in

LoveLove

টাঙ্গুয়ার হাওড়ের নীল জলরাশি

dav

ঢাকার যান্ত্রিক জীবনের পিষনে যখন চারদিক থেকে ক্ষত বিক্ষত। ব্যক্তিগত জীবন দিশেহারা নাবিক আমি খুজছি এক ফোটা সিগ্ধতা তখন হুটহাট সিদ্ধান্ত নিলাম টাংগুয়ার হাওর যাব। শীতের শেষে অতিথী পাখি যাচ্ছে সব নিজ দেশে ফিরে এরপরও কি হায় মানুষ টাংগুয়ার যায়। যথারীতি পার্টনার ইন ক্রাইম পেয়ে গেলাম ঈসমাইল ভাই, চান মিয়া, কায়েস, রুবেল ও আকরাম। রানা ভাইয়ের কাছ থেকে আগেই খায়ের মাঝির নাম্বার চেয়ে নিয়েছিলাম। মোটামুটি ট্যুর প্ল্যান নিয়ে বের হলাম সুনামগঞ্জের পথে।

খুব ভোরে সুনামগঞ্জে ব্রিজে নামার পর তাহিরপুরের উদ্দ্যেশে টেম্পুতে উঠলাম। এত সকালে দেহঘড়ি আর কাব্য মানে না। পাপ ভুলে দেয় চাপ। চাপের বেগ সামাল দিয়ে দুলতে দুলতে এসে পড়লাম তাহিরপুর৷ তাহিরপুর বাজারে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। পর্যটকের এক বিশাল চাপ দেখে বাপ বাপ করে এখানেই সব গাইড/মাঝি ভীড় জমাচ্ছে। রংগিলা আমাদের জুয়েল ভাই তার চেয়ে এক কাঠি সরেস খায়ের মাঝি। তার রংগিলা প্ল্যানে আমরা তাহিরপুর না থেমে উঠে পড়লাম বাইকে।

জল, বৃক্ষ খুজে তল। ছবি: লেখক

সোলেমানপুর থেকে ইঞ্জিন চালিত বোটে উঠবো। এক রাশি ধুলা উড়িয়ে আকা বাকা এই গ্রামের পথ দিয়ে ছুটে চলছে আমাদের দ্বিচক্রযান। সোলেমানপুর আসার পর দেখা হল আমাদের এই ট্যুরের আর্কষণ খায়ের মাঝির সাথে। কথা বার্তায় যেন সরলতা গলে গলে পড়ছে৷ লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু তত্ত্বে যারা পা দিয়েছে তাদের কাছে পর্যটক একবার এই গলা কাটাতে যায়। কিন্তু এই মাঝির কাছে গলা পাততে আসতে হয় বার। উনার তত্ত্ব সার্ভিস নিয়া যান, খুশি হয়ে যেইটা নায্য দিবেন, আবার আসিবেন৷

কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের হাওর যাত্রা শুরু হল। মাঝি কাম ক্যামেরাম্যানের ছবি তোলার হাত ও বেশ ভাল। কিছু গ্রুপ ফটো তুলে৷ জলের রাশি কেটে কেটে যাচ্ছে আমাদের বোট। রৌদ্রজ্জ্বল সকাল, পরিষ্কার আকাশ, বাতাসে বইছে শীতের আমেজ। খায়ের মাঝি আমাদের গাইড দিতে থাকলো। কোথায় যাব, কোথায় গেলে দেখা যাবে শীতের পাখি৷ দূর থেকে দেখা গ্রাম গুলো যেন জলে ভাসমান, যেন জলেই তাদের বাস।

শিল্পির তুলিতে আকা। ছবি: লেখক

টাংগুয়ার যাবার রুট ক্যানেলগুলোও বেশ আর্কষণীয়। ক্যানেলের পাশে ঘাস ভরা মাঠে চড়ে বেড়াচ্ছে গরু-মহিষের পাল। বালি হাস, পানকৌড়ি জলকেলি খেলতে নেমেছে এই নীলাভ জল রাশিতে। জল কেটে কেটে প্রায় দেড়-দু-ঘণ্টা চলার পর মাঝি বললো মামা এসে গেছি টাংগুয়ার হাওর৷ বড় আশা ছিল অতিথী পাখি দেখবো। তবে আশানুরূপ না পেলেও যা দেখলাম তাতেই মুগ্ধতায় ছেয়ে গেল দেহ মন। বর্ষায় হাওর জলে জলারণ্য থাকলেও শীতের হাওর থাকে মায়াবতী নারীর মত৷ অতি যত্নে যেন পড়তে পড়তে সাজিয়ে তোলে নিজের স্পর্শে৷ শীতে এল যেন ফিরে পায় বাংলার সেই চিরচেনা রূপ৷ হাওরের এই মন-মাতানো এ অপূর্ব রূপের সমাহার দেখে আমি গুনগুনিয়ে উঠি:

