fbpx

শাহজালালের শহরে অবাক ভ্রমণ

জুয়েল ভাইয়ের এখনও কিছু কাজ বাকি। এইটুকু সময় কোথায় যাওয়া যায়। সেই পুরানো গন্তব্য নতুন করে কড়া নাড়া দিল। ডিরেক্ট চলে গেলাম শাহজালালের মাজার। এখানে নতুন করে পুরানো গল্পের ফাঁদে পড়তে ইচ্ছা করছে না। তাই একটু অন্যমনষ্ক ভাব নিয়ে ঘুরলাম। তবে জালালি কবুতরের ছবি তুলতে ভুললাম। পুরা মাজার প্রাঙ্গনে শত শত কবুতর। এরাই তো শাহজালালের সাথে এসেছিল এই দেশে।

শাহজালালের মাজার গেট। ছবি: লেখক

মাজার প্রাঙ্গনের পুকুরের পানি এতটা শেওলা টাইপের সবুজ গজার মাছ দেখতে অনুবিক্ষণ যন্ত্র লাগবে। তাই দেরি না করে উঠে পড়লাম সিঁড়ি বেয়ে উপরে। প্রতিবার এখানে আসলে শাহজালালের এবং সালমান শাহর কবর জিয়ারত করা একটা রুটিন কাজ হয়ে গেছে। এই কবরস্থানে সালমান শাহ ছাড়ার পীর সুফি আউলিয়াদের কবর আছে। বেশ কিছু বুদ্ধিজীবীদের কবরও লক্ষ্য করা যায়।

জালালি কবুতর। ছবি: লেখক

মসজিদ, মাজার, মাদ্রাসা ঘুরে আর এখানে থাকার আগ্রহ পেলাম না। অতি গাজনে সাধু নষ্ট কারবার চলে এখানে। বাহিরে বের হয়ে জুয়েল ভাইকে একটা ফোন দিলাম। উনার অফিসের কাজ শেষ। এবার পানসিতে দুপুরের লাঞ্চ সেরে রওনা হলাম শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে। ছুটে চলছে ত্রিচক্রযান। আজকেই সিলেট শহরে শেষদিন। তাই যতটুকু পার যায় ঘুরে নিচ্ছি।

মাজার। ছবি: লেখক

শাবিপ্রবি প্রকৌশল বিদ্যায় বিশেষ অবদান রেখে বেশ সুনামের সাথে তাদের একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের ২৫শে আগস্ট এবং ১৯৯১ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি তিনটি বিভাগ নিয়ে শাবিপ্রবির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। শাহজালালে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি মূল সিলেট শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কুমারগাওয়ের বৃক্ষের সুশীতল ছায়ানিবির পরিবেশেই গড়ে উঠেছে শাবিপ্রবির ক্যাম্পাস। ওয়েবমেট্রিক্স র‍্যাংকিংয়ে দেশের শীর্ষ স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বেশ ভাল অবস্থানে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়টাতে বর্তমানে ৮টি অনুষদের অধীনে ২৮টি ডিপার্টমেন্ট আছে।

ক্যাম্পাসের সামনে আমি দাঁড়িয়ে। ছবি: জুয়েল রানা

দেখতে দেখতে চলে এলাম শাবিপ্রবির ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাস গেটের সামনে ছবি তুলে প্রবেশ করলাম ভিতরে। এ যে সবুজের লীলাভূমি। চারদিকের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ আমায় আবার ছাত্র জীবনে নিয়ে চলে। আহা আবার যদি নতুন করে সবকিছু শুরু করতে পারতাম। দীর্ঘ এক কিলোমিটার রাস্তার দু পাশ জুড়েই বৃক্ষের সমাহার। বাতাসে গুঞ্জন উঠেছে বৃক্ষের ফিসফাস। শত ব্যস্ততার মাঝে নতুন পথিককে সাদরে গ্রহণ করার জন্যই এই পথের শুরু। এই পথ যদি শেষ না হয় তবে কেমন হবে?  

