বাইক ট্যুরে বান্দরবান: ঘরে ফেরার পালা

শৈল প্রপাতের ওপারের পাহাড়ে উঠে আর সামনে যাওয়া হলোনা তাই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছবি তুলে বিশ্রাম নিয়ে ফিরে এলাম শৈল প্রপাতে। শৈল প্রপাত একটি ঝর্ণা কিন্তু এখন শুষ্ক মৌসুম হওয়াতে কোনো পানি নেই। এখানে একটা বাজারের মতো অবস্থা। কেউ পাহাড়ি আনারস, কলা বা পেপের পসরা সাজিয়ে বসেছে কেউ বা হাতে বুনা চাদর, মাফলার, বিছানার চাদরসহ বাশ ও বেতের তৈরি হস্ত শিল্পের বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে বসেছে। এখানে বম সম্প্রদায়ের বসবাস, তাঁরাই মূলত এখানে বিভিন্ন হাতের তৈরি ও নিজেদের ফলানো জিনিসপত্র বিক্রি করে। তবে বেশিরভাগ দোকানী নারী।

পানিবিহীন শৈলপ্রপাত। ছবি: লেখক

আমরা এখানে বেশ কিছুক্ষণ বসলাম। আনারস খেলাম, পেপে খেলাম। পাহাড়ি ফল খেতে দারুন মিষ্টি। জেলা প্রশাসন থেকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ঝর্ণা দেখার জন্য ব্যালকনির মতো বানানো হয়েছে, এখানে সবসময়ই পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। বিশেষ করে রুমা, নীলগিরি থেকে ফেরার পথে চান্দের গাড়ি থামিয়ে সবাই একটু বিশ্রাম নেয় পাহাড়ি ফলের স্বাদ নেয় বা পাহাড়ি স্মৃতি সাথে নিয়ে নেয়।  

পাহাড়ি পণ্যের বাজার। ছবি: লেখক

এখান থেকে আবার শহরে ফিরে এলাম, এবার গন্তব্য নীলাচল। যেহেতু নীলগিরি যাওয়া হয়নি তাই নীলাচল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। নীলাচল বান্দরবান শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়ার পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত একটি পর্যটন কমপ্লেক্স। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ২০০৬ সালে এই কমপ্লেক্স চালু করা হয়। এখানে পর্যটকদের জন্য বেশ কয়েকটি বিশ্রামাগার আছে, এছাড়াও সবচেয়ে উঁচু ভিউ পয়েন্ট, বাচ্চাদের খেলাধুলার ব্যবস্থা, ক্যাফে ও রিসোর্ট রয়েছে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো হয়েছে এই জায়গাগুলো। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই জায়গা থেকে বান্দরবান শহরের চমৎকার একটি দৃশ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে আশেপাশের পাহাড় ও প্রকৃতির বিভিন্ন রকম সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। 

নীলাচলে মেঘে ঢাকা আকাশ। ছবি: আসিফ ভাই

আমরা এখানে প্রবেশ করতেই বিশাল এক ধাক্কা খেলাম, অসংখ্য মানুষজন এখানে। প্রায় সবাই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সফরে এসেছেন। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা এসেছেন। বিভিন্ন স্পটে মাইক নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। আমরা একটু নিরিবিলির খোঁজে আরো সামনের দিকে গেলাম। হেলিপ্যাড পর্যন্ত গিয়ে আসলাম। তারপর ক্যাফের ছাদে উঠে কফি হাতে বসে পড়লাম। এই জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। সামনে পাহাড়সারি আর সেই পাহাড়ের ভাজে ভাজে উড়াউড়ি করছে মেঘেদের দল, ছোট বাচ্চারা যেমন হেসে হেসে চারিদিকে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় ঠিক সেরকম ভাবেই এখানে মেঘেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সারা বিকাল এখানেই বসে রইলাম। হাজারো ভীড়ের মাঝেই নিজেকে নিয়োজিত করলাম নীরবতার খোঁজে। 

নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র। ছবি: লেখক

সন্ধ্যার পরে এখানে থেকে বের হয়ে আসলাম, আসার পথে বন প্রপাত রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলাম। এই রেস্টুরেন্ট ও পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো। বসার জন্য আছে ছোট ছোট কামরা, একটা থেকে আরেকটা আলাদা। আমরা ফ্রেঞ্চফ্রাই আর কফি নিয়ে বসলাম। আলো আঁধারের মাঝে পাহাড়ের বুনো গন্ধ মাখানো জায়গায় কফিতে চুমুক দিয়ে বেশ ভালো লাগলো। চারদিকে অন্ধকার থেকে ভেসে আসছে বিভিন্ন পোকামাকড়ের কিচিরমিচির শব্দ। অনেকটা সময় কাটিয়ে চলে গেলাম রুমে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। 

বন প্রপাত ক্যাফে। ছবি: লেখক

এবার রাতের খাবারের পালা, আসিফ ভাই খাবারের প্রতি বেশ সৌখিন। ভালো ভালো জায়গা খুঁজে খুঁজে খেতে চায়। যদিও ঘুরতে গিয়ে খাওয়া নিয়ে আমার বেশি শৌখিনতা নেই। কোন রকমে খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারলেই হলো তবে ঐতিহ্যবাহী কোন খাবার থাকলে সেটা মিস করতে চাইনা। এবারের গন্তব্য পাহাড়ি ঐতিহ্যে গড়ে তোলা ‘ওয়াইল্ড ক্যাফে’ রেস্টুরেন্ট। স্বর্ণ মন্দির রোডে অবস্থিত। আমরা যেখানে আছি এখান থেকে বেশ দূরে, জিজ্ঞেস করতে করতে আর গুগল ম্যাপ দেখে দেখে চলে গেলাম। 

