in ,

বন্য সুন্দরী হাম হামের পথে: চায়ের দেশে প্রবেশ

বাস থেকে নামার পর হিড বাংলাদেশে যাবার জন্য অটো ঠিক করলাম। হেলে দুলে যাচ্ছি জুয়েল ভাইয়ের আখড়ায়। আঁকাবাঁকা রাস্তা আর চারদিকে চা বাগান। এখানে এসে যে কেউ কবি হয়ে যাবে। সবুজ প্রকৃতির মায়াবি রূপের কারণে শ্রীমঙ্গলের রয়েছে আলাদা পরিচিতি। এই বর্ষায় যেন রূপের ছড়া নিয়ে বসে আছে প্রকৃতির রাণী শ্রীমঙ্গল।পাহাড়ের কোল ঘেষে সবুজময় চা বাগান। চারদিকে সবুজ আর সবুজ।

এত সাজানো গোছোনো চা বাগানের কারণেই কি শ্রীমঙ্গলকে ডাকা হয় দু’টি পাতা ও একটি কুঁড়ির দেশ। মেঘ ফেড়ে যেন নেমে এসেছে মেঘ দুহিতা৷ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়া শুরু হল। চা গাছের কচি পাতা থেকে টুপটুপ করে বৃষ্টির ফোটা নিচে পড়ছে। বৃষ্টিতে যেন হাসছে পুরো চা বাগান। আর বৃষ্টির পরশে সজিব হয়ে উঠেছে প্রতিটি গাছ। নতুন পাতার কুড়িতে পূর্ণযৌবন ফিরে এসেছে বর্ষার আহবানে। কচি সবুজ পাতায় ভরে গেছে চারিপাশ। দিগন্তপ্রসারী এই সবুজের মাঝে নির্ভীক যাত্রীরা চলছে অনাবিল আনন্দে৷ অদ্ভূত এক মায়া নিয়ে প্রবেশ করলাম চায়ের দেশে।

পাঁচ ভাইয়ের সকালে নাস্তা সারলাম তিন ভাই। ছবি: লেখক

এতটা বিমোহিত ছিলাম শ্রীমঙ্গলের রূপে, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ফিনলের চা বাগানে গাড়ি থামিয়ে সবার শুরু হল ফটো সেশন। এর মধ্যে চান মিয়া সারা রাস্তা বেশ জ্বালিয়েছে। আমি আর ঈসমাইল ভাই তার নিরব শিকার। ফটো সেশন পর্ব শেষ করার পর রওনা হলাম হিডের পথে।

আমাদের অটো হেলে দুলে খানিকটা সময় নষ্ট করে হিড বাংলাদেশে আসলেও আশে পাশের দৃশ্য দেখে মনটা ভরে গেল। সময়ের স্রোত যেন থেমে গেছে এই শ্রীমঙ্গলে। এই অপার্থিব মুগ্ধতার রেশ না কাটতেই পৌঁছে গেলাম হিড বাংলাদেশে। জুয়েল রানা আমাদের রিসিভ করতে আসলো। তিনি তখনও জানতেন না আমাদের সাথে চান মিয়া নামক বদ লোকটা আছে।

হিড বাংলাদেশের ভিতর। ছবি: লেখক

তাকে দেখে জুয়েল রানা ভাই বললেন, এই শয়তানকে কোথা থেকে নিয়ে আসলেন। আপনাদের না তিনজন আসার কথা ছিল। কুশল বিনিময়ের পর আমাদের নিয়ে গেলেন সোজা সেবাস্তিন দাদার রুমে। আমরা সকালে নকল পাঁচ ভাইতে ব্রেক ফাস্ট করে ফেলেছি বিধায় ক্ষুধা তেমন লাগছিল না। পরিচয় পর্ব সারলাম। সবাই একটু আশে পাশে ঘুরে শরীর রিলাক্স করলাম। এরপর গন্তব্য বহুদূর।

আল্লাহ’র দুনিয়ায় পাহাড়গুলা হচ্ছে আল্লাহ’র পেরেক। আমরা সবাই হাম হাম ঝর্ণা নিয়ে আলোচনা করলেও অনেকেই হয়তো জানি না যে পাহাড়ে হাম হামের অবস্থান সে পাহাড়ের নাম সিতাপ পাহাড়। এই পাহাড় থেকে ইন্ডিয়ান বর্ডার খুব কাছে। এছাড়া এই পাহাড়ের ঝিরিপথ দিয়ে গেলে সিতাপ ঝর্ণার খোঁজ পাওয়া যাবে। একটু বিরতি দিয়ে লিখলে ভূমিকা দিয়ে শুরু করে মূল কাহিনীতে ফিরতে সময় লাগে এই আর কি।

