কালাপাহাড় ট্রেকিং

বাস যখন আমাদেরকে মৌলভীবাজার নামিয়ে দিলো তখনও ফজরের আজানের সময় হয়নি। অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের অন্য কোন উপায় ছিল না। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে কালাপাহাড় যাওয়ার সিএনজি/ অটোরিকশা খুঁজতে বের হলাম। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওরা কেউ কালাপাহাড় চিনতে পারছে না। আমাদেরকে ঘিরে সিএনজি ওয়ালাদের একটা জটলা হয়ে গেছে ।

ট্রেকিং শুরুতে গ্রুপ সেলফি

মামুন, তাবাসসুম, সাদিয়াসহ সলো ট্রাভেলার্স বাংলাদেশ নামক একটি ফেসবুক ভিত্তিক ভ্রমণ গ্রুপের কজন সদস্য মিলে এসেছি সিলেট বিভাগের সর্বোচ্চ চূড়া কালাপাহাড় জয় করতে। আমাদের সাথে আলবার্তো নামে আমাদের একজন স্প্যানিশ বন্ধু ছিল। মূলত বিদেশি দেখেই লোকজন জটলা পাকাচ্ছিল। তাই দ্রুত দুটো সিএনজি নিয়ে এই স্থান ত্যাগ করলাম।

আসগরাবাদ চা বাগানে

কুলাউড়া উপজেলার রবির বাজার হয়ে আমাদের যেতে হবে আসগরাবাদ চা বাগানে। সকাল সাতটায় চা বাগান থেকে ট্রেকিং শুরু করেছি। চা বাগান পেরুতেই চারপাশের সবুজ পাহাড় দেখে চোখ জুড়িয়ে এলো। বাগানে শেষ প্রান্তে এসে কিছুটা চড়াই পথ পারি দিয়ে একটা টিলার উপরে চলে এসেছি। টিলা পেরিয়ে একটা ছোটখাট পাহাড়ের উপর পৌঁছতেই কয়েকজন লোক এসে আমাদের সাথে যুক্ত হলো।

এই সাতসকালে আমাদের মত অনাহুতের দেখা পেয়ে ওরা কিছুটা কৌতুহল হয়েছিল। কথা বলে জানলাম ওরা স্থানীয় অধিবাসী। আমরা কালাপাহাড় যাব শুনে ওরা কিছুটা চিন্তিত। কারণ পথ জঙ্গলে পরিপূর্ণ। তার উপর কদিন যাবত বৃষ্টি হচ্ছে বলে পথে পথে জোকের উৎপাত বেড়ে গেছে। লোকজনের আনাগোনা একদম নেই বললেই চলে।এদিকে সাদিয়া একটা পাহাড়ে চড়েই কাহিল হয়ে গেছে। তাবাসসুম আপু তাকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্দীপনা কতক্ষণ থাকে সেটাই ভাবনার বিষয়।

দেড় ঘণ্টা পর আমরা পৌঁছে গেলাম স্থানীয় বেগুনছড়া পুঞ্জীতে। এটি মূলত খাসিয়া গ্রাম। চারপাশে প্রচুর সুপারি আর পানের বাগান। এগুলোই খাসিয়া পল্লীর আয়ের প্রধান উৎস। গায়ের পুরুষগণ দলে দলে কাজে বের হয়েছে। মহিলারা গৃহস্থালি কাজে ব্যাস্ত। একটা টিনশেড স্কুল দেখতে পেলাম। উঁকি দিয়ে দেখি বাচ্চারা লিখছে। আমাদের দেখে তাদের কেউ কেউ কৌতুহলে তাকিয়ে আছে।একজন শিক্ষিকা আপন মনে হেন্ডিক্রাফটের কাজ করছে। তার কোলে একটা ছোট শিশু। মাঝে মাঝে তিনি বাচ্চাদের খাতাপত্র নাড়াচাড়া করে দেখছেন।

পড়াশোনায় মগ্ন

ছোট বাচ্চাটা মায়ের কোল থেকে নেমে জানালার পাশে এসে আমাদের দেখছে। কিছু ব্যাকবেঞ্চারদের দেখলাম নিজেদের মধ্যে ফিসফিস গল্প করছে। এরা একদম পারফেক্ট ব্যাকবেঞ্চার। কে আসলো, কে গেলো কোন দিকেই তাদের দৃষ্টি নেই। ফটাফট কয়েকটি ছবি তুলে এবার নিজের পথ ধরলাম। এই খাসিয়া পল্লী পেরিয়ে ঘণ্টা দুয়েক হাঁটলেই কালাপাহাড়।

কালাপাহাড় মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কার্মধা ইউনিয়নের বেগুণছড়া পুঞ্জিতে অবস্থিত একটি পাহাড়।এটা মূলত খাসিয়াদের গ্রাম। খাসিয়ারা গ্রামকে ‘পুঞ্জি’ বলে। কালাপাহাড় সিলেট জেলার সব থেকে উঁচু পাহাড়। জিপিএস রিডিং করে যার উচ্চতা পেয়েছি ১০৯৮ ফুট।

জঙ্গলে পরিপূর্ণ পাহাড়ি ট্রেইল

বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক সোসাইটির মতে, কালাপাহাড়টি ‘হারারগঞ্জ পাহাড়’ নামেও পরিচিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় অবস্থান করা এই পাহাড়ের ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে পড়েছে এবং বাকি অংশ ভারতের উত্তর ত্রিপুরায় অবস্থিত। ত্রিপুরায় এই পাহাড়টির বাকি অংশ রঘুনন্দন পাহাড় নামে পরিচিত। ভারতের বিখ্যাত প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক লল ধর্মীয় স্থান ঊনকোটি এই পাহাড়টির পাদদেশে অবস্থিত।

