fbpx

নেপালের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প অভিযান-২

অবশেষে পরপর ২টি চপারে পাইলট ব্যতীত দলের ৪ জন করে ভাগ হয়ে আরোহী নির্ধারণ করা হল। সঙ্গে নেওয়া ছোট ব্যাগ, ওষুধ, পানি, ক্যামেরা ও হ্যাভারসেকসহ ওজন নিয়ে ২য় বারের মতো রেজিস্টারে নাম অন্তর্ভূক্ত করে নিলেন প্রভু হেলিরাইড সার্ভিসের কর্তৃপক্ষ। সকল প্রতীক্ষার অবসান করে চড়ে বসলাম অবশেষে হেলিরাইডে -‘‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার মতো রোমাঞ্চকর হিমাদ্রী শৈল শিখর-দাম্ভিক – অন্নপূর্ণা দর্শনে। ইয়ারফোন কানে জানালার কাঁচ দিয়ে মিলিয়ে নিচ্ছিলাম পাইলটের ধারা বর্ণনা। এক ধরণের ঘোরের মধ্যে ছিলাম – প্রতিদিনের জীবন যাপনের রুটিন ছিড়ে কল্পনার স্বর্গের সিড়িতে যেন অবতরণ করতে যাচ্ছি। হঠাৎ করেই পাইলটের ঘোষণায় নিচের দিকে তাকালাম; ধ্যানভগ্ন ঋষির মতো দেখতে পেলাম রূপালী ফিতার মতো নদীর উপরে পাহাড়ের গা ঘেষে সবুজ গাছের ডালে ডালে লাল-গোলাপী রঙের রটোডেনড্রনের মিছিল। পাইলট বললেন, নদীর কিছুটা উপরে সাদা ফুলগুলো রটোডেনড্রন। গাঢ় লাল রঙের চপারটি ২টি খাড়া পাহাড়ের মধ্য দিয়ে রূপালী নদী কোথাওবা ঝিরি-ঝিরি দূরন্ত ঝর্ণাকে পাশে রেখে গাঢ় নীল আকাশের নিচ দিয়ে উড়ে চলছে অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পের দিকে। সাদা বরফ ঘেরা একটা সবুজ লেক চোখে পড়ছে। নাম জানি না-তিলিচো লেক, গোসাইকুন্ড লেক অথবা বারা লেক – যেকোন একটি হতে পারে।

হেলিকপ্টারের সামনের সিট থেকে তোলা ছবি

আমি বিমূঢ় হয়ে সৌন্দর্য দেখছিলাম চারপাশের প্রকৃতির আর ভাবছিলাম বরফের রাজ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অন্নপূর্ণার কথা। চপারে বসে ট্রেকারদের রাস্তাও দেখতে পেলাম। স্টাইকিং লাঠি, রোদ চশমা আর পিঠে ভারী হ্যাভারসেক নিয়ে পাহাড়ের গা ঘেষে এবড়ো-থেবড়ো পথ বেয়ে দূর্গম পথে এগিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নজয়ের নেশায়। সামনে বসে থেকে গোগ্রাসে সবকিছুর ভিডিও করছিলেন সহকর্মী নওরোজ ভাই। মাঝে-মধ্যে ভিডিও ডিভাইসটি আমার হাতে এগিয়ে দিয়ে, ক্যামেরা ক্লিক করছিলেন। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ম্যাগনোলিয়া, অর্কিড, বিভিন্ন লাইকেন, বাঁশঝাড় আর লতাগুল্ম দিয়ে জড়িয়ে আছে অন্নপূর্ণা সেঞ্চুয়ারী এলাকা। আকাশে পথে অন্নপূর্ণা ব্যাজ-ক্যাম্পে যাওয়ার কারণে নানা রঙের-বর্ণের উদ্ভিদ-প্রাণী, পাখি আর প্রজাপতির মিছিল হয়ে রইলো অধরা।

যেতে যেতে পথে

চারপাশে দৃষ্টি জুড়ে অন্নপূর্ণার হাতছানি। মাথার উপরে নীল ঢেলে দেওয়া গাঢ় রঙের আকাশ আর নিচে লাল-গোলাপী-সাদা রঙের বিভিন্ন জানা-অজানা ফুলের রাজ্য দৃষ্টিসীমায় ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে; নিকটে চলে এসেছে রূপালী রাংতায় মোড়ানো অন্নপূর্ণা। পাইলটের অবতরণে ঘোষণা – মাইনাস ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেট ১৩৫০০ ফুট উঁচুতে গাঢ় লালরঙের চপারটি দ্রুততায় ল্যা- করলো ছোট কৃত্রিম সবুজ ঘাসের কার্পেটের গালিছায়। চারদিকে রূপালি বরফের মাঝে সোনালি রোদের হাতছানি। কি বিস্ময়! কৃতজ্ঞ প্রকাশ করলাম সর্বশ্রেষ্ঠ আর্কিটেক্টকে-যার স্থাপত্য শৈলী আর বিমুর্ত সৌন্দর্যে তাঁর সৃষ্টিকে বিস্ময়ে আর মুগ্ধতায় আমাদের অনুভবকে বিমূঢ় করে।

