in , ,

LoveLove

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ভ্রমণের খুঁটিনাটি

চোখ ধাঁধানো তীব্র নীল আকাশের পটভূমিতে সবুজাভ নীল সমুদ্রের দেখা দেশে একটি মাত্র জায়গায় মিলে যার নাম সেন্টমার্টিন দ্বীপ। কক্সবাজার জেলা টেনকনাফ উপজেলার অন্তর্গত এ প্রবাল দ্বীপটি বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের বিন্দু। নারিকেল গাছের আধিক্যের জন্য এ দ্বীপটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। চলুন দেখে নেই এ দ্বীপে কিভাবে যাবেন, কি খাবেন, কোথায় থাকবেন সহ সব খুঁটিনাটি বিষয়।

যাতায়াত:
সেন্টমার্টিন যেতে হলে আপনাকে প্রথমে টেকনাফ যেতে হবে, তারপর সেখান থেকে জাহাজ বা ট্রলারে করে সেন্টমার্টিন পৌঁছাতে হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার থেকে সহজেই আপনি টেকনাফের জেটিতে পৌঁছুতে পারবেন। ঢাকা থেকে টেকনাফের বাস রাত ৭ টা থেকে ৯ টার মধ্যে ছেড়ে যায়। যত তাড়াতাড়ি রওনা করতে পারেন তত ভালো, কারণ পথে যানজটে দেরী হয়ে গেলে জাহাজ না পাওয়ার আশংকা থেকে যায়।

চট্টগ্রাম থেকে রাত দেড়টায় বাস ছাড়ে নগরীর সিনেমা প্যালেস থেকে। আর কক্সবাজার থেকে সকাল ৬ টায় রওনা দিলেও জাহাজ ধরা সম্ভব। এছাড়া ছোট গাড়িতে বা সিএনজিতে করে কক্সবাজার থেকে টেকনাফের জেটিতে পৌঁছানো সম্ভব। ঢাকা থেকে টেকনাফ নন এসি বাসের ভাড়া ৯০০ টাকা। ইউনিক সার্ভিস, শ্যামলী, হানিফ, ইয়ার ৭১, সৌদিয়াসহ বেশ কিছু বাস চলে।

নীল সমুদ্র, সাদা বালির সৈকত আর কেয়াবনের সেন্টমার্টিন। ছবি: লেখক

এসি বাসের মধ্যে সেন্টমার্টিন হুন্দাই সবচেয়ে ভালো। এ ছাড়া গ্রীনলাইন, গ্রীন সেন্টমার্টিন, তুবা লাইনসহ আরও অনেকগুলো বাস চলে। ক্লাস অনুসারে এর ভাড়া ১৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ২৩৫০ টাকা পর্যন্ত। শীতের সময় এসব বাসে টিকেট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তাই শীতে সেন্টমার্টিন পরিকল্পণা করলে আগে থেকেই টিকেট কেটে রাখতে হবে।

জাহাজ
সেন্টমার্টিনগামী সব জাহাজ টেকনাফের জেটি থেকে সকাল ৯:৩০ এ ছেড়ে যায়। একই জাহাজ বিকাল ৩ টায় সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে আসে। বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিন পৌঁছুতে সাধারণত ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের মতো সময় লাগে। তবে দ্রুতগামী গ্রীনলাইন দেড় ঘণ্টা সময়ের মধ্যেও পৌঁছে যায়।

জাহাজের আসা-যাওয়ার জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া থাকে ৫৫০ টাকা। ক্লাস ও জাহাজ অনুসারে সর্বোচ্চ ভাড়া ১৬০০ টাকা। কেয়ারী সিন্দবাদ, কেয়ারী ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন, বে ক্রুজ, এমভি দোয়েল, এমভি পারিজাত, এলসিটি কাজল, এমভি ফারহান, আটলান্টিক ক্রুজ এবছর চলাচল করছে। প্রতিবছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ১৫ অক্টোবর থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হয়ে বন্ধ হয় এপ্রিলে এসে। এবছর জাহাজ চালু হয়েছে নভেম্বরের ১ তারিখ থেকে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে কিছুদিন বন্ধ থেকে ১০ নভেম্বর থেকে আবার চলছে।

সেন্টমার্টিনের জাহাজের ভাড়া:

কেয়ারী সিন্দবাদ: মেইন ডেক ৫৫০ টাকা, ওপেন ডেক ৭০০, ব্রীজ ডেক ৮০০

কেয়ারী ক্রুজ এন্ড ডাইন: এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জ ১০০০ টাকা, কোরাল লাউঞ্জ ১,০০০ টাকা, পার্ল লাউঞ্জ ১,৪০০ টাকা।

