fbpx

আন্দামানের রস আইল্যান্ড, নর্থ বে আইল্যান্ড ভ্রমণ

পোর্ট ব্লেয়ারের খুব কাছেই রাজিব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস সেন্টার। একটি বিকেল এখানে অনায়াসেই কাটিয়ে দেয়া যায়। তখন সন্ধ্যা বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। বঙ্গোপসাগরের ঢেউগুলো রাজিব গান্ধীর আবক্ষ ভাস্কর্যের দেয়ালে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আছড়ে পড়ছিল। নিয়নের আলোয় সেই ঢেউগুলো আরো বেশি মোহনীয় রূপে ফুটে উঠেছিল। সন্ধার পর আবেদিন জেটিতে একটা জাহাজ ভিড়ছে। জাহাজে থেকে নেমে আসা পর্যটকদের সাথে কথা বলে জানলাম তার লাইট হাউস থেকে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখে ফিরছে।

বঙ্গোপসাগরের বুকে রাজিব গান্ধীর আবক্ষ ভাস্কর্য

প্রত্যেক পর্যটকদের চোখে মুখে আনন্দের ছাপ দেখেই বুঝা যায় তারা দারুণ একটা সন্ধ্যা উপভোগ করে এলো । খোঁজ নিয়ে জানলাম প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল তিনটার মধ্যে আবেদিন জেটি থেকে রস আইল্যান্ড আর নর্থ বে আইল্যান্ডের উদ্দেশে শিপ ছাড়ে। পরের দিন সকাল আটটার শিপে করে রস আইল্যান্ডের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম।

আবেদিন জেটি থেকে ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছে গেলাম রস আইল্যান্ডে। প্রবেশ মুখেই জাপানি বাঙ্কার পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই রস আইল্যান্ডের ঐতিহাসিক পটভূমির কিছু ধরণা দেয়া আছে । এক ঝলকে চোখ বুলিয়ে দ্বীপের ইতিহাস জেনে নারকেল বিথী ঘেরা সুনসান পথ ধরে চলে এলাম সুইমিং পুল, পানি শোধনাগার প্লানেটের সামনে। ছোট ছোট কুটুরীগুলো গাছের শিকড়ে আচ্ছাদিত হয়ে গেছে।

শিকড়ে চাপা ইতিহাসের গল্প থেকে

আরেকটু সামনে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে প্রধান কমিশনের কার্যালয়, বাসভবন। বৃটিশ প্রশাসন উনিশ শতকের দিকে এখান থেকেই পোর্ট ব্লেয়ারের নিয়ন্ত্রণ করতো। অথচ এখন এখানে কি সুনশান নীরবতা। ভগ্নপ্রায় চার্চের কিছু দেয়াল এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে আছে বলরুম। সেখানে প্রবেশ করার সময় শুকনো পাতার মর্মর ধ্বণি শুনে মনে হলো যেন ভেতরে নৃত্য গীত চলছে। এক দল পাখি ফুরুৎ করে উড়ে গেলো। কেমন এক আশ্চর্য নির্জনতা চারিদিকে।

রস আইল্যান্ডের ভিতরের দৃশ্যপট

ফিরতি পথে হঠাৎ এক দল ময়ুর চোখের সামনে থেকে হেঁটে জঙ্গলে মিলিয়ে গেলো। কয়েকটি হরিণকে দেখলাম ময়দানে বিচরণ করছে। পর্যটকদের আনাগোনা দেখে অভ্যস্থ বলে খুব একটা ভয়ডর নেই। ছোট আয়তনের এই দ্বীপ হেঁটে হেঁটে ঘুরে আসা যায়। তবে পর্যটকদের ঘুরে দেখার জন্য কিছু টুকটুক চলাচল করে। চাইলে সেগুলো ভাড়া করে ঘুরা যায়।

নারিকেল বাগানে আচ্ছাদিত প্রবেশ পথ

রস আইল্যান্ড হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন নগরী। সিপাহী বিদ্রোহের সময় এই রস আইল্যান্ড হয়ে উঠেছিল আন্দামানের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র। বৃটিশরা এখানে গীর্জা, বলরুম,পানি শোধনাগার, সেনা ব্যারাক, গবর্নমেন্ট হাউস, প্রধান কমিশনারের বাস ভবন, টেনিস কোর্ট, ছাপাখানা, কবর স্থান সহ আধুনিক নগরের সকল সুযোগ সুবিধা ছিল এই আইল্যান্ডে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় জাপানিরা এর দখল নেয়। কলক্রমে এখন এর নিয়ন্ত্রণ ইন্ডিয়ান নৌবাহিনীর হাতে। ক্যাপ্টেন ডেনিয়েল রসের নামে নামকরণ করা দেড় বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই আইল্যান্ডে কোন স্থায়ী মনুষ্য বসতি নেই। ১৯৯৩ সাল থেকে পর্যটকদের জন্য এই দ্বীপ উন্মুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রস আইল্যান্ডকে নেতাজি সুবাস বোস আইল্যান্ড নামে নামকরণ করা হয়েছে। এখানের ঘন জঙ্গলে হরিণ আর ময়ুরেরা অবাধে বিচরণ করে। বৃটিশদের বানানো প্রসাদগুলোর ধ্বংসস্তুপ ঘুরে দেখে মনের অজান্তেই সেই প্রাচীন আমলে চলে গিয়েছিলাম।।

