fbpx

ঘূর্ণিঝড় আমপান: আবারও ঢাল হয়ে দাঁড়াবে সুন্দরবন?

গত ২৯ এপ্রিল যখন আমি ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় নিয়ে লিখেছিলাম তখন থেকেই ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস ছিলো। সাধারণত বছরের এই সময়টাই ঘূর্ণিঝড়ের আশংকা বেশি থাকে। যে সময় ধারণা করা হয়েছিলো তার চেয়ে অনেক পরে আসছে ঘূর্ণিঝড়টি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিলো এর গতিপথে বাংলাদেশ থাকবেনা, কিন্তু এখন মোটামুটি নিশ্চিত সোজা দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশ লক্ষ্য করেই আসছে আমপান।

১৯৯১ সালের পর ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে সিডর আঘাত হানে বাংলাদেশে। শক্তিমত্তার বিবেচনায় ৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ের চেয়ে সিডরের শক্তি কোন অংশে কম ছিলোনা। তারপরও সিডরে মানুষের মৃত্যু কম হয়েছে কয়েকটি কারণে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতিও বেড়েছিলো, সেই সাথে সিডরের পথে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড়টির তুলনামূলক দূর্বল হয়ে পড়ে সুন্দরবনে বাধা পেয়ে।

বাংলাদেশের অবস্থান বঙ্গোপোসাগরকে ফানেলের মতো কল্পণা করলে একেবারে ফানেলের মুখটাতেই আমাদের অবস্থান। ফলে সেখানে সৃষ্ট বেশির ভাগ ঘূর্ণিঝড়ের লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ি আমরা। এই আমফানের কথাই ধরেন। এই ঘূর্ণিঝড়টি সৃষ্টি হয়েছে আন্দামানের দ্বীপপুঞ্জের কাছে, যার প্রাথমিক গতিপথ ভাবা হয়েছিলো ওড়িষ্যা। কিন্তু সেটা লাঠিমের মতো ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের দিকেই আসছে।

এখনকার হিসেব অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় আমপান বাংলাদেশের ভুখণ্ডে উঠতে পারে মঙ্গলবার থেকে বুধবার যেকোন সময়ে। ইতিমধ্যে মোংলা ও পায়রা বন্দরকে ৭ নাম্বার এবং কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম সুমুদ্রবন্দরকে ৬ নাম্বার বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হচ্ছে। বর্তমান গতিপথ অনুসারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দীঘা সমুদ্র সৈকত ও বাংলাদেশের হাতিয়া দ্বীপের মধ্যদিয়ে এ ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়বে।

ঘূর্ণিঝড়ের বর্তমান সম্ভাব্য গতিপথ। ছবি: আইএমডিটি

সেক্ষেত্রে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের মধ্যে থাকবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। করোনা মহামারীর কারণে এমনিতেই লকডাউন অবস্থা বিরাজ করছে দেশে। এ পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড় মোটামুটি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘাই বলতে হয়। এদিকে আবার অমাবস্যা কাছাকাছি হবার কারণে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকবে। জোয়ার অবস্থায় ঘূর্ণিঝড় চলে আসলে জলোচ্ছাসের আশংকা থাকে বেশি।

সুন্দরবন এবারও ঢাল হিসেবে দাঁড়াচ্ছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে। কিচুদিন আগেই নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমাতে পেরেছে সুন্দরবন। সিডরের কয়েকদিন পরেই আমার সুন্দরবনে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো, তখন দেখেছিলাম সুন্দরবনের শরণখোলা ও মোংলা রেঞ্জে সিডরের ছোবলে উপড়ে পড়া বিধ্বস্ত সুন্দরবন। কোন রকম মানুষের হাত না পড়ার কারণেই খুব দ্রুতই সেরে উঠেছিলো সুন্দরবন। এরপর ২০০৯ সালে আইলার আঘাতও অনেকাংশে হজম করে সুন্দরবন, উপড়ে যায় এর প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ।