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শংখচিল শালিখের বেশে,
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

নীল জলরাশি কেটে যায় সপ্ন সারথি। ছবি: লেখক

টাংগুয়ার হাওড়ের অপরূপ মায়ায় হারিয়ে যাই জীবনানন্দ দাশের কবিতায়। সত্যিই এই বাংলার এত রূপ। তাই কবির মত বার বার ফিরে আসিতে ইচ্ছে করে এই বাংলার বুকে। চারদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা, শীতের পাখি, হাওড়ের নীল জলরাশি আর পাশে মেঘালয়ার নীলিমায় হারিয়ে যায় এই ক্লান্ত পথিক। আর সাথে যদি থাকে রঙ্গিলা খায়ের মাঝি তাহলে তো কোন কথাই নাই। হাওড়ের জলে ভেসে ভেসে যাচ্ছে আমাদের ছোট নৌযান। চারদিকে পাখির কলকাকলিতে মুখরিত এক অপূর্ব পরিবেশ। পাহাড় আকাশ পানি যেন প্রকৃতির তুলিতে একেছে এক মনোরম ছবি।

মেঘালয়ের খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে হিজল করচের দৃস্টি নন্দন সারি হাওরকে করেছে আরও আর্কষণীয়। পানির নিচে লতা পাতা জলজ উদ্ভিদের যেন গড়ে তুলেছে অপরূপ সবুজের স্বর্গরাজ্য। হাওরের নীলাভ জলরাশি কেটে কেটে যাচ্ছে নৌকা৷ পাটাতনে শুয়ে আছে এক ভুবন মাঝি। মাঝি এক জীবনে আর কিছু চায় না, শুধু চায় হারিয়ে যেতে এই নীলাভের নীলিমায়।

ওই দেখা যায় হিজল গাছ। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

টাংগুয়ার গিয়ে আমার এই রকম মনে হয়েছিল আর ফিরে না যাই লোক ঠকানো সেই স্বার্থপর শহরে৷ তোমার রূপ দেখে শব্দ কম পড়ে যায়। শব্দের শিল্প বোনা শেষে উদাসীন বাউলের মত তোমারে রেখে দিলাম আমার এই হৃদ মাঝারে৷ এখানে শহরের স্বার্থপড়তা চলে না প্রকৃতি ক্ষনে ক্ষনে হেসে উঠে আপন খেয়ালে৷ দূরের ওই মেঘালয় পাহাড়টা আমায় জ্বালায় পুড়ায়। খুব হিংসে লাগে ওই পাহাড় কেন আমার হল না। কেন এক দেশ পেরিয়ে তোমায় ধরতে হবে।

ওয়াচ টাওয়ার যাওয়ার পথে। ছবি: লেখক

অধরা সপ্ন নিয়ে আবার ভাবিতে লাগলাম। খায়ের মাঝি আমাদের নামিয়ে দিল ওয়াচ টাওয়ারের কাছে৷ ওয়াচ টাওয়ার এর উপর উঠে কিছু অতিথী পাখির সন্ধান পেলাম গাছের সারিতে৷ আহা কি মায়া ভরা ডাকে কর্ণকূহরে বাজাইলো কি সুখের ধবনি৷ পাখাপাখালি ডান ঝাপটা এই সংগীত ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনতেও আমার নেই মানা। তবে ডেস্টিনেশন হান্টিংয়ের এই যুগে এক জায়গায় স্থির হয়ে থিতু হয়ে বসা মহাপাপ৷ আবার গেলাম ফিরে সেই বোটে৷ এবার দেখবো শহীদ সিরাজ লেক, শিমুল বাগান আর বারিক্কাটিলা৷ বিদায় টাংগুয়ার তবে ফিরে আসবো হয়তো কোন এক ভরা বর্ষায়। তখন থাকবে না কোন তাড়া, শুধু থাকবে স্থিরতা, শুধুই স্থিরতা।

ফিচার ছবি: ঈসমাইল হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বর্ষা কন্যা সুপ্তধারা

পাহাড়ী অরণ্যঘেরা নাপিত্তাছড়া