ওয়াইল্ড ক্যাফে। ছবি: লেখক

একদম নিরিবিলি জায়গায় শহরের কোলাহল আর ভিড় এড়িয়ে খুব যত্ন নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই রেস্টুরেন্ট। অনেক জায়গা নিয়ে বেশ বড় রেস্টুরেন্ট। ঢোকার পথেই অবাক হলাম প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে বিভিন্নরকম সৌন্দর্য বর্ধনকারী উপাদান তৈরি করা হয়েছে। ইন্টেরিয়রে বাশ ও কাঠের ব্যাবহার আর চমৎকার লাইটিং সবমিলিয়ে মন ভালো করার মতো একটা পরিবেশ। আমর খুব বেশি ক্ষুদার্ত ছিলাম না তাই চিকেন বার-বি-কিউ আর রুটি নিলাম। খাবার বেশ মজাদার ছিলো এবং সবচেয়ে ভালো ছিলো তাদের অমায়িক ব্যাবহার। 

কাপ্তাই এ বৃষ্টি বিলাস। ছবি: লেখক

এবার রাতের বেলা বান্দরবান শহর ঘোরার পালা। লাল-সবুজ বাতি দিয়ে শহীদ মিনার সাজানো হয়েছে। এছাড়া ব্রিজ ও আরো কিছু এলাকা ঘুরে রুমে ফিরে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে উঠে ব্যাগপত্র নিয়ে বের হয়ে গেলাম।  তাজিংডং রেস্তোরাঁয় নাস্তা করে নিলাম, আয়ের দিনের মতো রাস্তায় গিয়ে নাস্তা খোজার ঝামেলায় যেতে চাইলাম না। শহর থেকে বের হয়েই নিরব পথে ছুটে চললো দুই চাকার বাহন। আজকে পথ চেনা হওয়াতে খুব তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিলাম। দুয়েক জায়গায় বিশ্রাম নিয়ে আগের মতোই চলে আসলাম কাপ্তাই। 

হ্যামকে প্রশান্তি। ছবি: লেখক

এসেই দেখি প্রশান্তিপার্ক জন সমাগমে পূর্ণ। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সফরে আসা ছাত্রছাত্রীদের মিলন মেলা। আমরা রেস্টুরেন্টে খাবারের অর্ডার দিয়ে  হ্যামক ঝুলিয়ে শুয়ে পড়লাম। হ্যামক একটা ঝুলাতেই পাশ থেকে দুইজন দৌড়ে এসে একটাতে বসতে গিয়ে উল্টে পড়ে গেলো। টেনেটুনে তাকে তুললাম, তারপর সে বললো সে মনে করেছে পার্ক থেকে দেওয়া দোলনা। এটা যে আমাদের শুনে খুব লজ্জা পেলো, তারপর আবার ভালোভাবে বসিয়ে দেওয়ার পরে ছবি তুলে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলেন। আমরা মুরগীর গোশত, সবজি, ডাল দিয়ে দুপুরে খেয়ে নিলাম। খেয়েদেয়ে চলে যাওয়ার কথা কিন্তু গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো, এরমধ্যেই পাল্টে গেলো আশেপাশের সৌন্দর্য। বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে চারপাশে তৈরি হলো মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ। আমরা ঢাকা বা চট্টগ্রাম ফেরার চেয়ে এই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের মাঝে আরো কিছু সময় কাটানোর লোভ সামলারে পারলাম না। তাই আজকেও থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।     

কাপ্তাই লেক। ছবি: লেখক

বিকেলে রাঙ্গামাটি সড়ক থেকে ঘুরে আসলাম, রাস্তায় পাহাড়ি আনারস, কলা খেলাম। সন্ধ্যায় এসে বসলাম কাপ্তাই বাজারের পাশে এক রেস্তোরাঁয়, সেখানে ঝুম বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাবাড় করলাম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, কফি। সেখান থেকে রাতের খাবারের জন্য গ্রিল চিকেন ও পরোটা নিয়ে আসলাম। এর মধ্যে কয়েক পশলা বৃষ্টির ফলে আগের ঠাণ্ডা অনেক বেড়ে গেলো।

আনারসে তৃষ্ণা মিটাই। ছবি: লেখক
কাপ্তাই লেকে সূর্যাস্ত। ছবি: লেখক

এরমধ্যেই পরেরদিন ঢাকায় ফেরার জন্য বাসের টিকেট নিয়ে নিলাম। এতো বড় ব্যাগ নিয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেতে চাইলাম না। রাতে আবার তাঁবু সেট করা হলো, আজকে রাতে ভালো ঘুম হলো। ভোরে উঠে সব গুছিয়ে বের হয়ে গেলাম। কাপ্তাই থেকে ট্যুর অফিসিয়ালি সমাপ্ত করে আমি বাসে উঠে গেলাম। আসিফ ভাই বাইক নিয়ে চলে গেলেন চট্টগ্রাম। শেষ হলো একটি ভ্রমণ কিন্তু জমা হলো চিরদিন মনে রাখার মতো কিছু অমূল্য স্মৃতি।

আসিফ ভাইয়ের বাইক শ্যুট। ছবি: লেখক

ওয়াইল্ড ক্যাফের ফেসবুক পেজ:
https://www.facebook.com/wild.cafe.restaurant/

অন্য পর্ব গুলো দেখুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/tour-information/bike-toure/

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার অন্য সব পোস্ট গুলো দেখুন এই লিঙ্কে: https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top