মনজুড়ানি ভোলাগঞ্জ

বাংলাদেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে লুকায়িত সৌন্দর্য্য। তাই সময় পেলেই ছুটে যাই দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত। এবারও সময় ও ব্যাটে বলে মিলে যাওয়ায় হুটহাট প্ল্যান হল ভোলাগঞ্জ যাবার। আগের সপ্তাহেই শাহবাজপুর ব্রিজ ভেঙ্গে যাওয়ায় আমাদের সকল জল্পনা কল্পনায় পানি ফেলে ভোলাগঞ্জের ট্রিপ বাতিল করতে হয়েছিল। এবার ও হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। তবে সকল মুশকিলের সমাধান বাবা সে আমাদের চান বাবা। ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেঞ্জারে টুং টাং নোটিফিকশনের ঝড় তুলে মোটামুটি ৮ জনের একটি দল দাঁড়িয়ে গেল। তো আমাদের থামাবে কে! দুই দিনের নোটিশে ভোলাগঞ্জ ট্রিপের জন্য তৈরি আমাদের প্ল্যাটুন।

দেখতে দেখতে চলে এল পবিত্র বৃহস্পতিবারের মহেন্দ্রক্ষণ। রাত ১১টা, সব ভ্রমণকারীর হাট বসেছে ফকিরাপুল বাস কাউন্টারে। এদের ভীড়ে অপেক্ষা করছি নিজের প্ল্যাটুনের জন্য। একে একে চলে এল চান মিয়া, নাদিম, মনা, ফয়সাল, রুবেল, ইরফান ও ফারুক ভাই। আমাদের বাস ১১টায় আসার কথা থাকলেও খানিকটা দেরি হল। ইউবিক বাসের কাছুয়া গতি চট্টগ্রাম লাইনে দেখে কি ভেবেছিল সিলেটে এসে বাবাজি গতির ঝড় উঠাবে। সায়েদাবাদ পার হতেই মোটামুটি সাড়ে বারটা বেজে গেল। জ্যামের খুনসুটির ভীড়ে নিজেদের হালকা পাতলা সুখ দুঃখের আলাপ সেরে নিলাম। বিশ্বাস করুন এরপর সারা রাত দুটি চোখের পাতা প্রিয়ার গতির ঝড়ের কাছে পরাস্ত হয়েছিল। নির্ঘুম রাত্রি শেষের গান শুনিয়ে ভোর ছয়টা বাজে নামিয়ে দিল কদমতলি বাস স্ট্যান্ড।

জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত মাঝি। ছবি: লেখক

এবার খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে বের হবার পালা। হোটেল যমুনা থেকে সকালের নাস্তা সেরে হেঁটে চলছি শাহজালালের তীর্থভূমিতে। সকালের কাঁচা সোনা রোদের বদলে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, থামে তো আবার অদ্ভূত রোমান্টিসিজমে ফিরে আসে। আজ হয়তো সকাল বেলা বৃষ্টির লুকোচুরি দিন। আমরা দয়ার বাজারের জন্য লেগুনা ঠিক করতে গেলাম, সাত সকালে একটা পেয়েও গেলাম আপ ডাউন ২৩০০ টাকা ঠিক হল। ভোলাগঞ্জ ঘুরিয়ে আমাদের উৎমাছড়া নিয়ে যাবে। ক্বিন ব্রিজের গোড়া থেকে উঠে লেগুনার খানিকটা পথের যাত্রা সুখময় ছিল না। ড্রাইভার মামা সকাল সকাল কোন ধ্যানে ছিল পেট্রোল প্যাম্পে তেল নিতে গিয়ে সিগারেটে সুখ টানের কথা যেন ভুলতে পারলেন না। ফল সরূপ খেলেন পাম্পের ম্যানেজারের হাতে বন চটকানা।

