আনারসের রাজ্য জলছত্র

হরেকরকম বাজারের কথাই বিভিন্ন জায়গায় শুনে থাকি আমরা। এই যেমন সারা বর্ষাকাল জুড়ে বরিশালের ভাসমান পেয়ারা বাজারের গল্প আর ছবিতে অনলাইন দুনিয়া ভরপুর। ভ্রমণপ্রিয় সকলের কভার ফটো আর প্রোফাইল ফটোতেও পেয়ারা বাজারের রঙ বেরঙের বিভিন্ন ছবি শোভা পায়। আজকে আপনাদের শোনাবো আরেক জনপ্রিয় ফল আনারস এবং জলছত্রে গড়ে উঠা আনারসের রাজ্যের গল্প। আনারস খুবই রসালো এবং সুস্বাদু ফল। পুষ্টি-গুনে সমৃদ্ধ বিশেষ উপকারী এই ফল। আনারস এক প্রকারের গুচ্ছফল।এর অন্যান্য নাম – Pineapple,Anannas,Ananus, Bahunetraphalam, Anamnasam । এর বৈজ্ঞানিক নামঃ Ananas comosus (L.) Merr. এই ফলের আদি জন্মস্থল দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ। তবে বর্তমানে ক্রান্তীয় অঞ্চলে বিশ্বের সর্বত্রই এর চাষের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।

আনারস পুষ্টির বেশ বড় একটি উৎস। আনারসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ এবং সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাস। এসব উপাদান আমাদের দেহের পুষ্টির অভাব পূরণে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে, হাড় গঠনে,দাত ও মাড়ি সুরক্ষায়, চোখের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়,হজম শক্তি বাড়ায় এবং রক্ত জমাট বাধায় সাহায্য করে।

বাংলাদেশের বেশ কয়েক এলাকাতেই আনারসের চাষ হয়।এরমধ্যে মধুপুরের আনারসের সুনাম দেশজুড়ে। মধুপুরের পুরোরুনখোলা, আউশনাড়া, ষোলাকুড়ি ইউনিয়নে আনারসের ব্যাপক চাষ হয়। এই এলাকায় উৎপাদিত আনারসের মধ্যে জনপ্রিয় জলডুগি আনারস,এছাড়া বর্তমানে জায়ান্টকিউ আনারস চাষের দিকে ঝুকছেন কৃষকরা। প্রতিবছর বর্ষার সময়ে এমনকি সারাবছর সারাদেশের বাজারে বড় বড় সাইজের যে আনারস দেখা যায় তার অধিকাংশই উৎপন্ন হয় মধুপুর এলাকায়।

ফুল হয়ে সৌরভ ছড়াবো আমি। ছবিঃআজিম রানা

টাংগাইল জেলার মধুপুর উপজেলায় জলছত্র নামক বাজারে আনারসের হাট বসে সপ্তাহে দুইদিন। প্রতি শুক্রবার এবং মঙ্গলবার হাটের দিন। আশেপাশের এলাকার চাষীরা নিজেদের জমিতে উৎপাদিত আনারস বিক্রির উদ্দেশ্যে হাটে এসে উপস্থিত হয়।

ভোর থেকেই শুরু হয়ে যায় ক্রেতা বিক্রেতার সরব উপস্থিতি । দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা আসেন। বিক্রেতারা আসেন নিকটবর্তী দশগ্রাম থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে, সাইকেলে করে,ভ্যানে করে,রিক্সায় করে,পিক আপে ভর্তি করে আনারস নিয়ে। গাছপাকা আনারসে উপচে পরে বাহন মুখভর্তি থাকে নির্মল হাসিতে,আনারসের সাথেই গেথে আছে স্বপ্ন। টাংগাইল-ময়মনসিংহ সড়কেই বসে আনারস কেনাবেচার এই উৎসব। হাট চলাকালীন সময়ে ২৫ মাইলের মোড় থেকে পুলিশ ফাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত হয় পরিধি।

পাখির চোখে আনারস বাগান। ছবিঃ আজিম রানা

যেদিকেই চোখ যায় আনারস আর আনারস,চারদিকে রাস্তার পাশে দোকানের কাছে স্তুপ আকারে রাখা আনারস। কৃষক সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসছে পরম যত্নে বছরধরে যত্ন করে ফলানো আনারস। বড় বড় ট্রাকে-পিক আপ ভর্তি করা হচ্ছে আনারসে। আনারস ঘিরে এরকম বিশাল কর্মজজ্ঞ চলতে পারে এখানে না আসলে এবং স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়।

ভ্যান ভর্তি আনারস। ছবিঃলেখক

আষাঢ়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আনারস পাকার মৌসুম শুরু হয় তবে সারাবছর ই এখানে আনারসের বাজার লেগেই থাকে। গারো বাজার,মধুপুর বাজার, ২৫ মাইল বাজারে আনারসের বেচেকেনা হলেও জলছত্র বাজারেই হয় সবচেয়ে বড় হাট। এখানে থেকে যেকেউ আনাস কিনতেও পারেন তবে এক দুই পিস কিনতে চাইলে সরাসরি কৃষক দের থেকে পারবেন না। পাশেই খুচরা বিক্রেতা আছে তাদের থেকে নিতে হবে। এছাড়াও এই বাজারে কলা,কামরাঙ্গা,আমড়া,কচুর বেচাকেনা হয়।