বে ক্রুজ: গ্রীন জোন ১,৩০০ টাকা, ব্লু জোন ১,৪০০ টাকা, রেড জোন ১,৬০০ টাকা।

এম ভি দোয়েল: ওপেন ডেক ৭৫০ টাকা, বিজনেস ক্লাস ৮৫০ টাকা

এম ভি পারিজাত: ওপেন ডেক ৭৫০ টাকা, বিজনেস ক্লাস ৮৫০ টাকা

এম ভি ফরহান: মেইন ডেক ৬০০ টাকা, ওপেন ডেক ৭৫০ টাকা, বিজনেস ক্লাস ৮৫০ টাকা।

এলসিটি কাজল: মেইন ডেক ৬০০ টাকা, ওপেন ডেক ৭৫০ টাকা, বিজনেস ক্লাস ৮৫০ টাকা।

আটলান্টিক ক্রুজ: ইকোনমি ডেক ৭৫০ টাকা, ওপেন ডেক ৮৫০ টাকা, রয়েল লাউঞ্জ ১,০৫০ টাকা (এসি), লাক্সারী লাউঞ্জ: ১,৩৫০ টাকা (এসি)

মনে রাখবেন জাহাজের ভাড়া সবসময় রিটার্ণ ধরেই কাটা হয়। আপনি যেদিন ফিরতে চান সেভাবে বললেই হবে, তারা সেভাবে টিকেট দিবে।

একটু আবহাও খারাপ থাকলে দেখতে পারেন এ ধরণের পিচিং। ভিডিও: লেখক

জাহাজগুলোর নিজস্ব অফিসগুলো থেকে টিকেট কেনা যায়। অধিকাংশ যাত্রীই একদিন থেকে পরের দিন আসেন, টিকেটও সেই ভাবে কিনেন। তবে চাইলেও দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব। যদিও অন্তত একরাত দ্বীপে না থাকলে এর সৌন্দর্য বোঝা সম্ভব নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার থেকে টিকেট কেনা সম্ভব।

অনেকেই আগে থেকে টিকেট কেটে তারপর যেতে চান। কেয়ারী সিন্দবাদ ও কেয়ারী ক্রুজ এন্ড ডাইনিংয়ের টিকেট অনলাইনে তাদের সাইট থেকে কাটা সম্ভব। এ ব্যপারে বিস্তারিত জানার জন্য ফোন করতে পারেন: 01886016460

কেয়ারীর ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত পাবেন। ওয়েবসাইটের লিংক: http://kearitourismbd.com/en_US/ মনে রাখবেন, আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হওয়ার আগ পর্যন্ত টিকেট কিনতে পারবেন না। এখন জাহাজ চলছে, তাই দেখেশুনে টিকেট কেটে নিতে পারেন।

থাকা-খাওয়া:
সেন্টমার্টিনে প্রায় ১৩০ টি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। সিজনের শুরুতে কম দাম থাকলেও মাঝামাঝিতে এসে দাম অনেক বেড়ে যায়। তারপরও শুক্র-শনিবার ছাড়া অন্য দিনগুলোতে কম দামে থাকা সম্ভব। রিসোর্টভেদে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

Abakah Parjatan Ltd: 01716789634
Baganbari Resort: 01787022220
Blue Lagoon Resort: 01818747946
Blue Marine Resort: 01713399001
CTB Resort: 01815632037
Diamond Sea Resort: 01753817449
Dream Night Resort: 01812155050
Hotel Sand Shore: 01815632037
Hotel Sea Inn: 01722109670
Hotel Sea Find: 01626182725
Kingshuk Eco Resort: 01815648731
Kokonut koral Resort: 01790505050
Labiba Bilash Resort: 01714634762
Light House Resort: 01819036363
Nil Digonte Resort: 01730051004
Nishorgo Kutir Resort: 01812426221
Music Eco Resort: 01613339696
Panna Resort: 1816172615
Prasaad Paradise: 01796880207
Shimana Periye: 01731962662
Shomudra Kanon: 01713486866
Shomudra Kutir: 01616-503129
Shayari Eco Resort: 01711232917
SKD Resort: 01797261261

সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন রিসোর্টের নাম্বার। সৌজন্যে: সেন্টমার্টিন ফ্রিক গ্রুপ।

সেন্টমার্টিনে দ্বীপের জীব বৈচিত্র রক্ষার জন্য রাত ১১ টার পর জেনারেটর চালানোর নিষেধাজ্ঞা আছে। ফলে রাতের বেলা বিদুৎ ছাড়া কাটাতে হয়। শীতকালে কোন সমস্যা না হলেও গরম থাকলে বেশ কষ্ট হয়। জেটি ও বাজারের কাছে বেশিরভাগ হোটেল ও রিসোর্ট অবস্থিত। একটু নিরিবিলি চাইলে পশ্চিম বিচে থাকা ভালো।

