fbpx

অতিথি পাখির খোঁজে টাঙ্গুয়া হাওরে

ফেব্রুয়ারি মাস তবে এখনো সকালে বেশ ঝাকিয়ে শীত নেমেছে, কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে কয়েক ফুট সামনের দৃশ্য ও দৃশ্যমান নয়। এরকম এক মিষ্টি সকালে সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার জন্য বেড়িয়ে পরেছিলাম আমরা ৪ জন, এর মধ্যে দুইজনের সাথে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার দেখা। প্রথমবার ছিল টিওবি গ্রুপের সৌজন্যে ভ্রমণসঙ্গী খুঁজে সাজেক যাত্রায়। আরেকজন আমার অতিপ্রিয় সুশান্ত দাদা যিনি আমার প্রথম কর্মজীবনের সহকর্মী তিনি আবার শখের ফটোগ্রাফারও।

সিলেট-সুনামগঞ্জে চলাচলকারী বাস। ছবি: লেখক

আমাদের প্ল্যান ছিল প্রথমে টাংগুয়ার হাওর, তারপর টেকেরঘাট, বারিক্কা টিলা, শিমুল বাগান দেখে আবার সিলেটে ফিরে আসার। সকাল ৭ টায় আম্বরখানা এসে আমরা হাজির কিন্তু সিলেটী দুই ভাই ৩০ মিনিট দেরি করে আসলো, তারপর সিএনজিতে প্রতিজন ১৫ টাকা করে আম্বরখানা থেকে কুমারগাও সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড গেলাম। টিকিট নিলাম প্রতিজন ৯০ টাকা করে, বাসে উঠতে গিয়ে দেখি আমাদের ঢাকায় মিরপুর-মতিঝিলের বিকল্প বাস!

হাওরের জলে ভেসে চলে জীবিকা। ছবি: লেখক

যাই হোক বাস চলা শুরু করলো আর চালক মামার স্পিড দেখে ভয় পাচ্ছিলাম, কারণ বাস ছিল ছোট এবং হাল্কা, কয়েকটা ট্রাককেও ওভারটেক করে ফেললো ইতিমধ্যে বাতাসের গতিতে ছুটে চললো বাস। প্রায় ২ ঘণ্টার নিরাপদ ভ্রমণ শেষে সুনামগঞ্জ ব্রিজে এসে পৌঁছলাম, এখান থেকে তাহিরপুর যেতে হবে সিএনজি, লেগুনা বা মোটরবাইকে, টিওবিতে দেখেছিলাম সিএনজি ভারা প্রতিজন ৮০ টাকা, কিন্তু এখানে এসে দেখি ১০০ টাকা, তাই প্রচুর দরদাম এবং যাচাই বাছাই করতে করতে সময় পেরিয়ে গেলো ৩০ মিনিট, তারপর ৯০ টাকায় যাত্রা শুরু করলাম।

হ্যালো কপিলা… নৌকা ছেড়ে দিয়েছি। ছবি: সুশান্ত আরিন্দা

হাওর এলাকা হওয়ায় দুইপাশ ফাকা মাঝখান দিয়ে শুধুই রাস্তা বয়ে গেছে সাপের মতো একেবেকে অথবা কোথাও সরু সুন্দর মনোরম পথ তবে ফুরোচ্ছিলো না যেন। প্রায় ২ ঘণ্টা পর পৌঁছলাম তাহিরপুর। নামার সাথে সাথেই কয়েকজন পিছু নিলো মামা নৌকা আছে, নৌকা আছে, কেউ বলছে এখানেই নৌকা, কেউ বলছে সোলেমানপুর। শীতকালে পানি কম থাকার ফলে নৌকা তাহিরপুরে আসতে পারেনা। তখন সোলেমানপুর ঘাটে গিয়ে নৌকায় উঠতে হয়। 

নীরব দুপুরে হিজলে বনে। ছবি: লেখক

আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি বুঝতে পেরে ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করলাম, এক পিচ্ছি দোকানীকে জিজ্ঞেস করলাম নৌকা কোথা থেকে নিলে ভালো হবে, সে আমাদের উত্তর না দিয়েই এক মাঝিকে ফোন করে ফেললো, আমাদের বললো নৌকা ৩২০০ পরবে, যাবো কিনা ? সযত্নে এড়িয়ে গেলাম।

ওয়াচ টাওয়ার থেকে হাওরের দৃশ্য। ছবি: লেখক

তারপর কৃষি ব্যাংকের অপোজিটের হোটেল থেকে চা-নাস্তা খেলাম আর হোটেল কর্মীর থেকে জানলাম নৌকা সোলেমানপুর, পানি শুকিয়ে গেছে তাই তাই এখানে নৌক আসতে পারেনা।চায়ের দোকানে কয়েকজন অফার করলো নৌকার, আমরা বললাম ঘাটে গিয়েই নিবো।বাইকে চরলাম প্রতিজন ৩০ টাকা করে, ধুলো উড়িয়ে ২০ মিনিটে সোলেমানপুর, ঘাটে এসে দেখি বিভিন্ন সাইজের নৌকা, তাদের আবার বিভিন্ন রঙিন বাহার !

