fbpx

ঘুরে আসি রোমাঞ্চে সাতছড়ির পথে: চল যাই বনে

কথায় আছে প্রচারে প্রসার। ঢাকার এত কাছে হয়েও এত প্রচারের আলোয় আসা হয় নাই সাতছড়ি রিজার্ভ ফরেস্ট। ওয়াইল্ড লাইফকে খুব কাছে থেকে দেখতে হলে আসতে হবে সাতছড়ি। কি নেই এখানে চা বাগান থেকে শুরু করে বিচিত্র সব বন্য প্রাণী, পাখি গাছগাছালী। পর্যটকদের জন্য এখানে আছে তিনটা হাঁটার ট্রেইল (৩০ মিনিট, ১ ঘণ্টা, ৩ ঘণ্টা), ওয়াচ টাওয়ার, বাটারফ্লাই গার্ডেন। যে কোন রিজার্ভ ফরেস্টের মূল আর্কষণ এর ওয়াচ টাওয়ার। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পুরো বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে পারবেন। আর সাথে রোমাঞ্চপ্রেমীদের জন্য যোগ হয়েছে নতুন আর্কষণ, ট্রি এক্টিভিটিস।

সেই রোমাঞ্চকে উপভোগ করতেই আমাদের নিজস্ব গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর দলবল নিয়ে হাজির হয়েছিলাম সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। সেই স্মৃতি রোমন্থন করতেই আজ এত আয়োজন। এবারের দলটা যে বেশ বড় ছিল। চান মিয়া থেকে শুরু করে ফয়সাল, নাদিম টপ সিকরেট, রুবেল, মনা, জিয়াদ, রাজা, তানিম ভাই ছিলেন সঙ্গী। এপ্রিলের ৫ তারিখ সাত সকালে রিজার্ভ মাইক্রো নিয়ে শুরু হয় আমাদের যাত্রা।

সাতছড়ি বনের ট্রেইল। ছবি: লেখক

গাড়ি চলছে হেলেদুলে। সবাই মেতে রয়েছে গল্প, গানের আসরে। রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি ছুয়ে খেলায় গিয়ে আলাপ থামলেও পথের খেলা তো শেষ হয় না। সে জন্যই উত্তম সূচিত্রা গেয়েছিলেন এই পথ যদি শেষ না হয় তবে কেমন হত তুমি বল তো। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার পথের ক্লান্তির পর আমরা ঢুকলাম সাতছড়ির যাবার সড়কে।

এখান থেকে যে সবুজের মায়া ভরা পথ শুরু। চারদিকে সমতলের চা বাগান। আর তার মাঝ দিয়ে একেবেকে যাচ্ছে আমাদের গাড়ি। গ্রীষ্মের প্রায় শুরু হবে তাই রোদের তাপও বেশ ছিল। তবে এই রাস্তায় ঢুকতে সূর্য যেন মিষ্টি হাসি দিয়ে তার হাসি ছড়িয়ে দিল। মিষ্টি সেই রোদের আলো পড়ছে চা গাছের পাতায়। এক বিষণ্ন সবুজের অবছায়া যেন পড়েছে চা বাগানে। যেন জানান দিচ্ছে বসন্তের বিদায়। তবুও সবুজ তো সবুজই। চোখ জুড়ানো সেই সবুজের পথ জুড়ে চা বাগান, ক্রান্তীয় ও মিশ্র চিরহরিৎ পাহাড়ি বনভূমি আর উপজাতীদের বসবাস।

সাতছড়ি বনের ট্রেইল। ছবি: লেখক

মিষ্টি রোদে উত্তাপ ছড়াচ্ছে চারপাশ, তার মাঝেই চোখ পড়লো উঁচু-নিচু টিলার দিকে। রঘুনন্দন পাহাড় যে এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। আর সেখানেই তো সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের অবস্থান। উদ্যানের কাছাকাছি ৯টি চা বাগান আছে। যার মৃদু ঝলক দেখতে দেখতে এলাম আমরা। এর পশ্চিম দিকে সাতছড়ি চা বাগান এবং পূর্ব দিকে চাকলাপুঞ্জি চা বাগান অবস্থিত। আর এই রঘুনন্দন পাহাড়ের গহীনেই যে আছে উপজাতিদের টিপরা পাড়া। যেখানে বাস ২৪টি পরিবারের।

গাড়ি এসে থামলো সাতছড়ির গেটের সামনে। পথের ক্লান্তি ভুলতে কচি, ঝুনা ডাব পানে ব্যস্ত পর্যটকদের রেখে চলে এলাম গেটে। উদ্যানে ঢোকার টিকেটে কেটে ফেললাম। এই গেটের অপর সাইটেই ট্রি এক্টিভিটসের কার্যক্রম চলে। ধীরে ধীরে পুরো দল প্রবেশ করলাম বনে। আহা ঢুকতে এক নির্মল বাতাসের ঝটকা। স্নায়ু টানটান, ইন্দ্রিয় সজাগ। এখনও বনের কাচা রাস্তা শুরু হয়নি। পাকা রাস্তা দিয়ে সামান্য পথ হেঁটে এক ঘণ্টার ট্রেইল লেখা সাইনবোর্ডটি পেলাম। এর কিছুটা সামনে ওয়াচ টাওয়ার। সবাই আগে ওয়াচ টাওয়ার যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সাতছড়ি বনের ট্রেইল। ছবি: লেখক

