কালের সাক্ষী হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির

সূর্য এখন মধ্য গগণে। ছুই ছুই এই পড়ন্ত বিকালে সাই সাই বেগে ছুটে চলছে আমাদের বাস। গন্তব্য আবার সেই সিরাজগঞ্জ রাস্তার রাউন্ডবট। আজ পহেলা বৈশাখ। গেল দুটি মাস যেন হাওয়ায় হাওয়ায় কোথায় চলে গেল। এইটা ভাবলেই ঘোরের মধ্যে চলে যাই। সূর্য ক্ষণিকের জন্য মধ্য গগণে উত্তাপ ছড়ালেও ছিটেফোটা বসন্তের ছোয়া মৃদু প্রশান্তি নিয়ে আসে ধরণিতে। তারই মাঝে আমাদের ছুটে যাওয়া। এই ছুটে যাওয়ার মাঝেই তো আমার আর ঈসমাইল ভাইয়ের পথ চলা। শাহাজাদপুরের সুখ স্মৃতি ধরা দেয় এর মাঝে। রবীন্দ্র ভুবনের নস্টালজিয়ার ঘোর এখন কাটেনি।

হাটিকুমরুল যাবার পথ। ছবি: লেখক।

চারদিকে গ্রীষ্মের ছুই ছুই ভাব। গেল দুটি মাস বসন্তের মৃদু-মন্দ সমীরণে জুড়িয়েছিল বাংলার জল, স্থল, আকাশ। কোন উদাসী বাশির সুরের মূর্ছনায় লেগে ছিল যেন। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে গণগণে গ্রীষ্ম আজ গগণে গগণে ছড়িয়ে দিচ্ছে উত্তাপ। কবে আসবে আবার বর্ষা রানী তা ভেবে ঘামের চিকন রেখে ললাট বেয়ে গাল স্পর্শ করে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। দেখতে দেখতে এসে গেলাম সেই রাউন্ডবটে। নেমেই ভ্যান ঠিক করে হাটিকুমরুল হাইওয়ে ধরে আমাদের ছুটে চলা। খানিকটা দূর যাবার পর বামে হাটিকুমরুল নবর‍ত্ন মন্দিরের সাইন বোর্ড দেখলাম। পিচ ঢালা রাস্তা থেকে এবার নেমে এলাম গ্রামের আধা পাকা রাস্তায়।

চণ্ডি মন্দির। ছবি: লেখক

দুই পাশে দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত, একটু পর পর দেখা যাচ্ছে খেজুর গাছ। তারই সাথে আকাশটা যেন ছুটছে আমাদের সাথে। সবুজের এই জনপথ পেরিয়ে ছোট্ট একটা মেঠো পথ ধরে ছুটে চলছে আমাদের ভ্যান। পথটি যেন আঁকাবাঁকা হয়ে আহবান জানাচ্ছে উত্তরের। উত্তর পথে ঘাটে চলতে গিয়ে কত ইতিহাস, ঐতিহ্য  আমায় গ্রাস করেছে সে হিসাব কোন দিন করা হয়নি। এ পথের মায়ার হিসাব কোনদিন হয়তো করতেও পারবো না। এই পথ ধরে এক কিলোমিটার যাবার পর উপস্থিত হলাম পোড়ামাটির কাব্যে গাঁথা এক উপখ্যানের সামনে। এই তো সেই হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির।

শিব-পার্বতি মন্দির। ছবি: লেখক

দাঁড়িয়ে আছি দেশের সর্ববৃহৎ নবরত্ন মন্দিরের সামনে। ঐতিহ্য তুমি লুকিয়ে রেখেছো কোন ইতিহাস। ইতিহাস জানবে সে উপায় বা কোথায়। নেই এখানে কোন প্রত্মতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড। এই মন্দিরের পাওয়া যায়নি কোন শিলালিপি। তবুও অনুসন্ধানির চোখ ফাঁকি দেয় কি ভাবে। ইতিহাস খুড়ে পাওয়া যায় অনুমানিক ১৭ শতকে নবাব মুর্শিদকুলির আমলে মন্দিরটি তৈরি হয়। দেখতে অনেকটা দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দিরের মত। এক সময় মন্দিরে ৯টি চূড়া ছিল বলে নবরত্ন মন্দির হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করে মন্দিরটি। তিন তলা বিশিষ্ট মন্দিরের দেয়ালের চারপাশ পোড়ামাটির ফলক দিয়ে অপরূপ রূপে সজ্জিত।