শুকনো হাওর, অতিথি পাখি,ঘাস খাওয়া গরু আর আমরা চারজন। ছবি: খায়ের মাঝি

নৌকা (ইঞ্জিনচালিত) একটা পছন্দ করে দরদাম শুরু করলাম, তারপর মতৈক্য হতেই উঠে পরলাম। সোলেমানপুর বাজার থেকে ড্রাই ফুড কিনে নিলাম, তারপর শুরু হলো হাওর যাত্রা।বর্ষায় হাওর থাকে জলে জলারন্য, আর শীতের হাওর যেন মায়াময়, সৌন্দর্য-ময়। দুইধারে হিজল গাছের সারি মাঝখানে বয়ে চলা শান্ত শীতল সরু খাল। গরুর পাল, হাঁসের ঝাক পানকৌড়ি আর অজস্র অতিথি পাখির আনাগোনা মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করবে প্রকৃতি প্রেমী যে কাউকে।

খায়ের মাঝির সাথে আমরা। ছবি: সুশান্ত আরিন্দা

আর আপনি যদি ভালোবাসেন ওইয়াল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি তাহলে তো স্বর্গরাজ্য আপনার জন্য। আমাদের একজন বলতেছিলো ডিসকভারি চ্যানেল লাইভ দেখছি, সত্যিই যেন তাই মনে হচ্ছিলো। প্রায় দুই ঘণ্টায় পৌঁছলাম ওয়াচ টাওয়ারে, সেখানে গাছের সারি আর অতিথি পাখি প্রাণ জুড়ালো, হাওরে পানি বেশি নেই কিন্তু ছিল হাজারো অতিথি পাখি, এর মধ্যে আমাদের মাঝি মামা তার আতিথেয়তা দিতে শুরু করেছেন, বিভিন্ন ভাবে গাইড দিচ্ছিলেন কোন দিকে পাখি বেশি, কিভাবে ভালো দেখা যাবে। অজস্র অতিথি পাখির কোলাহল, ডানা ঝাপটানো উড়াউড়িতে মুখরিত চারপাশ।      

হাওরে বিচরণকৃত পাখি। ছবি: লেখক

তারপর গোসল করলাম হাওরের শীতল জলে, এই সময়েও ছিল মাঝি আবুল খায়ের ভাইয়ের গাইডেন্স, কোনদিকে নিরাপদ, কোনদিকে বেশি পানি, বাশের কঞ্চি।গোসল করার জন্য সাবান অফার করলো, গোসলের পর গ্লিসারিন, কানে পানি ঢুকছে কিনা তাহলে কটন বাডস! গোসল করে ক্লান্ত ক্ষুধার্ত সবাই। যেই ব্যাগে খাবার সেই ব্যাগের খোঁজ পরলো, খুঁজে দেখি ব্যাগ নেই, আবার গেলাম ওয়াচ টাওয়ার, গিয়ে দেখি চায়ের দোকানী মামা সযত্নে রেখে দিয়েছে।

হাওরের জলে ঝাপাঝাপি। ছবি: সুশান্ত আরিন্দা

তারপর ফেরার পালা, তখন একদম বিকেল, আমরা হাওরের সৌন্দর্যের প্রেমে পরে অন্য সব প্ল্যান বাদ দিলাম তাই কোনো তাড়াহুড়ো নেই। শুধুই হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ। আসার পথে লাইভ ডিসকভারি দেখি আর বোনাস হিসেবে সূর্যাস্তের মায়াবী রূপ, শুধু এই দৃশ্য দেখার জন্য হলেও আবার যেতে রাজী।

বিশ্রামরত প্রকৃতি পুত্ররা। ছবি: সুশান্ত আরিন্দা

সন্ধার সাথে সাথে নামলাম সোলেমানপুর, আবার বাইকে তাহিরপুর পথে মন কাড়লো বাশের সেতু। তাহিরপুর এসে সন্ধ্যার পরে লাঞ্চ করলাম ভ্রমণ সঙ্গী প্রান্তর পিসির আতিথেয়তায়, তারপর সিএনজিতে সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ পৌঁছতে রাত ৮ টা বেজে গেলো তাই নতুন ব্রিজের এখানে বাস নেই তাই ভরসা ঢাকার বাস। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহ গামী শামীম বাসে প্রতিজন ১০০ টাকায় সিলেট, এরমধ্যে মাঝি খায়ের ভাই দুইবার ফোন করলো পৌঁছেছি কিনা।

ঠিক সন্ধে নামার মুখে,তোর নাম ধরে কেউ ডাকে। ছবি: লেখক

সিলেট থেকে সিলেট আমাদের খরচ ৭২৬ টাকা প্রতিজন। মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম এত কম টাকায় কেন গেলেন? অন্য নৌকা তো এতো কম টাকায় যেতে চাইলো না? উনি উত্তর দিলো, এটা বিনিয়োগ করলাম মামা, আমার সাথে গিয়ে ভালো লাগলে আপনারা আবার আসবেন।

হাওরের জলে সূর্যাস্ত। ছবি: লেখক

এটা শুনে যতটা ভালো লাগলো তার থেকে বেশি আফসোস লাগলো অন্যরা কেন ‘পাইছি ট্যুরিস্ট কামাইয়া লই’ মেন্টালিটির।  

মাঝির পরিচিতি
মোঃ আবুল খায়ের
মোবাইল: 01739-070206‎

ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ সরাসরি বাস চলাচল রয়েছে হানিফ, শ্যামলী, এনা পরিবহনের ভাড়া ৫৫০ টাকা। থাকার জন্য খুব একটা ভালো ব্যবস্থা নেই। মোটামুটি মানের কিছু হোটেল আছে। এছাড়া চাইলে নৌকাতেও রাতে থাকা যায়। খাবারের জন্য সম্প্রতি চালু হয়েছে পানসী রেস্তোঁরা।

ফিচার ছবিঃ সুশান্ত আরিন্দা

ভ্রমণগুরু সাইটে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখুন এই লিঙ্কে: https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top