fbpx

নেপালের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প অভিযান-১

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের নিমন্ত্রণে ‘৪র্থ আন্তর্জাতিক অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় উৎসব-২০১৮’তে যোগ দিয়েছিলাম । বাংলাদেশের পর্যটক, ট্রেকার, অনলাইন সাংবাদিকসহ মোট ১৯ জন প্রতিনিধি ছিলেন সে দলে। উৎসবের শেষের ঠিক আগের দিন সকাল ৮:৪৫ মিনিটে পোখরা বিমান বন্দর থেকে ছোট্ট একটা হেলিরাইডে অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পের উদ্দেশে আকাশে ভেসে বেড়াই ।

পাহাড়, সমুদ্র, নদী, গভীর ঘন অরণ্য রহস্যের চাদরে ঢাকা এক দূনির্বার আকর্ষণ যেনো বারে বারে হাতছানি দেয়। ২০০৩ সালে মে মাসে কাঞ্চনজঙ্গার সঙ্গে প্রথম দেখা দার্জিলিংয়ে। একই বছর রুদ্রপ্রয়াগ থেকে মন্দাকিনীর কিনার ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম উত্তরাঞ্চলের চার ধামের অন্যতম হিমালয়ের শৃঙ্গে – তীর্থ কেদারনাথে। গৌরীকুণ্ড থেকে চড়াই-উৎড়াই পথে ২৮ কিলোমিটার পায়ে হাঁটার পথ। সেবারে হিমালয়ের কেদারনাথ শৃঙ্গকে দেখেছিলাম হাতের নাগালের দূরত্ব থেকে। ১২,৬৮৮ ফুট উচুতে শ্বেত-শুভ্র শৈবতীর্থ কেদারনাথ শৃঙ্গ ! ফিরে এসে পেলাম ভোরকে, আমাদের জীবনে। এরপর, এসব উথাল-পাথাল পাগলামির দীর্ঘ বিরতী। তবে কাজের সূত্রে ঘুরে বেরিয়েছি- জলে-জঙ্গলে আর অরণ্যে। অবশেষে ২০১৬ এর জুন মাসের শেষের দিকে হাজির হয়েছিলাম পৃথিবীর স্বর্গ কাশ্মিরে। আবারোও অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানিতে পৌঁছে যাই- ট্রেকারদের স্বর্গরাজ্য – পেহেলগাঁওয়ে। আগে-পিছে তেমন কিছু না ভেবেই লিডার প্যালেসের পরিচালক আশফাককে জানালাম, যেতে চাই শতেক পাহাড় ডিঙ্গিয়ে- তুলিয়ান ভ্যালিতে। আসা যাওয়া ২৪ কিলোমিটার আর পায়ে হাঁটা ৪ কিলোমিটার অতিক্রম করে দেখা পেয়েছিলাম পীর পাঞ্জাল এবং জানাস্কর পাহাড়ের বরফ আর মেঘের মাঝখানে তুলিয়ান লেকের। আহা! ১১০০১ ফুট উঁচুতে অপার্থিব সৌন্দর্যের পান্না রঙের তুলিয়ান লেক। ভেসে আসা সাদা মেঘ দুর্ভেদ্য পাহাড়কে ছুঁয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে । ধূসর পাহাড়ের গাঁ ঘেসে নীচে নেমে আসা সাদা চলন্ত হিমবাহ । বেগুনী আর হলুদ রঙের ছোট ছোট জিপসী ফুলের কার্পেটের মধ্য দিয়ে নেমে আসে স্বর্গের উর্বশী-রুপালী রঙের ঝর্ণাধারা।

