fbpx

বন্য সুন্দরী হাম্মাম ঝর্ণা

অবিরাম বৃষ্টিতে চকচকে সবুজ চা বাগানের নিস্তব্ধতাকে সাথে করে আমাদের নিয়ে ছুটে চলা সিএনজি যাওয়ার কথা ছিল কলাবন পাড়া পর্যন্ত, কিন্তু পথিমধ্যে কাচা রাস্তা আর কয়েকদিনের বৃষ্টির ফলে জমে থাকা কাদার কারণে চাম্পারায় বাগানের মধ্যখানেই থেমে যেতে বাধ্য হলো ত্রিচক্র যান। তারপর শুরু হলো কাদা মাড়িয়ে পথ চলা। কিছুক্ষণ হেঁটে পৌঁছলাম কলাবন পাড়ায়, এখান থেকে গাইড ঠিক করে নিলাম।  তারপর শুরু ট্রেকিং, রাজাকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টে অবস্থিত হাম্মাম ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য বন বিভাগের খাতায় নাম রেজিস্ট্রি করে প্রবেশ করলাম বনে।

চা বাগানের মাঝপথ থেকে হাটা শুরু। ছবি: ইসমাইল হোসেন

যাওয়ার পথে একাধিকবার বিভিন্ন ঝিরি, সাকো পার হতে হলো সেইসাথে ছাড়াতে হলো শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে খুঁজে খুঁজে জোঁক। দীর্ঘ দুই ঘণ্টার উপরে পাহাড়ী রাস্তায় কোথাও হাটু পরিমাণ কাদা কোথাও কয়েক ফুট পরিমাণ টিলা, পার হয়ে যখন ঝিরিপথের দেখা পেলাম তখন যেন উচ্ছাস আর ধরেনা। কিন্তু ঝিরিতে নামার জন্য সর্বশেষ যে টিলা থেকে নামতে হয় সেটাতে বেশ বেগ পেতে হলো সবাইকে।

হীমশীতল ঝিরিপথ। ছবি: লেখক

ঝিড়িতে নেমেই হিমশীতল পানি পেয়ে উচ্ছসিত সকলে, কেউ কেউ শুয়ে পড়লো, বসে পড়লো সবাই। সবার এরকম ভাব যেনো প্রাণ জুড়াবো তোমার ছোয়ায়। ঝিড়ির হীমশীতল জলের সাথে মিতালী করার জন্যই যেনো আগমন সবার। কিন্তু আর বেশিক্ষণ বসার সুযোগ নেই, এইতো হাম হামের গড়িয়ে পরা জলের গগনবিদারী শব্দ কর্নকুহরে প্রবেশ করছে, এতো কাছে এসেও কি অপেক্ষা করা যায়? আর কি বসে থাকা যায়?

এরাও আমাদের সাথে এসেছে। ছবি: লেখক

বাকী পথটুকু যেনো মায়ায় মোড়ানো, ঝিরির হীমশীতল জলের কলকল শব্দে ছুটে চলা সাথে আলো আধারীর লুকোচুরি খেলা, এখানে রোদ্দুর ও পৌঁছায় কয়েক স্তর ভেদ করে। তাই জায়গাটা সবুজাভ মায়াবী আধারে ঘেরা, হাঁটার সময় শরীরে দিয়ে যায় ঠাণ্ডা এক পরশ। ঝিরিপথ পেরিয়ে যখন চলে আসলাম বন্যসুন্দরী হাম্মামের সামনে তখন যেনো নিমিষেই সব কষ্ট আর যাতনা ভুলে যেতে বাধ্য হলাম। আঠারো বছরের সদ্য যৌবনে পা দেওয়া চপলা-চঞ্চলা রূপসীর মতো কিছুতেই যেনো তাকে আটকে রাখা যাবেনা, প্রকাণ্ড গর্জনে বয়ে চলছে তো চলছেই। মাস খানেক আগেও সর্বশেষ দেখায় তার রূপ এতোটা প্রকাণ্ড ছিলনা।

বাশের লাঠি বিক্রির জন্য দাঁড়িয়ে থাকে বাচ্চারা। ছবি: লেখক
কলাবন পাড়ায় পানির উৎস কূপ। ছবি: লেখক

ঝর্ণার শীতল জলে স্নান করে স্নিগ্ধ হলো সবাই। শুধু চেয়ে চেয়ে উপভোগ করছিলো আমাদের সাথে কলাবন পাড়া থেকে যুক্ত হওয়া প্রকৃতি প্রেমী একজোড়া কুকুর। চা, বিস্কুট,সিদ্ধ ডিম খেয়ে সাময়িক ক্ষুধা নিবারন করলাম আমরা, সাথে থাকা চকোলেট ও বিস্কুট দিলাম কুকুরদের। এবার ফেরার পালা।

ট্রেকিং পথে এরকম আলোছায়ায় ঘেরা সবুজ উঁকি দেয় বারবারলি। ছবি: লেখক

যাতায়াত: ঢাকা থেকে ট্রেনে ভানুগাছ অথবা বাস/ট্রেনে শ্রীমঙ্গল এসে তারপর জিপ/সিএনজিতে চাম্পারায় চা বাগানের কলাবন পাড়া পর্যন্ত যাওয়া যায়, বাকীপথ ১.৫-২ ঘণ্টার ট্রেকিং।

সঠিক তথ্য না জেনে ট্রেকিং উপযোগী জুতা/প্রস্তুতি না নিয়ে অন্য দশটা ট্যুরিস্ট প্লেসের মতো গাড়ি নিয়ে চলে যাবেন এরকম ভেবে কেউ গিয়ে বিপদে পরবেন না দয়া করে।

প্রকৃতিকে কোন আবর্জনা ফেলে নোংরা না করার অনুরোধ রইলো, আমরা আমাদের ব্যবহৃত কোন আবর্জনা ফেলে আসিনি।

ফিচার ছবি: ইসমাইল হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top