পর্বতমালা

সাধারণভাবে একঘণ্টা কয়েক মিনিটের পরিভ্রমণ। হেলিরাইডে আসা-যাওয়ার সময় ব্যতীত অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে অবস্থান। পাইলট আামাদেরকে ৩৫ মিনিটের মতো সময় বেঁধে দিয়ে বললেন, ‘তোমরা যতপার অন্নপূর্ণার সৌন্দর্যে অবগাহন করো।’ ফিরতি ট্রিপে অপেক্ষামান আরো ৪ জনকে নিয়ে আকাশে ভেসে গেলেন রাজহংসীর মতো ডানা মেলে। আমাদের সহকর্মী নওরোজ ভাই বিস্ময়ে বিভিন্ন ইংরেজি বিশেষণ প্রকাশ করছেন। ‘মানুষ মরণশীল জেনেও নিজেকে অমর করে রাখতে চায়’ কামাল ভাইয়ের উক্তিকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে বিভিন্ন ভাবে অন্নপূর্ণা, মাচ্ছপুচ্ছর আর দূরের এভারেস্টের সঙেগ ফটো তুলে যাচ্ছি একটার পর একটা । নওরোজ ভাইকে বলছিলাম, ‘এখানে, এভাবে, ওখানে!’ প্যানারোমা ভিউতে রূপালী বরফে মোড়ানো সাদা রঙের হিমালয়ের মাঝখানে রানওয়ের একটুকরা সবুজ ঘাসে বসেও ফটো তুললাম। অবশেষে কয়েক মিনিটের মধ্যে ফটো তোলার পাগলামি শেষ হয়ে এলো। একটু ধাতস্থ হয়ে শুধু বার বার মাথা ঘুরিয়ে আনন্দে, বিস্ময়ে চারপাশের সোনালি রোদে চোখ ঝলসে যাওয়া আলোতে রূপালি অন্নপূর্ণার ক্যানভাস দেখছিলাম! আমি মনে মনে বলছিলাম শরৎচন্দ্রের ভাষায়, ‘আমি পাইলাম, ইহাকে পাইলাম।’ বিভিন্ন রঙিন কাপড় বেঁধে রাখা আছে কিছুটা উপরের মন্দিরের গায়ে গায়ে। নওরোজ ভাই এক-দুই-তিন করে ১০৪০ টি স্থিরচিত্রে ধরে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করলেন অন্নপূর্ণার সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে।

একজন ফটোগ্রাফারের একজীবনের স্বপ্ন- এরকম বিস্ময় আর আর রহস্য ঘেরা একটা ক্যানভাস- অন্নপূর্ণা। অক্সিজেন স্বল্পতায় বুকে কিছুটা চাপ লাগছিল। বিভিন্ন অভিযাত্রীদের সঙ্গে কথা বিনিময় করে গ্রুপ ফটো তুললাম। ভারতের গুজরাটের সবিতার কাছে জানতে পারলাম গত রাতে বেসক্যাম্পের তাপমাত্রা নেমে এসেছিল মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে । সকালবেলায় আবহাওয়া ভালো ছিলনা। ফ্লাই করার সময়ও শুনতে পেলাম- পাইলটের ধারাবর্ণণা। শুরু হয়ে যায় বিরূপ আবহাওয়া অথচ কিছুটা বেলা বয়ে যেতেই সূর্যের রোদের প্রতিফলনে মনে হয়, বরফের বুক ছিড়ে আগুন ধরে গেছে। এ সৌন্দর্য শুধুই অনুভবের, ভাষায় প্রকাশের নয়। কামাল ভাই ও নাছেরা ভাবীর হাত ধরাধরি করে ফটো তুলতে দেখে মনে পড়ে গেলো আবারো সূর্যের কথা। সূর্য রয়ে গেছে পোখরায় পাহাড়ে- ভোরের বাঞ্জি জাম্পিংয়ের জন্য। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম। বেসক্যাম্পে অবস্থানে পাইলটের বেঁধে দেওয়া সময় পেরিয়ে গেছো আরো মিনিট পনেরো আগেই। মনে একটা উৎকণ্ঠা কাজ করছে জোরে সোরেই । আমাদের চার সঙ্গীর এতক্ষণে চলে আসার কথা ছিল অন্য আরেকটি চপারে। অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আরো মিনিট পাচেক পরে চপার ল্যান্ড করলো আমাদের অপর চার সঙ্গীকে নিয়ে। চোখের পলকে একটা গ্রুপ ফটো তুলেই পাইলটের নির্দেশ মেনে উঠে যাই হেলিকপ্টারে। উড্ডয়নের পাঁচমিনিট পরেই কানে লাগানো ফোনে পাইলট ভয় না পাওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। আবহাওয়ার দ্রুত অবনতি হচ্ছে; অন্নপূর্ণা বেজক্যাম্পে অবস্থান করা আরোহীদেরকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসতে হবে। কেবলি মনে হলো আজকের দিনটা কি ছিল শুধু ছিল আমাদের! সোনা রঙের সূর্যের আলোতে অন্নপূর্ণা শুধু আমাদেরই আজ অবারিত ভাবে ধরা দিয়েছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম, আবারো স্রষ্টাকে এবং একই সঙ্গে উৎকন্ঠিত হয়ে থাকলাম বাকী চার সহকর্মীর জন্যে -যাদের রেখে এসেছিলাম বেসক্যাম্পে। বিস্ময়কর অপেক্ষা; আবারো অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি।

