তেহজীবের চোখে বাংলাদেশ

পরিচিতি: বাংলাদেশ ও তেহজীব

বাংলাদেশ… আয়তনে মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট একটা দেশ। কিন্তু ছোট্ট এই দেশটা ইতিহাস আর সৌন্দর্যের দিক থেকে অনেক বড়। ৬৪ জেলার সমন্বয়ে গঠিত এই দেশ বৈচিত্র্যের দিক দিয়েও চমক জাগানিয়া। একেক জেলার মানুষ, তাদের আচরণ, সংস্কৃতি, খাবারদাবার সবকিছুতেই আছে ভিন্নতা আর নতুনত্ব। তবে আমরা সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলি। কথা বলার ধরন হয়তো ভিন্ন, তবে আবেদন একই। সেটা ‘খেয়েছেন, খাইছুইন, বা খাইছো নি ক্যান’ যেভাবেই হোক না কেন!

তেহজীব… বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কল্যাণপুরের বাসিন্দা আমাদের ছোট্ট মেয়ে। এই নভেম্বরে পাঁচে পা দিল। ঢাকার একটা মিশনারি স্কুলে এ বছর নার্সারিতে উঠেছে।

কেওক্রাডং, বান্দরবান। ছবি: ইমরান ভাই

ভ্রমণের গল্প:

তেহজীবের বয়স যখন ছয় মাস, তখন থেকেই আমাদের সাথে টুকটাক বেড়াতে যেতো। তার বয়স যখন ২ বছর ৪ মাস, তখন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ট্যুর দিয়ে ভ্রমণ জগতে ঢুকে পড়া। তারপর বাবা-মায়ের সাথে দুই পায়ে চাকা লাগিয়ে ঘোরাঘুরি শুরু। বাচ্চাদের নিয়ে বেড়ানোর সবচেয়ে বড় সমস্য হলো, দীর্ঘ যাত্রায় তারা ক্লান্ত হয় এবং বিরক্ত করে। মাশাল্লাহ এই ক্ষেত্রে তার অসীম ধৈর্য্য। একটানা ১২ ঘণ্টার বাস জার্নি করেও সে হাসিমুখে ঘুরে বেড়িয়েছে। তেহজীব বাস জার্নি পছন্দ করে। ট্রেনে আর লঞ্চে বিরক্ত হয়। ছন্দপতনের স্বভাব যার রক্তে, ছন্দময় আর একঘেয়ে কিছু তার ভালো লাগবেই বা কেন?

মাধবকুণ্ড, মৌলভীবাজার। ছবি: তামান্না আজমী

এমনও হয়েছে যে আমরা একেক দিন একেক জেলায়। রাস্তায় একাধিকবার গাড়ি পাল্টানোর ঝক্কি। পৌঁছেই একটা স্পটে চলে যাওয়া। দিন শেষে আমাদের যখন ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে, সে তখন প্রশ্ন করছে, ‘এরপর কই যাবো, বাবা?’

খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, সিলেট। ছবি: তামান্না আজমী

Travel-freak বাবা-মায়ের Travel-freak, Energetic মেয়ের তাই এই ছোট্ট বয়সেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দাঁড়ানো, জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের মাঝে ঘুরে বেড়ানো, ঝর্ণার খোঁজে ঝিরিতে হাঁটা, সাগরপাড়ে তাঁবুতে থাকা… সবরকম অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছে। শুধু অভিজ্ঞতা বলবো না, অর্জনও বটে। পুরো বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও তার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে।

রাতারগুল, সিলেট। ছবি: পলাশ দাদা
তিন্দু, থানচি, বান্দরবান। ছবি: রাসেল ভাই
জঙ্গলে ভোর হলো, খাদিমনগর, সিলেট। ছবি: তামান্না আজমী

হ্যাঁ! তেহজীব বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় পা ফেলেছে। ৬৪ তম জেলা হিসাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যখন সে পা রাখে, তার বয়স তখন ৫ বছর ১ মাস ৯ দিন। ওর ছোট্ট ছোট্ট পায়ের সাথে আমরাও তাল মিলিয়েছি। সিংহভাগ কৃতিত্ব ওর বাবার, যে বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘোরাফেরার প্যারা নিতে পারে স্বচ্ছন্দে। তাই আমরা একসাথে ৬৪ জেলায় পা রাখতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ!