চিত্র: অন্নপূর্ণা বেস-ক্যাম্প

এবারের গল্প- নেপাল অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পের শেষের ২ দিনের । গত অক্টোবরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার সহপাঠী আরজুর কাছে গল্প শুনেছিলাম হেলিক্যাপ্টারে অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প যাওয়ার স্বাভাবিক ট্রেকিং মৌসুম হচ্ছে নেপালে অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত। বাকি বছর মৌসুমী ঋতু, ট্রেকিং বা অভিযানের জন্য উপযোগী নয়। নেপালে রওনা হওয়ার পূর্বে আরজু আমাকে ম্যাজেঞ্জারে বলেছিলো- অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প থেকে এভারেস্টকে দেখার জন্যে তাঁকে গুনতে হয়েছে ৩২২ ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২৭,৫০০। তবে লাইফ ‘টাইম এক্সপেরিয়েন্স’। কন্যা ভোরের ইচ্ছে ছিল বাঞ্জি জাম্পিংয়ের। মেয়েটাও কিভাবে যেন দিনে দিনে অ্যাডভেঞ্চারের বন্য আনন্দ পেতে শুরু করেছে। মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরী স্কুলে তখন সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বয়স ১৩ বছর কয়েক মাস। শেষের দিন পোখারায় আমাদের অ্যাকটিভিটিজ ছিল হেলিকপ্টারে অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প যাওয়া আর প্যারা গ্লাইডিং করা। এদিকে ভোর গো ধরে আছে বাঞ্জি জাম্পের জন্যে। মেয়ের এই ভয়াবহ! আবদার পূরণ করতে বাবা, মেয়েকে নিয়ে রওনা দেয় পোখরা বাঞ্জি স্পটে। সম্ভভত বাংলাদেশীদের মধ্যে ভোরই সবচেয়ে কমবয়সে বাঞ্জি দেবার সাহস দেখিয়েছে। শুধু বাঞ্জিই না, সে ট্রিপে ক্লিফ জাম্পিং, র‌্যাফটিং, সিদ্দা কেভ এক্সপ্লোর, ওয়াল ক্লাইম্বিংসহ বেশ কয়েকটা অ্যাকটিভিটিজে সে অংশ নিয়েছে।

দূর্গম প্রকৃতির বন্য সৌন্দর্য, জাগতিক যেকোন কিছুর চেয়ে আমাকে অনেক বেশি মুগ্ধ করে। ট্যুরের শুরুতে সূর্য আমাকে নির্ধারিত খরচের বাইরে ১০০০ ডলার দিয়ে বলেছিলো ‘তোমার কখন কিযে বন্য ইচ্ছে জেগে উঠবে, কে জানে? আর তা না করতে পারলে শেষে আবার মন খারাপ নিয়ে দেশে ফিরতে হবে।’ সে আরো বললো, ‘ভোর আর আমি পোখরায় আছি; তুমি অন্নপূর্ণা বেস ক্যাস্প ঘুরে এসো।’ সূর্যের প্রস্তাব শুনে এক ধরণের সংকোচ কাজ করছিল নিজের মনে – কেবলই মনে হয়েছিল- ‘একা একা এরকম অসাধারণ সৌন্দর্য দেখবো – অথচ সূর্য, ভোর পাশে থাকবেনা!’