হিমালয় বেসক্যাম্পে চপারটি ল্যাণড করার সময় পাইলট বললেন সম্ভাব্য ৩০ মিনিট পর আমাদেরকে এসে নিয়ে যাবেন। এ কথা বলেই উড়াল দিলেন তিনি আকাশে। বেশ পরিপাটি বেসক্যাম্পটি। ছোট রেস্তরা, উঠানে ছড়ানো সাদা রঙের টেবিল দুটোর দুপাশে চারটি করে মোট আটটি চেয়ার। ২ জন বিদেশিনী আমাদের দেখে উঠে গিয়ে একটু দূরে বসে মেতে রইলো নিজেদেরকে নিয়ে। আমাদেরও তাদের দেখার সময় ছিল না। এভারেস্ট ও অন্নপূর্ণা আরোহী আর ট্রেকার যারা যাত্রা বিরতি করে এরকম বেস ক্যাম্পে। সফর সঙ্গী কামাল ভাই রেস্টুরেন্টের রাখা মেনু দেখে চড়া দামে ফ্রেন্স ফ্রাই আর কফির অর্ডার দিলেন। বড় স্টিলের মগের কিছুক্ষণ পরই কফি পেয়ে গেলাম কিন্তু ফ্রেন্স ফ্রাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হলো পাক্কা ২০ মিনিট। ওয়েটার জানালেন উচ্চতার কারণে গ্যাসের চাপ কম তাই আলু ভাজা হচ্ছে না। হিমালয় বেজক্যাম্প থেকে লাল ও গাঢ় গোলাপী রঙের রটডেনড্রনের মিছিল ভালোভাবে নজরে আসে। নওরোজ ভাই পুনরায় ক্যামেরার সাটার খুলে একটার পর একটা ক্লিক করে চলেছে। রয়েল ভুটানের সবুজ চিলি সস দিয়ে ফ্রেন্স ফ্রাই খেতে খেতে মোহিত হয়ে চারপাশের সৌন্দর্য দেখছিলাম।

পাথুরে দেয়াল

ততক্ষণে আমাদের সহযাত্রীদের নিয়ে পাইলট পোখরা এয়ার পোর্টে ল্যান্ড করে। তাদের ফিরে আসতে দেখে সূর্য আর ভোরের প্রতীক্ষা আর উৎকন্ঠা বাড়তে থাকে। ফিরে আসা অন্যান্য সহকর্মীদের কাছেও শুনতে পেল আবহাওয়া প্রতিকূল হয়ে পরার সংবাদ। সকলেরই দুঃশ্চিন্তার বাড়তে থাকে আমাদের ফিরতে না দেখে। অবশেষে ৩৫ মিনিট পর পাইলট উড়ে এসে আমাদেরকে নিয়ে বেজক্যাম্প থেকে ওড়াল দিল পোখরা বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে। নিরাপদে অবতরণ শেষে রানওয়ে পেরিয়ে দেখা হলো আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকা দলের সকলের সঙ্গে। অন্নপূর্ণা বেজক্যাম্প থেকে ফেরার সময় শপথ করলাম দলের অবশিষ্ট সদস্যদেরকে অন্নপূর্ণার গল্প বলবো না, অন্যদের মন খারাপ হবে ‘জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মনে থাকবে অন্নপূর্ণার গল্প। অনুভবে মুগ্ধতার আবেশ রয়ে যাক- ছোটগল্পের মতো – শেষ হইয়াইও হইলো না শেষ।’

(আলোকচিত্র: মোঃ নওরোজ হোসেন)

One thought on “নেপালের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প অভিযান-২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top