প্রস্ফুটিত আনারস। ছবিঃআজিম রানা

বাজার দেখা শেষ করে রিক্সা ভ্যানে উঠে চলে যেতে পারেন শালবন পেরিয়ে নিকটবর্তী কোনো এক গ্রামে আনারসের ক্ষেত দেখার জন্য। আসা যাওয়ার পথে চোখে পরবে সাইকেলের দুইপাশে আনারস ঝুলিয়ে নিয়ে আসার চমৎকার দৃশ্য।আমরা গিয়েছিলাম শান্তিনগর গ্রামে,ভ্যান থেকে বটতলা বাজারে নেমে সামনের দিকে কিছুদূর যাওয়ার পরেই শুরু আনারস বাগান। গ্রাম্য মাটির রাস্তার দুইপাশে অজস্র আনারস বাগান।দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে সারি সারি সাজানো আনারস। কোনো গাছে গোলাপী মুকুল ধরেছে কোনোটাতে লালচে ফুল আবার কোনোটাতে সদ্য প্রস্ফুটিত রসালো ফল। আনারস গাছে কাটা থাকায় বাগানে চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।

বাজারে স্তুপিকৃত আনারস। ছবিঃলেখক

এই এলাকার প্রধান চাষাবাদ আনারস। সাথে অনেকেই কলা বা কচুর চাষ করে। আনারস বাগানে প্রবেশ অবশ্যই কৃষকের সাথে কথা বলে অনুমতি নিয়ে বাগানে প্রবেশ করবেন। ওনারা খুবই আন্তরিক, আমাদেরকে নিজের হাতে আনারস কেটে এনে খাইয়েছেন এবং দুপুরে ভাত না খাওয়াতে পেরে খুব ই দুঃখিত হয়েছিলেন।তাই আশা করি কেউ গেলে অবশ্যই অনুমতি নিয়ে বাগানে প্রবেশ করবেন।

যাতায়াতঃ ঢাকা থেকে মধুপুরে যাতায়াতের জন্য সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। মহাখালী থেকে বিনিময়, শুভেচ্ছা কিংবা জামালপুরগামী বাসে মধুপুর নামতে পারবেন। ভাড়া নিবে ১৮০-২৫০ টাকা। কল্যানপুর থেকে সোনিয়া বিনিময় পরিবহনের এসি বাস আছে ধনবাড়ি পর্যন্ত ভাড়া ৪০০ টাকা। যোগাযোগঃ০১৭৩৩ ১৫৫ ৭৫৫
মধুপুর নেমে অটোরিকশা বা ভ্যানে করে আসতে হবে জলছত্র।

বাগানে আনারস খেয়েও তৃপ্তি হয়নি তাই বাজারে আবারো খাওয়া হচ্ছে। ছবিঃলেখল

এছাড়া ঢাকা থেকে এনা,শৌখিন,ইসলাম কিংবা রাজীব বাসে অথবা ট্রেনে ময়মনসিংহ এসে টাংগাইলের প্রান্তিক সুপার বাসে অথবা উত্তরাঞ্চলের যেকোনো বাসে মধুপুর আসা যাবে। ময়মনসিংহ থেকে আসলে জলছত্র বাজারেই নামা যাবে।

আবাসনঃ ঢাকা থেকে ভোরে রওনা করলে দিনে দিনেই ঘুরে আসা যায় জলছত্রের আনারস বাজার। আপনি চাইল্ব রয়েছে থাকার জন্য আবাসিক ব্যাবস্থা। মধুপুরে বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। হোটেল সৈকত, হোটেল আদিত্য, হোটেল ড্রিম টাচ ভাড়া পরবে ২০০-১০০০ টাকা। ভালো মানের থাকার ব্যাবস্থা সাথে ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্বল্প দূরত্বে রয়েছে পার্শ্ববর্তী উপজেলা ধানবাড়ির নবাব প্যালেস। বিস্তারিত জানার জন্য ফেসবুকে পেজে যোগাযোগ করতে পারেন।
পেজলিংকঃ
https://www.facebook.com/pages/Nawab-Ali-Hasan-Ali-Royal-Resort-Dhanbari/257007354320599

এছাড়া পূর্বানুমতি নিয়ে বনবিভাগের কোনো বিশ্রামাগারে থাকতে পারলে আপনার ভ্রমণ পরিপূর্ণ হবে। মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ভেতরে জলই, মহুয়া, বকুল, চুনিয়া কটেজ ছাড়াও দোখলা বন বিশ্রামাগারে রাত যাপন করতে সহকারী বন সংরক্ষক (উত্তর ০১৯১৪৫১৭২৫৬) অথবা টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কার্যালয় (০৯২১-৬৩৫২৪) থেকে অনুমতি নিয়ে বুকিং নিশ্চিত করতে হবে।

সাইকেল ভর্তি ভালোবাসা। ছবিঃলেখক

খাবার দাবারঃ জলছত্র বাজার কিংবা মধুপুর দুই জায়গাতেই পাবেন খাবারের হোটেল। মোটামুটিমানের হোটেল আছে। দুপুরের খাবার পেয়ে যাবেন ১২০-২০০ টাকার মধ্যে।

এটি একটি গ্রাম্য বাজার তাই ভ্রমণকালে স্থানীয়দের সম্মান করবো এবং রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবো। নিজেদের ব্যাবহার করা অপচনশীল দ্রব্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবো।

ভ্রমণরুরু সাইটে প্রকাশিত আমার পোস্ট দেখতে ও পড়তে ক্লিক করুন এই লিংকে https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top