মন্দিরের ভিতর ভিউ ফাইন্ডার ঈসমাইল ভাই। ছবি: লেখক

ইতিহাস বলে তৎকালীন দিনাজপুরের রাজা প্রাণনাথ কান্তজিউ মন্দির নির্মাণ কালীন সময় ভীষন অর্থ সংকটে পড়ে যান। রাজকোষ ও হয়ে যায় তার শূণ্যের কোঠায়। এর ফলে সে বছরের রাজস্ব পরিশোধ করতেও ব্যর্থ হন। ঘোর সংকটে ডুবে ছিলেন রাজা প্রাণনাথ। সেই সংগিন সময় সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেয় বন্ধুবর জমিদার রামনাথ ভাদুরী। তার কোষাগারের অর্থ দিয়ে বন্ধুর ঋণ পরিশোধ করেন। বদলে কিছু চাননি। তবে তার চোখ বেজে ছিল যেন কান্তজিউ মন্দিরের চোখ ধাধানো নকশা ও নির্মাণশৈলীতে। হারিয়ে গিয়েছিলেন বোধ হয় কান্তজিউয়ের টেরাকোটার কাব্যিকতায়। তাই শর্ত হিসাবে বন্ধুকে কান্তজিউ মন্দিরের মত মন্দির তৈরি করে দেনা পরিশোধ করতে বলেন রামনাথ ভাদুরী। সেই কথা রেখেছেন রাজা প্রাণনাথ। দুই বন্ধুর ভালোবাসার নির্দশন হিসাবে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির। শুধু কালের স্রোতে মুছে গেছে কয়েকশ শতক।

মন্দিরের সামনে পর্যটকের আনাগোনা। ছবি: লেখক

তবে ইতিহাস যত গ্লানি নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকুক না কেন। আমাদের শ্রদ্ধেয় ঈসমাইল ভাই যে কোন জায়গায় গেলেই ভিউ ফাইন্ডিংয়ের মুডে চলে যায়। উনার যে বিষয়টা সব থেকে ভাল লাগে নিরবে প্রকৃতির মাঝে ডুবে যাওয়া। নিজের ছবি তুলে দেবার জন্য প্যারা না দেওয়া। প্রথম দেখায় কান্তজিউ ভেবে অনেকের বিভ্রম হতে পারে। কারণ দুইটা যে আইডেনটিক্যাল কপি। ভাবা কি যায় কত ক্রোশ দূরে কান্তজিউ। তখনকার যুগের কারিগরের চোখগুলো যেন জীবন্ত ক্যামেরা। অথচ এখন আমার ঘুরতে গিয়ে ছবি তোলার তালে ভ্রমণের উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছি। কত যুগ ধরে এই মন্দির এবং অত্র এলাকা ইতিহাসের বুকে দাঁড়িয়ে আছে দাম্ভিকভাবে।

ওয়াইড অ্যাংগেলে হাটিকুরুল নবরত্ন মন্দির। ছবি: লেখক

আমি শেষ এখানে এসেছিলাম ২০১৫ সালে আর আজ ২০১৯ সালে পহেলা বৈশাখ। তখন তেমন ছিল না পর্যটকের আনাগোনা। আজ ছুটির দিনে স্থানীয় ও আশেপাশের এলাকা থেকে মানুষ এসেছে। রাজধানির বুকে থেকেও এসেছে ঐতিহ্য অন্বেষণ করা যুবক-যুবতীর দল। সীমিত এই পদচারণা লেখালিখির কারণে পরিসর বেড়েছে দেখে ভালই লাগলো। স্থানীয় ভাবে দোল মঞ্চ হিসাবেও বেশ পরিচিত আমাদের নবরত্ন মন্দির।