রস আইল্যান্ডের প্রবেশ পথ

রস আইল্যান্ড বিচরণ শেষে পরের গন্তব্য নর্থ বে আইল্যান্ড। শিপে উঠার পর নর্থ বে আইল্যান্ড সম্পর্কে একটা ব্রিফিং করা হলো। বেশ কিছু অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটি করার সুযোগ আছে এখানে। একে একে পর্যটকগণ নিজেদের পছন্দের অ্যাডভেঞ্চারে নাম এন্ট্রি করে নিল।নর্থ বে দ্বীপেও কোন মানুষজন নেই। চারপাশে নারকেলের বাগান। এখানে বিভিন্ন ওয়াটার অ্যাক্টিভিটি আছে। স্কুবা ডাইভিং, সি-ওয়াকিং স্নরকেলিংসহ নানা অ্যাক্টিভিটি করতে লোকজন ছুটে আসে। আমি স্কুবা ডাইভিং করতে চলে গেলাম। প্রত্যেকের সাথে একজন দক্ষ ডাইবিং ইন্সট্রাক্টর থাকে। তবে সার্টিফাইড ডাইভারগন ইচ্ছে করলে একা একাই স্কুবা ডাইভিং করতে পারে।

নর্থ বে আইল্যান্ডের জেটি

‘জিন্দেগী না মিলেগি দুবারা’ মুভিতে দেখিছিলাম হৃত্তিক রোশনকে স্কুবা ডাইভিং করাতে ইন্সট্রাক্টর হিসেবে ছিল ক্যাটরিনা কাইফ। বেচারা হৃত্তিক আতঙ্কে জড়োসড়ো হয়ে গেছিল বলে ক্যাট তাকে অভয় দিয়ে সমুদ্রের তলদেশ ঘুড়িয়ে নিয়ে এলো। আমি তো আর হৃত্তিক নই।তাই আমার কপালে ক্যাটের পরিবর্তে ইন্সট্রাক্টর হিসেবে জুটলো কামরান। ইন্সট্রাক্টর সমুদ্র তলদেশে যোগাযোগের আদান প্রদান হিসেবে বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্নের ব্যাবহার কেমনে করতে হয় তা বুঝিয়ে দিলেন । এবার ডুব দেয়ার পালা। কয়েক মিনিটের মধ্যে সমুদ্র তলদেশের আশ্চর্য দোয়ার আমার চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেলো। জীবন্ত কোরাল রীফ,নানা প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী আর রংবেরংয়ের সামুদ্রিক মাছের সাথে আমিও সাঁতার কাটছি। সাংকেতিক চিহ্নের মাধ্যমে ইন্সট্রাক্টরকে আরো ডিপে নিয়ে যাওয়ার কথা বললাম। এভাবেই সমুদ্র তলদেশে প্রায় তিরিশ মিনিট কাটিয়ে দিলাম। প্রবালের ফাঁকে ফাঁকে হাজার প্রজাতির সামুদ্রিক প্রানীর সাথে জলকেলি করার অভিজ্ঞতা কোন দিন ভুলবার নয়।।

স্কুবা ডাইভিং @ নর্থ বে আইল্যান্ড

সমুদ্রের গভীরে যাওয়ার সময় কানের উপর মারাত্মক প্রেশার অনুভব হয়। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। মনে হয় যেন কানের পর্দাগুলো এখনি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। তবে অক্সিজেন মাস্ক শক্ত করে চেপে ধরে জোরে নিশ্বাসের চাপ দিলে সেই প্রেশার আর থাকে না। স্কুবা ডাইভিং আমার অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটির অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা ছিল।

কিভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে আন্দামানের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ারে যেতে হলে বিমানে রাউন্ড খরচ পড়বে ৮ হাজার টাকা। তবে অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় লোকজন শিপে যাওয়ার চেষ্টা করে। জাহাজে করে গভীর সমুদ্র যাত্রার ফিল পেতে হলে আপনাকে ৭২ ঘণ্টা সময় সমুদ্রে কাটাতে হবে। মাসের নির্দিষ্ট সময় কলকাতা থেকে পোর্ট ব্লেয়ারের উদ্দেশে শিপ ছাড়ে। এজন্য আপনাকে ইন্ডিয়ান শিপিং কর্পোরেশনের সাথে যোগাযোগ করে টিকিট ম্যানেজ করতে হবে। পোর্ট ব্লেয়ারের রাজিব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস সেন্টার থেকে রস আইল্যান্ড আর নর্থ বে আইল্যান্ড যেতে শিপের ভাড়া পড়বে ৫০০ রুপি। তবে ওয়াটার অ্যাক্টিভিটির জন্য আলাদাভাবে পে করতে হয়। স্কুবা ডাইভিং করলে খরচ পড়বে ৩৫০০ রুপি আর স্নরকেলিং করতে লাগবে ২০০০ রুপি।। এছাড়াও সি-ওয়াক আর বোটিং করতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top