চল যাই হেঁটে সেবাস্তিন’দার কামড়ায়। ছবি: লেখক

আমাদের মুসাফির টীম সবাই প্রস্তুত। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে আমরা মানুষ ৬ জন আর আমাদের সিএনজিতে আটবে ৫জন। ঈসমাইল ভাইয়ের কর্মচারী শেষ পর্যন্ত চান মিয়ার কোলে বসে পথ পাড়ির প্রস্তুতি নিল। এ শুধু ট্রাভেলারদের দ্বারাই সম্ভব। আবার সেই চা বাগানের আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে আমাদের বাহন চলতে শুরু করলো। পথে আদমপুর যাত্রা বিরতি হল। সেবাস্তিত’দা জুয়েল ভাই নাস্তা খেতে নামলেন আর আমরা আশে পাশের প্রকৃ্তি দেখতে। সবাই সেলফি তুলে আমরা সিএনজি’ফি তুললাম।

বাংলাদেশের যে প্রান্তেই যাই না কেন ভিউ ফাইন্ডার ঈসমাইল ভাই তার হাতের ক্যামেরা ড্র না করলে বোধহয় তার হাত নিশপিশ করে। তার যদি দুই পকেটে দুটি ক্যামেরা ফোন থাকতো তাহলে বোধ হয় ওয়েস্টার্ন ছবির মত ডুয়েল ড্র করতো। সরল মনের আমাদের ঈসমাইল ভাই। ডুবে আছে কোন বেখেয়ালে প্রকৃতির মাঝে। সবুজের মাঝে চির সবুজ সাদা মনের মানুষ যেন মিশ যাচ্ছে।

যাইবেন, ফিক্সড ৩০০। ছবি: চান মিয়া

শ্রীমঙ্গল পর্যটন এরিয়া হলেও এখানকার মানুষ এত কর্মাশিয়াল হয়ে উঠে নাই। তবে কিছু বাটপার এখানেও আছে। কলাবন পাড়া যাবার ২-৩ কিলোমিটার আগেই এই রকম এক দ্বীনি বাটপারের সাথে দেখা হয়েছিল। তিনি বললেন সামনের রাস্তা বন্ধ সিএনজি আর যাবে না। এখান থেকেই হেঁটে যেতে হবে। আমাদের ড্রাইভার আবার নাছোড় বান্দা। উনি বললেন যে পর্যন্ত যাওয়া যায় যাব। আমাদের গোয়ার গোবিন্দ ভাব দেখে শেষ পর্যন্ত শেষ পাশার দান খেলে দিল। তাকে গাইড হিসাবে নিতে হবে। আমরা তাকে বেশি পাত্তা না দিয়ে আগে বাড়লাম।

কাদা মনে সাদা নেই। ছবি: লেখক

পথে মধ্যে এই রকম বাটপারের খপ্পরে পড়লে সিএনজি থামাবেন না। গাইড একেবারে কলাবন পাড়া গিয়ে নিবেন। হেলে দুলে আমরা কলাবন পাড়ার খানিকটা আগে নেমে পড়লাম। এরপর আর সিএনজি যাবে না। হাঁটা ধরলাম কলাবন পাড়া আসার পর কাকতালীয় ভাবে আমাদের পূর্ব পরিচিত গাইড ভরুণকে পেয়ে গেলাম। এর আগেই ছোট বাচ্চা কাচ্চার দল বাঁশ বিক্রির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের কিচির মিচির ডাকে কি পাখি সব উড়ে যায় আকাশে। হাম হামও কমার্শিয়াল হচ্ছে তাদের হাকডাক দেখলে বুঝা যায়।

হাম হাম ঝর্ণায় গেলে অবশ্যই গাইড নিয়ে যাবেন। পাহাড়ে কোন বিপদ হলে গাইড শেষ ভরসা। সেই বিপদের কথা সামনে বলবো আপনাদের। ভরুণকে নিয়ে আমরা বের হয়ে গেলাম হাম হামের পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বন্য সুন্দরী হাম হামের পথে: বের হতে হবে

বন্য সুন্দরী হাম হামের পথে: পথের হল শেষ