে আস্তে উঠলো তখনো কি কি হয়েছে টের পাইনি, খলিল ভাই উঠে বলতেছেন আপনার হাতের এই অবস্থা?

ষাটগম্বুজ মসজিদের দেয়াল। ছবি:লেখক

 

আমার ডান হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত অনেকাংশের চামড়া উঠে গেছে, খলিল ভাইর হাঁটুতে বেশি, কনুইতে ও অনেক জায়গায় কেটে গেছে। এবার স্থানীয় রা ধরাধরি করে বাইক তুলে দিলো আমরা আবার উঠে স্টার্ট দিলাম, সামনে এক বাজার থেকে ড্রেসিং করে আবার বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা। লক্ষ্য এবার বাগেরহাট যাবোই। আমাদের এই অবস্থা দেখে সেতুর টোল নিলোনা।

 

খান জাহান আলীর মাজারের প্রবেশপথ। ছবি:লেখক

 

তারপর গিয়ে ঘুরে আসলাম ষাটগম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট জাদুঘর, খান জাহান আলীর মাজার।

ইচ্ছা ছিলো খুলনা গিয়ে সবুজ ভাইর সাথে ইফতার করবো কিন্তু ব্যাথা বাড়তে থাকায় আর খুলনা যাওয়া হয়নি, মোড়লগঞ্জ গিয়ে জাহাজে উঠলাম।

 

মাজার সংলগ্ন ঠাকুর দিঘি। ছবি: লেখক

আমাদের দেখে জাহাজের সবার সেকি উৎকণ্ঠা আর ভয়ার্ত চেহারা, এমন দূর্ঘটনার পরে এতো রাস্তা কিভাবে চালিয়ে আসলাম এটাই যেনো অবিশ্বাস্য ঠেকছিলো সবার কাছে। বাকী দুইদিন জাহাজের মধ্যে এক অতি কষ্টকর মানবিক দৃশ্য সৃষ্টি হয়েছিলো খলিল ভাই আমাকে ড্রেসিং করে দেয় আমি যন্ত্রনায় চোখ-মুখ বন্ধ করে থাকি আবার আমি ড্রেসিং করে দেই উনি চোখ-মুখ বন্ধ করে থাকে।

খান জাহান আলীর মাজার প্রাঙ্গন। ছবি: লেখক

তারপরের দিন জাহাজ রওনা করলো ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রাসঙ্গী আমিও স্বরণীয় বাগেরহাটের স্মৃতি নিয়ে। বাগেরহাট ভ্রমণের জন্য রকেট স্টিমার সবচেয়ে উপভোগ্য কারন একিসাথে বিভিন্ন উপাদান পাওয়া যায়,নদী-প্রকৃতি-খাওয়াদাওয়া এবং যে কেউ বৃহস্পতিবার রকেট স্টিমারে উঠলে পরেরদিন ষাটগম্বুজ মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ আদায় করতে পারবেন।

Back to top