চটকানা খেয়ে মামা মন খারাপের গান শুনাতে যেন শুনালেন ইঞ্জিন স্টার্ট হচ্ছে না। আর তিনি টুল বক্স নিয়ে আসতে ভুলে গেছেন। ব্যাটারির পাশে তার লুজ, হাত দিয়ে ঠিক করতে গিয়েও পারলেন না, কাষ্ট হাসি দিয়ে মামা বললেন, আপনাদের যে একটু ধাক্কা দিতে হবে। ধাক্কা দিয়ে নিয়ে গেলাম সামনের চাক্কার দোকানে। সেখান থেকে  নাট বল্টু জ্যাক নিয়ে এসে তার ঠিক করা হল। এবার বিসমিল্লাহ বলে শুরু হল আমাদের যাত্রার।

চল পথিক অনেক দূরে। ছবি: লেখক

ভোলাগঞ্জ মেঘালয়ের কোল ঘেষে সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। আর আমাদের লেগুনা চলছে সেই ১০ নাম্বার ঘাটের দয়ার বাজারের উদ্দ্যেশে। লাক্কাতুরা, মালিনিছড়া চা বাগানে যেন আজ মেঘকন্যার বেড়াতে এসেছে। চা পাতার সবুজ পাতায় পাতায় যেন লেখা হয়ে গেছে ঋতুর রাণি বর্ষার আগমনি বার্তা। সব কিছু পিছে ফেলে ছুটে চলছে আমাদের লেগুনা আকাবাকা পথে। দেখতে দেখতে দয়ার বাজার এসে গেলাম। তবে দয়ালকে জানতো আজ বিশাল মানুষের হাট বসবে। আর এ মানুষের হাটের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয় পরিচিত মুখগুলো। এখান থেকে সাদা পাথর, ভোলাগঞ্জ যেতে হবে জলযাত্রায়। চা পর্ব শেষে কালক্ষেপন না করে ঠিক করে ফেললাম আমাদের মন পবনের নাও। শুরু হল এক মায়াময় জলযাত্রার।

আমাদের ট্রলার সবুজ জলের রাশি কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছে। আহা সচ্ছ স্ফটিকের মত জলরাশি, কখনও সে সবুজ কখনও সবুজাভ। ধলাই নদীর অপরূপ রূপ আর প্রকৃতির বিষণ্নতা অদ্ভূত মোহমায়ার খেলা নিয়ে হাজির হল যেন, আমার মন আজ তো বিষণ্ন হবার কথা নয়। মেঘগুলো যেন আমার কথা শুনে বিষণ্ন হয়ে ভেসে ভেসে হারিয়ে যাচ্ছে ওই দূরে মেঘালয়ের পাহাড়ে। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। দুই পাহাড়ের খাজের ফাঁকে যেন দেখা যাচ্ছে নীল দিগন্ত। যেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওই দূরের মেঘালয়। আমি যেন হারিয়ে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য।

ঐ দেখা যায় মেঘালয়। ছবি: লেখক

চারদিকে লোকে লোকারণ্য, সবাই আজ ভ্রমণ নেশায় বন্য। আগে আমি দেখেছি ঝর্ণার সাথে খেলে দেয়, মেরে দেয়। তারা আজ ধলাই মাতাকে মেরে দিচ্ছে। স্রোতে বিরিয়ানির প্যাকেট, প্যাম্পয়াসের ভেসে আসা শুনায় এক ভয়ংকর গল্প যা এই মুহূর্তে শুনাতে ইচ্ছা করছে না। এই সব এক দিকে ফেলে ডুবা যাক প্রকৃতি মাতার প্রেমে।

আমি তো আজ মন ভোলাতে এসেছে ভোলাগঞ্জ তা না হয় চারদিকে চোখ বুলিয়ে মন ভুলানো যাক। আমার প্ল্যাটুন ব্যস্ত ধলাই নদীর শীতল জলে অঙ্গ ভিজাতে। আর আমি ব্যস্ত হয়ে যাই প্রকৃতির প্রেমে। সবুজে পাহাড়ে বন্দী সাদা পাথর। ওই দূরে মেঘালয় পাহাড়ের কোল থেকে গড়িয়ে পড়ছে কাক চক্ষুর জল। চারদিকে নানা সাদা পাথরের ছড়াছড়ি। ধলাই নদীর প্রচণ্ড স্রোতের স্বচ্ছ শীতল জলের স্পর্শে যেন আমি হারিয়ে যাই কোথাও। প্রতিবছর বর্ষাকালে জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে সাদা পাথর গড়িয়ে আসে ধলাই নদীতে। তাই এই নদীতে পাথরের বিপুল মজুদ। 