সেই ১ কিলোমিটার রাস্তা। ছবি: লেখক

কিলোরোডের দু পাশেই স্বচ্ছ পানির লেকে জলজ প্রাণীর বিচরণ। প্রকৃতি আজ মেতে আছে মায়াবি আচরণে। এক কিলোমিটার রাস্তা পারি দেবার পর একটা গোল চত্ত্বর লক্ষ্য করলাম। চেতনা ৭১ নামে এই চত্ত্বরে দুইটি ভাষ্কর্য। একজনের হাতে বাংলাদেশের পতাকা, আর একজনের হাতে জ্ঞানের আলো ছড়ানো বই। খুব সুন্দর কনসেপ্ট।

সাধু সাবধান। ছবি: লেখক

এই চত্ত্বরের পাশেই টিলার উপর শাবিপ্রবির বিখ্যাত শহীদ মিনার অবস্থিত। এই ক্যাম্পাসের প্রতিটা আবাসিক হলের পাশেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন উঁচুনিচু টিলার সমাহার। চায়ের দেশের বিদ্যাপীঠে চা বাগানের পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করতেই যেন সৈয়দ মুজতবা আলী হলের পিছনের টিলায় একখণ্ড চা বাগান গড়ে উঠেছে। সত্যিই সিলেট শহরে এসে শাবিপ্রবির ক্যাম্পাসে না আসলে অনেক কিছু মিস হয়ে যেত।

চেতনা ৭১। ছবি: লেখক

পুরা ক্যাম্পাস এক চক্কর দিয়ে এসে পড়লাম সেই শহীদ মিনারের সিঁড়ির কাছে। একটি দুটি তো নয়, গুণে গুণে ৯৯ ধাপ পাড়ি দিয়ে উঠতে হয় শহীদ মিনারের চূড়ায়। ক্লান্তি আমায় দাও ছুটি। ধীরে ধীরে উপরে উঠা শুরু করলাম দু পথিক। একেবারে চূড়ার পৌঁছানোর পর হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আহা কি সুন্দর নির্মল প্রকৃতি। চারদিকের পরিবেশ আমায় দুদণ্ড শান্তি নিয়ে বসার আহ্বান জানাচ্ছে।

শহীদ মিনারের উপরে উঠার সিঁড়ি। ছবি: জুয়েল রানা

বললতা সেনকে আমি খুঁজিনি এখানে খুঁজলে হয়তো পাওয়া যেতেও পারে। এত উঁচুতে বৃক্ষের ভিড়ে পাখিদের কুহুতানে পবিত্র এক ভাব নিয়ে আসে। এর মাঝেই আমাদের ভাষা আন্দোলনের গর্ব শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা শহীদের কাব্য শোনায়। সবুজ টিলার মাঝে জেগে উঠেছে সারি সারি আকাশমনি, শিশুসহ নানা বৃক্ষের মূল, কাণ্ড, ডালপালা, বাকল, ফুল, ফল এবং পাতা। এখানেই বসে জমে শাবিপ্রবির ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত আড্ডা। এইটি শাবিপ্রবির সংস্কৃতির চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

২০০১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রায় ৩৩ লাখ টাকা নির্মাণ ব্যয়ে শহীদ মিনারটি গড়ে তোলা হয়। ভাষা শহীদের সম্মানার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ ফুট উঁচু টিলায় ৬ হাজার ৮শ ৮৬ বর্গফুট জায়গার উপর এই শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করা হয়। মাটি থেকে এর মোট উচ্চতা সাড়ে ৭৮ ফুট। এর ৯৯টি ধাপ ৩টা ফ্লাইটে বিভক্ত। মূল স্তম্ভটি আরো ৭টি সিঁড়ির উপরে অবস্থিত।

লাল সবুজের মাঝে আদম মানব। ছবি: লেখক

জীবন সুন্দর, পাখির মত সুন্দর, ঐ বৃক্ষের মত সুন্দর। শেষ বিকালের সোনা রোদ উঠেছে আকাশে। সারা দিনের মেঘ বৃষ্টির খেলার অবসানের ডাক দিয়ে জানায় শেষের গান শোনার আহ্বান। এ শহরে আমার বিদায় ঘণ্টা বেজে চলছে মৃদু সুরে। শাবিপ্রবির ক্যাম্পাস থেকে যখন বের হলাম আকাশে আবার মেঘেদের হানা দেখতে পেয়াল। প্রকৃতি তোমায় বোঝা বড় দায়। ক্বীন ব্রিজের যাবার উদ্দেশে আমরা রিক্সা ঠিক করলাম। গল্পটি এখনও শেষ হয়নি। স্মৃতিতে টিকটক করে বাজছে আলী আমজাদের ঘড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top