ড্রিমনাইট রিসোর্টের বারান্দা থেকে দেখা যাচ্ছে সমুদ্র

প্রতিটি হোটেল বা রিসোর্টে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। আগে থেকে বলে রাখলে তারা খাওযার ব্যবস্থা করে রাখে। কি খাবেন সেটার উপর নির্ভর করে প্রতিবেলা খরচ ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পড়তে পারে। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে কোরাল খুব জনপ্রিয়। এছাড়া লবস্টারসহ অন্যান্য মাছ তো আছেই।

রিসোর্ট ছাড়াও জেটির কাছে ও সমুদ্র বিলাস রিসোর্টের কাছে অনেকগুলো খাবার হোটেল পাবেন। সেখানে মাছ দেখিয়ে দিয়ে, সেটা ভেজে খাবার সুযোগ আছে। রিসোর্ট/হোটেলগুলোতে বললে তারা রাতে বার-বি-কিউ করে দেয়। মুরগি বা মাছের বার-বি-কিউ বেশি জনপ্রিয়। দাম মোটামুটি, আলোচনা করে ঠিক করে নিবেন।

মাছ দেখিয়ে দিলে ভাজা করে দেবে। ছবি: লেখক

কি কি করবেন:
সেন্টমার্টিন দ্বীপে আসলে হ্যামকে শুয়ে সমুদ্র দেখে দেখেই কয়েকদিন পার করে দেয়া সম্ভব। আর করতে চাইলেও অনেক কিছু করার আছে। কয়েকটি নিচে দিলাম। পরবর্তীতে আরেকটি বিস্তারিত আর্টিকেল লিখবো এ ব্যাপারে।

১. সমুদ্র সৈকত দেখা। অগভীর স্বচ্ছ নীলাভ সমুদ্রের পানিতে না নামলে তো সেন্টমার্টিন দেখাই বৃথা। নামার আগে অবশ্যই নিরাপদ জায়গা কোথায় শুনে নিবেন, জেটির পাশে নামবেন না।

ঘণ্টা চুক্তিতে পারে চালাতে পারেন সাইকেল। ছবি: লেখক

২. সাইকেল চালানো। আপনি যদি সাইকেল চালাতে পারেন, তবে পুরো দ্বীপ সাইকেলে ঘুরে দেখতে পারেন। খরচ প্রতি ঘন্টা ৪০/৫০ টাকা নিবে। সবখানেই সাইকেল ভাড়া পাবেন।

৩. ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণ। সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে বিচ্ছিন্ন অংশটুকুকে ছেঁড়া দ্বীপ বলে। নৌকা ভাড়া করে, হেঁটে বা স্পিড বোটে ছেঁড়া দ্বীপ ঘুরে আসতে পারবেন।

৪. স্কুবা ডাইভিং। প্রতিবছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে স্কুবা ডাইভিং করা যায় । প্রশিক্ষণসহ খরচ পড়ে ৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকার মতো।

খরচ:
ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিনে এক রাত থেকে আবার আসতে মোটামুটি ৫-৬ হাজার টাকা খরচ হবে। বাস ভাড়া: আসা-যাওয়া ১৮০০ টাকা, জাহাজ ৫৫০ টাকা, হোটেল ১৫০০ টাকা, খাবার প্রতি বেলা ১৫০ টাকা ধরে বাজেট করে নিতে পারেন। বাকিটা আপনি কতটুকু বিলাসি তার উপর নির্ভর করে।

দ্রুতগামী গ্রীনলাইন টেকনাফর কাছে দেখা যাচ্ছে। ছবি: লেখক

ভ্রমণ পরিকল্পণা:
সেন্টমার্টিনে অন্তত একরাত না থাকলে এই ভ্রমণটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই রাতের বাস ধরে রওনা দিয়ে সকালের জাহাজে সেন্টমার্টিন যেয়ে এক রাত থেকে পরের দিন বিকাল তিনটার জাহাজে ফিরে এসে টেকনাফ থেকে বাস ধরে ফিরতে পারেন। বাসগুলো জাহাজ না আসা পর্যন্ত ছাড়েনা।

সেন্টমার্টিন বিষয়ক চমৎকার একটি ফেইসবুক গ্রুপ আছে। সেখানে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পাবেন। গ্রুপ লিংক:
https://www.facebook.com/groups/SaintMatrinFreak/

বিষেশ সতর্কতা:
সেন্টমার্টিন বর্তমানে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিকাল এরিয়া হিসেবে আছে যার অর্থ পর্যটনের ভারে এখানকার জীব বৈচিত্র‌্য হুমকির সম্মুখীন হয়ে আছে। সেন্টমার্টিন বেড়াতে গেল প্রবাল ও প্রকৃতির ক্ষতি হয় এমন কিছু করবেননা। কোন প্রকার অপঁচনশীল দ্রব্য কোথাও ফেলবেন না।

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আলীকদমে আলীর খোঁজে: মারায়ন তং জাদি

আলীকদমে আলীর খোঁজে: তুক-অ-দামতুয়া