মনজুড়ানি পাহাড় আকাশ নদী। ছবি: লেখক

শীতকালে এখানে পাথর ভাঙ্গা হয়। ভোলাগঞ্জ দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারি অঞ্চল ও বটে, যেখানে পর্যটনের বাটে পানিতে ডুবে দুর্ঘটনাও ঘটে। ফয়সাল ভাই একসন ক্যাম নিয়ে এসেছে। তাই জলের তলের জলকেলি ছবি তোলায় উৎসুক সবাই। সবাই যেন সৃষ্টিশীল শিশু। জলের নিচে কে কতক্ষন থাকতে পারে এ নিয়ে যেন শুরু হল সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন অঙ্গ ভংগিতে ছবি তুলতে গিয়ে পাশ দিয়ে যে মাছেরা ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে তা হয়তো খেয়াল করেনি। যখন একসন ক্যামেরা থেকে ছবি গুলো মোবাইলে ট্র্যান্সফার করলাম দেখতে পারলাম নিজেদের সৃষ্টিশীল ছবি। আহা জলের জীবন, পানির মত জীবন।

ধলাইয়ের পানিতে অঙ্গ শীতল করে শুনি তার বৃত্তান্ত। ভারতের চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে বয়ে এসেছো তুমি, সিলেটের ভোলাগঞ্জ হয়ে ছুয়ে গেছো আমার অঙ্গ চুমি দিয়ে মিশেছো ওই সুরমা নদীতে। তোমার যে স্রোত তা এখানে না এলে হয়তো জানতাম না। আমরা একটু সামনে এগিয়ে সীমান্তের ওই লাল পতাকা দেখতে পারলাম। সামনে আর যাওয়া যাবে না। নো ম্যান্স ল্যান্ড। এরপর উৎসুক জনতা ছুটে যাচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর বিজিবির সদস্য বাঁশি ফু দিয়ে সর্তক করে যাচ্ছে।

বড় ভাবুক, বড় উন্নাসিক। ছবি: ট্যুরমেট মুন

এখান থেকে দূরের পাহাড়টা বড় আপন লাগে। শান্ত স্তব্ধ পাহাড়ে আজ মিশেছে আকাশের বিষণ্নতা। ভরা বর্ষার বিষণ্ন আকাশে হাওয়াই মিঠাইয়ের মত ভেসে বেরাচ্ছে মেঘেদের দল। প্রকৃতির সম্মোহনে বার বার তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। জিরো পয়েন্টে দৃষ্টি প্রসারিত করলে চারদিকে সবুজের আচ্ছাদনে ঘেরা পাহাড়ের মাঝে সাদা পাথর ভোলাগঞ্জ যেন প্রকৃতির আপন খেয়ালে হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাব আজ, হারিয়ে যেতে নেই মানা ওই সবুজ পাহাড়ে। ওই পাহাড়ে বুক থেকে গড়িয়ে পড়া প্রচন্ত স্রোতের সচ্ছ শীতল পানি ধুয়ে দেয় সকল গ্লানি। কি অপরূপ তুমি ভোলাগঞ্জ তা আমি শব্দে বন্দী করতে পারবো না।

দেখতে দেখতে যাওয়ার সময় হয়ে গেল। যেতে হবে উৎমাছড়া। তবে উৎমাছড়ার গল্পটা হয়তো অন্য ভাবে সাজাবে বলে প্রকৃতি মাতা তাই এখানেই থামতে হল। আমরা আমাদের ট্রলারের উঠার পর দেখতে পেলাম সূর্যটা এখন এক চিলতে হাসি দিয়ে যেন আমাদের বিদায় জানানোর জন্য হাজির হয়েছে।

ফিচার ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top