মন্দিরের ছাদে লতাপাতার কাজ। ছবি: লেখক

তবে মূল মন্দিরের প্রবেশের আগেই শিব-পার্বতী মন্দির, তার পাশেই দোচালা চণ্ডি মন্দির ঐতিহ্যের উপর মালাইয়ের প্রলেপ বুলিয়ে যাবে। সেই প্রলেপের মজা নিতেই ঈসমাইল ভাই নিজের ছবি তুলেন কিছু। তবে হাটিকুমরুল মন্দিরের দুর্বার আর্কষণ চুম্বকের মত টানছে। আর দেরি না করে হাটা দিলাম তার পানে।

শিল্পের ছোয়া। ছবি: লেখক

অবাক কারুকার্যে বাংলার এক বিষ্ময় যেন এই তিন তলা বিশিষ্ট নবরত্ন মন্দিরটি, তার আশেপাশে তিনটি মন্দির আছে দুটি মন্দির তো আমরা পার হয়ে এলাম এর দক্ষিণ দিকে পুকুর ঘেষে আছে একচালা বিশিষ্ট একটি শিব মন্দির। পোড়ামাটির ফলক সমৃদ্ধ ৯টি চূড়া থাকায় এটিকে নবরত্ন মন্দির বলা হয়। বর্তমানে ৯টি চূড়ার প্রায় সবগুলোই ধ্বংসপ্রায়। মূল স্তম্ভের উপরে এক সময় শোভা পেত পোড়ামাটির চিত্রফলক। ১৮৯৭ সালে প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পে বাংলার অন্যান্য নির্দশনের মত ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এই মন্দিরটিও।

দুয়ারের সিম্ফনি। ছবি: লেখক

এক সময় ফুল, ফল, লতাপাতা, দেবদেবীর মূর্তি খচিত দৃষ্টিনন্দন ফলক দেখা গেলেও সংস্কার ও কালের বির্বতলে তা হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। বর্গাকার মন্দিরটি আয়তনের প্রায় ১৬ স্কোয়ার বর্গমিটার। এর মূল কক্ষটা বেশ বড়। নিচতলায় ২টি বারান্দা বেষ্টিত একটি গর্ভগৃহ। এর বারান্দার বাইরের দিকে ৭টি এবং ভিতরের দিকে ৫টি প্রবেশ পথ।

এই সেই সিরাজগঞ্জ রাউন্ডবট। ছবি: লেখক

মন্দিরের এই প্রবেশপথের সংখ্যা পার্থক্য গড়ে দেয় কান্তজিউ মন্দিরের সাথে। এর গর্ভগৃহের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে যথাক্রমে ২টি সুরঙ্গ পথ। মন্দিরে দুই তলায় নেই কোন বারান্দা। পুব দিকে আমরা ঘুরতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম মন্দিরের উপরে উঠার সিড়ি। জনশ্রুতি শুনা যায় এই মন্দিরের প্রতিটি ইট ঘিয়ে ভেজে তৈরি করা হয়েছিল।

নান্দনিক দুয়ার। ছবি: লেখক।

দেখতে দেখতে এবার যাবার সময় ঘনিয়ে এল। বিকালে শেষের প্রকৃতিতে সন্ধ্যার আহবান। তবে উত্তরবঙ্গ তার কথা রেখেছে। এখন রোদের উত্তাপ মিয়িয়ে যায়নি। তবুও এর মাঝে সুশীতল বাতাস প্রশান্তি বয়ে দিয়ে যায়। পড়ন্ত এই বিকালে থেকে থেকে বাতাসের ভাসে মেঠো পথের বুনো গন্ধ। গগণে কমলা রং ছড়িয়ে পড়েছে আজ, সুর্যটাও পশ্চিমে হেলে যাবার নিচ্ছে প্রস্তুতি। একটি ফিঙ্গে গাছের ডালে বসে আছে একাকি। দিন শেষে বোধ হয় সবাই একা হয়ে যায়। আমি সেই ফিঙ্গের মাঝে নিজের কোন পার্থক্য খুঁজে পেলাম না। দুজনই আজ নিরহারা। এবার সব কিছু ফাকি দিয়ে আবার সেই যান্ত্রিক শহরের দিকে ছুটে যাবার পালা। বিদায় ঐতিহ্য, বিদায় সিরাজগঞ্জ। নতুন কোন গল্প লেখা হবে না হয় নতুন কোন শহরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top