fbpx

বন্য সুন্দরী হাম হামের পথে: বের হতে হবে

বর্ষা আসলে প্রকৃতির সব প্রাণীর হৃদয় দুলে উঠে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে যখন হাশফাশ করছিলাম তখনই শুনতে পেলাম এক পাহাড়ী সুন্দরীর কথা। লোকচক্ষুর আড়ালে বহু বছর নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল পাহাড়ী সুন্দরী৷ কোন এক ভরা বর্ষায় তার বুনো যৌবনের রূপ দেখে তৃষ্ণার্ত তার প্রেমিক অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল।

হ্যাঁ সে আর কেউ নয় বন্য সুন্দরী হাম হাম। অবস্থান তার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে কুরমা বন বিট এলাকায়। তবে তাকে দেখতে পাড়ি দিতে হবে সেই সিতাপ পাহাড়ের খাড়া মোকাম টিলা। হাম হামের নাম নিয়ে আছে মজার সব কিংবদন্তি৷

সিলেটি উপভাষায় আ-ম আ-ম শব্দ থেকে আধুনা পর্যটকের ভাষান্তরে হয়ে যায় তা হাম হাম। আ-ম আ-ম এর অর্থ পানির তীব্র শব্দ। আবার কোন কোন ভ্রমণ বিলাসীর মতে গোসলের সাথে সম্পর্কিত হাম্মাম শব্দটি থেকে পরিবর্তিত হয়ে হাম হাম হয়েছে। সে যাই হক স্থানীয় মানুষের কাছে ইহা চিতা ঝর্না নামে বেশ প্রচলিত। এক সময় এ জংগলে চিতা বাঘ পাওয়া যেত বলে এই রকম নামকরণ।

জীবন সংগ্রামকে দেখাচ্ছে কাচকলা। ছবি: লেখক

দেখতে দেখতে চলে আসলো প্রাণের বর্ষা। শ্রাবনের এই ডাকে ঘরে যখন বসে থাকা দায় তখনই ফোন পেলাম জুয়েল রানা ভাইয়ের, আমি শুক্রবার পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল আছি আপনারা আসলে হাম হাম যাব। এই ডাকে সাড়া দিয়ে বড় ভাই তথা আমার ট্রেকিং গুরু ঈসমাইল ভাই তার কর্মচারী রাজীবকে নিয়ে আমরা বের হবার প্ল্যান করলাম।

বাধ সাধলো চির শয়তান চান মিয়া। এ যেন শয়তান নয়, শয়তানের গুরু ঠাকুর। চান মিয়ার কারণে এই ট্যুরের কথা অনেক দিন মনে থাকবে। আমাদের সেই বদ-না চান মিয়া হাম হাম যাবার কথা শুনে প্রথমে মিইয়ে গেলেও পরে কি মনে করে বললো আশিক ভাই আমি আপনাদের সাথে যাব৷ বাসের টিকেট সকালে কেটে ফেললেও হানিফ কাউন্টারে ফোন দিয়ে আর একটা টিকেট রিজার্ভ রাখার কথা বললাম।

কি সুন্দর রাস্তা। ছবি: লেখক

আমাদের বাস ছাড়বে সাড়ে এগারোটায়। চান মিয়া ঠিক নয়টা বাজে ফোন দিয়ে বললো আশিক ভাই বাসায় আব্বা বকছে। যাব না। টিকেট ক্যান্সেল করেন। মনে মনে প্রমোদ গুনি এত বড় দামড়া পোলারেও বাপে বকে। যাক কাউন্টারে ফোন করে টিকেট ক্যান্সেল করলাম। এর খানিকক্ষন পর চান মিয়া আবার ফোন দিয়ে বললো, আশিক ভাই আমি যাব একেবারে নিশ্চিত। বাসের টিকেট কাটেন।

রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠলেও কিছু না বলে আবার হানিফ কাউন্টারে ফোন দিয়ে বললাম, ভাই একটু আগের ক্যান্সেল করা টিকেট আবার কর্নফার্ম করেন। কাউন্টারম্যান বলে উঠলো এটা কি আপনার মামা বাড়ি। আর আমি কি আপনার মামা লাগি৷ অনেক কষ্টে বুঝানোর পর টিকেট কর্নফাম করা গেল। যাক ঘটনা এখানে শেষ হলেও ভাল হত। চান মিয়া আবার ফোন দিয়ে বললো, আশিক ভাই টিকেট ক্যান্সেল করেন। যাব না। মনে হচ্ছিলো ফোনের ভিতর দিয়ে চান বদমাশের টুটিটা টিপে ধরি।

টিলার উপর চা বাগান। ছবি: লেখক

অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে আবার কাউন্টারে ফোন দিলাম। ভাই একটু আগের কনফার্ম করা টিকেটটা আবার ক্যান্সেল করেন। গলা ফাটা একটি আত্ম চিৎকার শুনলাম এরপর পিনপতন নিরবতা। কাউন্টারম্যানের গলা ৩০ সেকেন্ড পরে পেলাম। যাত্রী না পাইলে ড্যামারেজ আপনারা ভরবেন। আর একবার যদি ফোন করেন আমি নিজেই পাবনা যাব। যাক ভাবলাম ঘটনা বুঝি এখানেই শেষ। আমাকে অবাক করে দিয়ে আবার ফোন দিল বদমাশটা। আশিক ভাই আব্বা মানছে। আমি যাব। আমি আর কাউন্টারে ফোন দেবার দুঃসাহস দেখালাম না। বললাম সাথে চলেন যদি টিকেট থাকে তাহলে যাবেন না হয় বাসায় ব্যাক।

সায়েদাবাদ কাউন্টারের পথে রওনা দিলাম ঈসমাইল ভাই, রাজিব, আমি আর চান মিয়া। কাউন্টারে আসার পর প্রথম আমাদের নূরাণী চেহারা দর্শন করে কাউন্টারম্যান ভাইটি আমার প্রীত হইলো। কিন্তু যখনই বললাম ভাই টিকেট লাগবে আমাদের চান মিয়া সাথে যাবে। সে যেন ভাষাহীন এক যুবকে পরিণত হল। দেখলাম বিরবির করে কি যেন বলছে।

লিফট হবে। ছবি: লেখক

আমাদের গালিই দিচ্ছে না কি পাগল হয়ে গেল বুঝলাম না। হয়তো সে পরবাস্তব কোন জগৎতের শূণ্যতার মধ্যে ডুবে ছিল একটু পর যেন বাস্তবে ফিরে এল। আমাদের দিকে নজর দিয়ে মিষ্টি হেসে বললো ভাই আপনারা যখন ৪ জন যাবেন ১১-৩০টার গাড়ি ক্যান্সেল করে স্পেশাল সার্ভিসের টিকেট নেন। সেইটা ১২:১৫ তে ছাড়বে। যাই হক তার কথা মত আমরা টিকেট ক্যান্সেল করে নতুন করে ৪টা টিকেট কাটলাম। স্পেশাল সার্ভিস বাস ১২-১৫ এর বদলে ছাড়লো ১২-৪০ এ। যাত্রাবাড়ি পার হতে হতে রাত ১টা।

এরপর বাসের টান কাকে বলে। মনে হয় উড়ে যাচ্ছে সড়কে। আমি স্পীড মিটারে দেখছি ওস্তাদ ১০০ এর নিচে নামছেন না। উড়ে যায় বকপক্ষী নয় এখানে উড়ে যায় হানিফ। খুব সকালে যখন গাড়ি শ্রীমঙ্গল আসলো তখন ভোরের হালকা শিশিরে নতুন দিনের আহ্বান শুনাতে যেন আমাদের জন্য বসে ছিল। সুপার ভাইজারের শ্রীমঙ্গল ডাকে সবার টনক দিয়ে উঠলো। আড়মোড়া ভেঙ্গের নামলাম বাসে থেকে। আকাশে সূর্যটাও উদয় হয়ে গেছে। এবার যেতে হবে জুয়েলের বারামখানায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top