এই উদ্যানে ১৪৯ প্রজাতির পাখি, ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬ প্রজাতির উভচর প্রাণীর দেখা মেলে সেইটি বোর্ডে পড়ে এসেছিলাম। ওয়াচ টাওয়ারের উপরে উঠার পর যেন এসে পড়লাম অন্য ভুবনে। যেদিকে তাকাই সবুজ আর সবুজ। পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দ মনে নির্মল আনন্দের ধারা বয়ে গেল। এ যে পাখির অভয়াশ্রম। সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত আর আমি প্রকৃতিতে ডুবে যেতে। চারদিকে উঁচু নিচু পাহাড় জুড়ে সবুজ গাছ গাছালি আর জীব বৈচিত্র্য যেন এক বিশাল মন জুড়ানি উঠান।

প্রকৃতি। ছবি: লেখক

ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে ঢুকে গেলাম বনের রাস্তায়। এক ঘণ্টার ট্রেইলে ঢুকিবার মাত্র দেখতে পারলাম মানুষের ভিড়। আমাদের ছোট দল এই ট্রেইলে ঢুকে অবাক। অনেক বেশি মানুষের প্রবেশ ঘটেছে আজ বনে। স্কুলের পিকনিক পাটি থেকে শুরু করে পাড়ার পাংকু ছেলের দল, ফেনী থেকে আগত একদল হুজুর সবাই ঢুকেছে বনে। এত মানুষের ভিড়ে বন্য প্রাণি কি আর দেখা দিবে। বনের নির্জনতা, নিঃশব্দতা গেছে কোন চুলায়, প্রকৃতিপ্রেমীদের বড্ড পুড়ায়। দর দর করে ঘামছি। তবুও কোন বুনো উত্তেজনা জাকিয়ে বসেছে। গহীন বনের এক বিন্দু ছোয়া নিয়ে হাজির হল যেন সাতছড়ি।

সূর্যের আলো চুয়িয়ে পড়ে বনে। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

সাতটি পাহাড়ি ছড়া নিয়েই তো এই সাতছড়ির নাম। সেই ছড়ার ছিটেফোঁটা দেখা গেলেও পানিশূণ্য হাহাকার যেন জানান দিচ্ছে বন্য প্রাণিদের বোবা চিৎকার। হেঁটে যাচ্ছি যেন অনন্তকাল ধরে অথচ এখনও আধা ঘণ্টাও হয়নি। চারপাশে নাম না জানা অনেক গাছ, তার মাঝে এবড়োখেবড়ো রাস্তা, সামান্য চৎড়াই উতরাই হাইকিংয়ের আনন্দ এনে দিচ্ছে। তবে এ পথের শেষ যে হয় না। গাইড ছাড়া ঢুকলে এই তো সমস্যা। নাহি পাই পথের শুরু নাহি পাই তার শেষ। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে যেন পৌঁছে গেলাম চিকচিক করা সাদা বালুর রাজ্যে।

এতদূর এসে আত্ম উপলব্ধি হল এবার ফিরে যাওয়া উচিত। যে পথে এলাম সে পথেই রওনা হলাম। দলের সবাই ক্লান্ত। এদের মধ্যে অধিক ওজনের মানুষ বেশি রকম ক্লান্ত আর চিকনি-চামেলিরা শান্ত। তবুও হয়নি এ পথে ভ্রান্ত। কারণ সেই পাংকু ছেলেদের দলদের যে পিছে দেখতে পেলাম। মানে আমরা ঠিক পথেই আছি। হাঁটতে হাঁটতে আশায় রইলাম বনে পশু পাখি দেখবো। সে আশায় গুড়ে বালিই বলতে হবে।

লজ্জা ঢাকে পাতা। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

অথচ বোর্ডে লেখা ছিল এই বনে লজ্জাবতী বানর, উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, শিয়াল, কুলু বানর, মেছোবাঘ, মায়া হরিণ ইত্যাদি; সরীসৃপের মধ্যে সাপ; পাখির মধ্যে কাও ধনেশ, বনমোরগ, লালমাথা ট্রগন, কাঠ ঠোকরা, ময়না, ভিমরাজ, শ্যামা, ঝুটিপাঙ্গা, শালিক, হলদে পাখি, টিয়া প্রভৃতির আবাস রয়েছে। এছাড়া গাছে গাছে আশ্রয় নিয়েছে অগণিত পোকামাকড়, ঝিঁঝিঁ পোকা ইত্যাদি।

গাছ যদিও অতটা চিনি না। তবুও শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, পাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, ডুমুর, জাম, জামরুল, সিধাজারুল, আওয়াল, মালেকাস, ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি, বাঁশ গাছগুলো চিনতে পারলাম আর কত অগণিত গাছ যে এ বনে রয়েছে সে হিসাব আর কত করি। হিসাব না হোক দেখতে দেখতে চলে এলাম আমরা বনের সেই পাকা রাস্তায়। এবার গল্পের অপর অংশের জন্য পা বাড়ালাম ট্রি এক্টিভিটিসের দিকে।

আসন পেতে বস। ছবি: লেখক

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

Roots Finders – শেকড় সন্ধানী তিনজন সপ্নবিলাসী মানুষের ভ্রমণ গ্রুপ। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Back to top