সিডরে ক্ষতিগ্রস্থ জনপদ। ছবি: ইউএনবি

এবারও হয়তো একইভাবে ঝড়ের বড় আঘাতের প্রথম ছোবল হজম করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনটি। লকডাউনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে নেই ট্যুরিস্ট থেকে শুরু করে মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার ও মানুষজন। বনে কর্মরত বিট অফিসাররা জানিয়েছেন বুক ফুলিয়ে সেখানে এখন বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার ঘুরে বেড়াচ্ছে যাদেরকে অনেকদিন তারা দেখতে পায়নি।

করোনার কারণে বাংলাদেশকে এবারের ঘূর্ণিঝড়ের ভিন্ন প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। আপনি যদি উপকূলীয় এলাকায় থাকেন তবে অবশ্যই খোঁজ নিবেন আপনাকে কোন আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হবে। সারা দেশে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১২ হাজার ৭৮ টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া সবসময় ঘূর্ণিঝড়ের সময় যেগুলো মেনে চলতে হয় তা আবার এখানে দিলাম:

ঘূর্ণিঝড়ের আগে:

১. শান্ত থাকবেন, কোন গুজবে কান দিবেন না। শুধুমাত্র বিশ্বস্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত মাধ্যমগুলো থেকে ঘূর্ণিঝড়ের সর্বশেষ খবর নিবেন।

২. মোবাইল ফোন ভালোমতো চার্জ দিয়ে রাখুন। এছাড়া টর্চ লাইট, ব্যটারি এগুলো হাতের কাছে রাখবেন এবং পর্যাপ্ত চার্জ/ব্যটারি আছে কিনা দেখে নিবেন।

৩. মূল্যবান দলিল, টাকা পয়সা, পলিথিনের মধ্যে ভালোভাবে রেখে নিরাপদ জায়গায় রেখে দিন।

৪. প্রয়োজনীয় ঔষধ, কিছু শুকনো খাবার, কিছু জামাকাপড় একটি ব্যাগে (পানি নিরোধক হলে ভালো, না হলে পলিথিনে মুড়িয়ে নিবেন) প্রস্তুত করে রাখুন।

৫. বসতবাড়ি ত্যাগ করার আগে গবাদি পশুর বাঁধন খুলে দিবেন অথবা তাদেরকে নিরাপদ জায়গা রাখবেন।

ঘূর্ণিঝড়ের সময়:

যদি আপনি বাড়িতেই থাকেন তবে বাসার বিদুৎ পানি, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখবেন। কিছুতেই কাঁচা বাড়ি/টিনের ঘরে থাকা যাবেনা। পাকা বাড়িও সুরক্ষিত মনে না হলে ঝড় আসার আগেই আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাবেন। মোবাইলে রেডিও শোনা সম্ভব হলে সেটার ব্যবস্থা রাখুন।

করোনা সতর্কতা:

আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও যথা সম্ভব সামাজিক দূরত্ব রাখার চেষ্টা করুন। সবসময় মাস্ক পরিধান করুন। সাবান বা হ্যান্ড সেনিটাইজার নিয়ে যাবেন যাতে কিছুক্ষণ পর পর হাত পরিস্কার রাখতে পারেন।

এছাড়া আপনার এলকার ঘূর্ণিঝড় ব্যবস্থাপণার সমন্বয়কারী ব্যক্তির মোবাইল নাম্বার সেইভ করে রাখুন।

ঘূর্ণিঝড়ের বর্তমান অবস্থান জানার জন্য একটি বহুল ব্যবহূত অ্যাপস হচ্ছে উইন্ডি। আপনার স্মার্টফোনে এ অ্যাপটি ডাউনলোড করে রাখলে ঘূর্ণিঝড়ের সর্বশেষ অবস্থান দেখতে পাবেন। অ্যাপের লিংক:

অ্যানড্রয়েট:
https://play.google.com/store/apps/details?id=com.windyty.android&hl=en

আইওএস:
https://apps.apple.com/us/app/windy-com/id1161387262

এছাড়া ১০৯০ হটলাইনে সরাসরি ফোন করেও জেনে নিতে পারবেন ঘূর্ণিঝড়ের সর্বশেষ অবস্থান।

Feature photo: windy.com

Back to top