এই পথ চলাতে আনন্দ

বেগুনছড়া পুঞ্জী থেকে পর্যাপ্ত পানীয়জল সাথে নিয়ে আমরা কখনো ঝিরিপথ কখনো বা পাহাড় বেয়ে উঠানামা করছি। ঝিরি থেকে পাহাড়ে উঠার পর আর কোন পানির সোর্স নেই বলে খুব হিসেব করে পানি খরচ করতে হচ্ছে। গত রাতের বৃষ্টিতে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। টিম লিডার তাবাসসুম আপু সকলকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে নিজেই বেশ কয়েকবার চিৎপটাং হয়েছেন। এদিকে পিচ্ছিল পথের সাথে যুক্ত হয়েছে জোকের আক্রমণ। আমাদের স্পেনিশ বন্ধু এই প্রথম জোক দেখেছে। জোকের চুম্বনে রক্তাক্ত হয়ে এক মেসাকার অবস্থা। আমাদের টিম লিডার তাবাসসুম আপু জোক দেখে এমন চিৎকার দিয়েছে যে জোক ভয়ে পা থেকে পরে গেছে।

বেগুনছড়া ঝিরিপথে

একটা পাহাড়ের উপর পৌঁছে আমরা গোলকধাঁধায় পড়ে গেলাম। দুটো পথ দুই দিকে চলে গেছে বলে সঠিক পথটা বেছে নিতে কনফিউজড হয়ে গেছি। এদিকে মাঝ দুপুর বলে সূর্যের তাপমাত্রায় চান্দি ফেটে যাওয়ার দশা। মাঝখানে এসে সকলের পানীয় জল ফুরিয়ে গেছে। ঘন পিপাসায় কাতর হওয়ার দশা। ম্যাঙ্গুবার আর বাদাম চিবিয়ে এবার মূল পাহাড়ের দিকে রওয়ানা দিলাম। পুরো পথটাই খাড়া বাঁশ বাগানের ভিতর দিয়ে উপরে উঠে গেছে। ঝরাপাতায় পূর্ণ এই খাড়া পথে খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। একে অন্যের থেকে মাপা দুরত্বে এগিয়ে যাচ্ছি। একজন পা ফসকে পড়লে বাকি সবাই নিচে গড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

ঐ দূরে কালাপাহাড়

কালাপাহাড়ের উচ্চতা তুলনামূলক কম হলেও ভরা বর্ষা, পরিবেশ আর সময় বিবেচনায় এই ট্রেকিং পথটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সাথে কোন গাইড না থাকায় জিপিএস ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। জঙ্গল কেটে রাস্তা বানিয়ে চলতে হচ্ছে। দুপুর ১২: ৪৫ মিনিটে আমরা কালাপাহাড় চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হলাম।

চূড়া জয়ের আনন্দ

চূড়ায় পৌঁছে ভয় পেয়ে গেছি। কারণ খাসিয়া পল্লী থেকে আমাদেরকে বন্য হাতির ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। চূড়ায় এসে আশপাশে বুনো হাতি থাকার লক্ষণ দেখতে পেলাম। চারপাশে বড় বড় গর্ত, পায়ের ছাপ আর তাজা মল দেখেই বুঝা যায় খুব কাছাকাছি বুনো হাতির পাল আছে। একপাল বন্য হাতি পুরো কালাপাহাড়ের চুড়াটাকে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। এই বুঝি আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিবে! হাতির পায়ের তলায় পৃষ্ঠ হওয়ার আতঙ্ক নিয়ে কালাপাহাড় চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হলাম। চূড়ায় একটা গাছের ডালে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। সম্ভবত কয়েকদিন আগে একটা টিম এখানে এসে চূড়া জয়ের নিদর্শন স্বরূপ লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দিয়ে গেছে।

কালাপাহাড় চূড়ায় উড়িয়ে দিলাম জাতীয় পতাকা

কালাপাহাড়ের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে হাকালুকি হাওরের নীল পানি আর অন্য পাশ দিয়ে ভারতের ত্রিপুরার কিছু অংশ দেখা যায়।তিরিশ মিনিটের মত কালাপাহাড় চূড়ায় কাটিয়ে আশপাশের পাহাড়ি সৌন্দর্য অবলোকন করে ফিরে এলাম খাসিয়া পল্লীতে। কালাপাহাড়ের এই সৌন্দর্য বহুদিন মনে থাকবে।সুযোগ পেলে আবার যাব।

সলো ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশ গ্রুপের ফেইসবুক লিংক: https://www.facebook.com/groups/solotravelersbd/

কিভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে বাসে কিংবা ট্রেনে করে কুলাউড়া যাবেন। কুলাউড়া থেকে রবির বাজার যাবেন লোকাল সিএনজিতে।ভাড়া নিবে জনপ্রতি ২০ টাকা। রবির বাজার থেকে লোকাল সিএনজিতে যেতে হবে আসগরাবাদ চা বাগান। কিংবা সরাসরি কুলাউড়া থেকে সিএনজি নিয়ে আসগরাবাদ চলে আসুন। সেক্ষেত্রে ২০০/২৫০ ভাড়া গুনতে হবে। তারপর চা বাগানের ভিতর দিয়ে তিন/চার ঘণ্টা ট্রেকিং করে কালাপাহাড় চূড়ায় যেতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top