চিত্র: রূপালী রাংতায় মোড়ানো অন্নপূর্ণা

নেপাল যাত্রায় অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ৯ মাস বয়সী বাবুজ। চট্টগ্রামের রোটারি ক্লাবের ৫ জন সদস্যও আমন্ত্রিত হয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সহকর্মী সবুজ ভাইয়ের কেওক্রারাডং অভিযাত্রায় সঙ্গী- আনোয়ার ভাইয়ের মাধ্যমে আমাদের এই নিমন্ত্রণ। ২ দিন আমাদেরকে সঙ্গ দিয়ে মেরা পিকের আহবানে শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে আর থাকেননি আনোয়ার ভাই। ঢাকা থেকে রওনা দেওয়ার সময় একধরনের পরিকল্পনা ছিল মাথায় কিন্তু কাঠমুন্ডুতে পৌঁছে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যায় সে পরিকল্পনা ষোল আনাই পাল্টে যায়। নেপালের থামেলে হোটেলে বসে রোল টানা খাতায় ‘৪র্থ আন্তজার্তিক অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় উৎসব-২০১৮’ এর পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে বাংলাদেশে ফেরার আগ পর্যন্ত আগামী ৬ দিনের ক্যালেন্ডার চূড়ান্ত করেছিলাম, আয়োজক – বান্দিপুর ইউনেস্কো ক্লাবের সভাপতি বিষ্ণুকান্ত ধিমারের সঙ্গে। অনেক কাটাকুটির পর আমাদের আরেক সহকর্মী রুহুল ভাই লাল কালি দিয়ে পরিকল্পনাকে লিখে আগ্রহী ২-৩ জনের হাতে দিয়ে দিলেন। আগ্রহী কেউ কেউ স্মার্টফোনে তুলে নিলেন আগামী ৬ দিনের পরিকল্পনা। অনেক কিছুই থাকলো পরিকল্পনায় এমনকি যা ভাবিনি সেরকম কিছু অ্যাডভেঞ্চারও যুক্ত হলো কিন্তু অধরা রয়ে গেলো অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প অভিযাত্রা। বাঞ্জি জাম্পকেও আমাদের পরিকল্পনার অন্তর্ভূক্ত করিনি খুব বেশি দুঃসাহসী বলে।যদিও ভোর ছিল নাছোড়বান্দা- সুযোগ পেলেই বাঞ্জি জাম্পের কথা মনে করিয়ে দেয় আমাদের। ক্লিফ জাম্পিং, র‌্যাফটিং, ওয়াল ক্লাইম্বিং – এসবকিছুতেই যাচ্ছে কিন্তু বাঞ্জি জাম্পের কথা ভুলছে না। অগত্যা আয়োজক বিষ্ণুদার সঙ্গে কথা বললাম, ভোরের জন্যে বাঞ্জি জাম্পিং এর বুকিং দিতে।

নেপালের বান্দিপুরে এশিয়ার ২য় বৃহত্তম – সিদ্দা গুহা অভিযান শেষে দুপুরের রোদে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে হাইওয়ে পেরিয়ে রিসোর্টে ফিরে এলাম। ত্রিশূলী নদীর ধারে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে রওনা দিয়েছিলাম-পোখারার উদ্দেশ্যে। ট্যুরের প্রায় শেষ পর্যায়ে আমরা গিয়েছিলাম পোখরায়। যাত্রা শুরুর প্রায় ঘণ্টা তিনেক পর গাড়ি থেমে যায় পোখরার কিছু আগে। পোখরা রোটারি ক্লাবের বন্ধুরা আমাদের উত্তরী পরিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। রাতে অবস্থানের জন্য আমাদের গাড়ি এগিয়ে যেতে শুরু করে পোখরায় অবস্থিত হোটেল মাউন্টেন ভিউতে। জানালা দিয়ে গাড়ি থেকে সামনের দু’পাশের প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মানুষের জীবনযাত্রা দেখছিলাম। হঠাৎই দৃষ্টিসীমায় দেখতে পেলাম অনেক প্রতিক্ষিত হিমালয়ের অন্যতম শ্বেতশুভ্র – অন্নপূর্ণা রেঞ্জ। উচ্চতায় অন্নপূর্ণার সর্বোচ্চ চূড়ার উচ্চতা ২৬,৫৪৫ ফুট যা উচ্চতায় পৃথিবীতে দশম । গন্ধকী জোনে অবস্থিত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ অন্নপূর্ণা রেঞ্জের রয়েছে ৬টি উচু চূড়া ।

চিত্র: মাচ্ছপুচ্ছর (ফিস টেল) এর শিখর

অন্নপূর্ণা রেঞ্জের বিপরীতে মাচ্ছপুচ্ছর (ফিস টেল) এর শিখর খুব উদ্ধত হয়ে গর্বভরে মাথা উঁচু করে রেখেছে। মাচ্ছপুচ্ছ সম্পর্কে কিংবদন্তী রয়েছে এরকম – ভারতবর্ষের নানারকমের ঐশ্বর্য-সোনাদানার সংগ্রহস্থল হিমালয়ের এ নাগা এলাকাটি। বিভিন্ন ধর্মালম্বমী- হিন্দু, বৌদ্ধ এবং পৌরানিক দেবতাদের আবাসস্থল হলো এ রেঞ্জ আর মাছাপুচ্ছরের শিখাকে ঈশ্বর মনে করা হয় শিবের আবাসস্থল বলে। হিমালয়ের তুষারপাতকে মনে করা হয় ঐশ্বরিক ধূপের ধোয়া।