আলেকজান্ডার ক্যাসেল, ময়মনসিংহ। ছবি: মোস্তাক হোসেন
মহারাজার দীঘি, পঞ্চগড়। ছবি: তামান্না আজমী

তেহজীবের একটা বৈশিষ্ট্য যা না বললেই নয়… এমন হয়েছে অনেক সময় যে খুব কষ্ট করে একটা স্পটে যেয়ে দেখলাম শুধু একটা কাঠামো দাঁড়িয়ে। তেহজীব সেটার ব্যাপারেও অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে, জানতে চায়, বুঝতে চায় সেটা কি ছিল বা কি হয়েছে সেখানে। ওর এই আগ্রহের কারণেই কিন্তু আমরা নির্দ্বিধায় যেকোন জায়গায় যেতে পারি।

ডাইনো পার্ক, কুমিল্লা। ছবি: তামান্না আজমী

ভালো-মন্দ অনুভূতি:

তেহজীব এখনো যথেষ্ট ছোট ওর অভিজ্ঞতা বলার জন্যে। আমি বলতে চাই কিছু। খারাপ লাগাটাই আগে বলি।

মোটামুটি সমগ্র দেশের কোথাও না কোথাও যাওয়া হয়েছে। একটা ব্যাপার দেখলাম সবখানেই এক। স্থানীয় লোকজন খুব কমই জানেন তাদের এলাকায় দর্শনীয় কিছু আছে। যখন এলাকার লোকই ঠিকমতো বলতে পারবেন না, স্বাভাবিকভাবেই পর্যটকের আগ্রহ কমে যাবে। এভাবে একটা দূর্লভ, দুর্মূল্য পর্যটন কেন্দ্র হয়তো শুধুমাত্র অজ্ঞতা, অবহেলা আর প্রচারণার অভাবে হারিয়ে যাবে।

আমাদের দেশে এমন অনেক কিছু আছে যার ঐতিহাসিক মূল্য ব্যাপক। ছোট্ট একটা উদাহরণ দিতে চাই। কলকাতার স্টার জলসায় একটা নাটক হতো, সন্ন্যাসী রাজা। খুব জনপ্রিয় হয়েছিল সেটা। গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ী দেখে ফিরে গুগল করে জানলাম, সেই রাজা আমাদের ভাওয়াল রাজ্যের। আমাদের পাশের দেশ আমাদের রাজার কাহিনী বানিয়ে ব্যবসা করে ফেললো। আমাদের দেশে সেই নাটক দেখতেন এমন অনেক দর্শকই কিন্তু এটা জানেন না।

ভাওয়াল রাজবাড়ি, গাজীপুর। ছবি: মোস্তাক হোসেন

এরকম অনেক স্থাপনা আছে, যেগুলোর ইতিহাস ঘাঁটলে অবাক হতে হয়। কিন্তু সেই জায়গায় কিছুই নেই। যেমন, ঈশা খাঁর এগারো সিন্দুর দূর্গ। স্কুলের বইতে কম পড়েছি? যেয়ে দেখি একটা ঢিবি ছাড়া অবশিষ্ট কিছু নেই। কেন এগুলো এতো অরক্ষিত আর অবহেলিত থাকবে? খারাপ লাগাটা এখানেই।

ভালো লাগা বলতে নিজের ভেতরে একটা ভালো পরিবর্তন অনুভব করা। একসময় মনে হতো অথবা মুখেও বলতাম, এই দেশের কিছুই হবে না। এখন আর এই চিন্তা মাথায়ও আসে না। যে দেশের ইতিহাস এতো গৌরবান্বিত, সৌন্দর্য্য এতো অতুলনীয়, তাকে ঠেকানোর সাধ্য কারো নেই! প্রয়োজন শুধু একটু উদ্যোগ আর আন্তরিকতা।

নাপিত্তাছড়া ট্রেইল, সীতাকুণ্ড। ছবি: মাহবুব ভাই

এই ক্ষেত্রে ইদানীং ট্রাভেল গ্রুপগুলো খুব সক্রিয়। তাদের প্রতি অপার কৃতজ্ঞতা।

হামহাম, শ্রীমঙ্গল। ছবি: রিফাত ভাই

পরিশেষে:

এই ঘোরাঘুরিতে শুধু আমরা তিনজনই ছিলাম না। প্রায় প্রতিটা ট্যুরেই কারো না কারো সাথে আমাদের পরিচয় হয়েছে। সেই পরিচয় পরিচিতিতেই থেমে থাকেনি। অনেকের সাথে আজীবনের সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। অনেকে নিজের আত্মীয়ের মতো সাহায্য করেছেন যখন আমরা তাদের এলাকায় গিয়েছি।

বিশেষ করে তেহজীবকে সবাই যে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়েছে, সেটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ!

সব জেলার উল্লেখ্য ছবিগুলো নিয়ে ভিডিওটা কম্পাইল করার চেষ্টা করেছি। ছবিতে জায়গার নাম উল্লেখ করেছি। শেষ ছবিটা ছাড়া। সেটা আপনাদের জন্যে কুইজ!

ভালো থাকবেন সবাই।

ভিডিওটি দেখতে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে:

তেহজীবের ৬৪ জেলা ভ্রমণ

এছাড়াও আমাদের অন্যান্য ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করুন:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বি:দ্র: আমরা কিন্তু যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলি না। আমাদের বাচ্চা মেয়েটাও এই ব্যাপারে খুবই সচেতন। আপনারাও সচেতন হোন। আমাদের দেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদেরই দায়িত্ব। ধন্যবাদ। 

ফিচার ছবি: তামান্না আজমী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top