অন্নপূর্ণা রেঞ্জ এবং মাচ্ছপুচ্ছরকে একঝলক দেখার পর সবকিছুই এলোমেলো হয়ে গেলো আমার। ভুলে গেলাম ‘৪র্থ আন্তজার্তিক অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় উৎসব-২০১৮’ এর নির্ধারিত পরিকল্পনা যা আমি, সবুজ ভাই আর বিষ্ণুকান্ত ধীমারে মিলে থামেলে বসে ঠিক করেছিলাম। মান্নাদের গানের কথার মতো ‘আমি তোমারি দিকটাই নিলাম।’ ট্যুরের সব সদস্যবৃন্দের মধ্যে এক অ্যাডভেঞ্চার পাগল সবুজ ভাইকে কানে কানে বললাম- ‘আমারতো অন্নপূর্ণায় যেতে মন চায়; দুষ্টুমী করে বললাম, “অন্নপূর্ণা আমাকে ডাকছে”।’ সবুজ ভাই আমার আহ্বানে জানালো, ‘তাঁরও মন চায়- অন্নপূর্ণায় যেতে।’ আগে-পিছে না ভেবে তৎক্ষণাৎ ছুটলাম গাড়ির সামনের সিটে বসে থাকা অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পের ব্যবস্থাপক বিষ্ণুদার কাছে। জানালাম, গত অক্টোবর থেকে লালন করা আমার ইচ্ছা- অন্নপূর্ণাকে কাছে থেকে দেখার। আমার আকুলতা দেখে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, ‘হোটেলে ফিরে সন্ধ্যার পর এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে জানাবেন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছি আমরা। হোটেলে ফিরে যাওয়ার আগেই শেষ বিকালের আলো-আঁধারে পোখরার ফেওয়া লেকের পাশে দাঁড়িয়ে মাচ্ছপুচ্ছরে কে দেখছিলাম মুগ্ধ হয়ে। অন্ধকার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টিসীমানা থেকে হারিয়ে যাচ্ছিলো- অন্নপূর্ণা আর মচ্ছপুচ্ছরে। হোটেলে ফিরেই অন্নপূর্ণার বুকিং চূড়ান্ত করতে গিয়ে আগ্রহী আরোহীর সংখ্যা গিয়ে ঠেকলো দুই থেকে সাত-এ। শেষ মূহুর্তে আরো একজন যোগ দিলেন- বিষ্ণুকান্ত ধীমারের স্ত্রী উপাসনা। রিপোর্টিং টাইম -সকাল ৭ টা। নাস্তা সেরে ল্যাগেজ সব প্যাক-আপ করে রেখে দিলাম রোটারি ক্লাবের সভাপতি অনিকের রুমে। অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পের তাপমাত্রা মাইনাসের ঘরে। সঙ্গে একটা হ্যাভারসেকে একটা জ্যাকেট সঙ্গে নিলাম আমাদের সঙ্গী নাসেরা ভাবীর জন্যে। অনিকের দেওয়া বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাটা হ্যাভারসেকে রেখে দিলাম। সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে পোখরা এয়ারপোর্টে বোর্ডিং শেষে হাজির হলাম প্রভু হেলিরাইড সার্ভিসের নির্ধারিত শেডে। অপেক্ষায়মান থেকে দেখছিলাম এয়ারপোর্টে উড়ো-জাহাজের উঠানামা। ইতিমধ্যে সঙ্গী-সহকর্মী ফটোগ্রাফার নওরোজ ভাই একটি জ্যাকেট ও ক্যামেরার কভার আমাকে দিয়ে বললেন- ‘মার্জিয়া আপা, আমরা কিন্তু একসঙ্গে যাচ্ছি। আমিও মনে মনে চেয়েছিলাম ফটোগ্রাফার নওরোজ ভাইয়ের সঙ্গী হতে।

চিত্র: রটোডেনড্রন

চলবে…

(আলোকচিত্র: মোঃ নওরোজ হোসেন)

One thought on “নেপালের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প অভিযান-১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top