fbpx

বিউটিফুল বাংলাদেশ: নওগাঁ – কুসুম্বা মসজিদ

একদিন মোস্তাক খুব সুন্দর একটা ক্যালেন্ডার এনে ঝুলিয়ে দিলো দেয়ালে। বারো মাসে বাংলাদেশের বারোটা মসজিদের ছবি। এরপর যেটা হতে লাগলো, আমরা একেক জেলায় যাই আর ফিরে এসে ক্যালেন্ডার দেখি কয়টা মসজিদ দেখা হলো। এভাবে একে একে সবগুলোই দেখে ফেলেছিলাম আমরা। এরকমই আমাদের দেখা একটা মসজিদ হচ্ছে নওগাঁর কুসুম্বা মসজিদ। হ্যাঁ, এটা সেই পাঁচ টাকার নোটের উপর ছাপা মসজিদটা।  

মসজিদের নামফলক। ছবি: লেখক

কুসুম্বা মসজিদ বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার মান্দা থানার কুসুম্বা গ্রামের একটি প্রাচীন মসজিদ। এই মসজিদটি সুলতানি আমলের একটি পুরাকীর্তি এবং নওগাঁ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণ দিকে প্রায় ৭৭ বিঘার উপর বিশাল একটি দীঘি আছে। এটি লম্বায় প্রায় ১,২০০ ফুট ও চওড়ায় প্রায় ৯০০ ফুট। গ্রামের মানুষ এবং মসজিদে আসা মুসল্লীদের খাবার পানি, গোসল ও অযুর প্রয়োজন মেটানোর জন্য এই দীঘি খনন করা হয়েছিল। এবং দীঘির পাড়েই নির্মাণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ।

বিশালাকৃতির কুসুম্বা দীঘি। ছবি: লেখক
দীঘির ঘাটে আলোর ব্যবস্থা। ছবি: লেখক

কুসুম্বা দীঘির পশ্চিম পাড়ে, ব্যাসল্ট পাথরের তৈরি ধূসর বর্ণের মসজিদটি অবস্থিত। প্রথম দেখায় হঠাৎ মনে হচ্ছিলো, বালু দিয়ে বানানো। ব্যাসল্ট পাথরের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ধূসর রঙের কারণে এই ভ্রমের সৃষ্টি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ এবং নওগাঁর কুসুম্বা মসজিদের রঙ, গঠন, নকশায় বেশ মিল পাওয়া যায়। মসজিদের প্রবেশদ্বারে বসানো ফলকে নির্মাণকাল লেখা আছে হিজরি ৯৬৬ সাল, অর্থাৎ ১৫৫৪-১৫৬০ খ্রিষ্টাব্দ। জানা যায়, আফগানী শাসনামলের শুর বংশের শেষদিকের শাসক গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহের আমলে সবর খান বা সুলায়মান নামে একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। সেই হিসেবে মসজিদটির বয়স সাড়ে চারশো বছরেরও বেশি। 

মসজিদের একাংশ। ছবি: মোস্তাক হোসেন

মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ৫৮ ফুট, প্রস্থে ৪২ ফুট। চারদিকের দেয়াল ৬ ফুট পুরু। মসজিদের সামনের দিকে আছে ৩টি দরজা। দরজাগুলো খিলানযুক্ত মিহরাব আকৃতির। মসজিদের চারদিকে ৪টি মিনার। মিনারগুলো মসজিদের দেয়াল পর্যন্ত উঁচু ও আট কোনা। মসজিদের গায়ে আছে লতাপাতার নকশা। প্রাচীর ঘেরা মসজিদটির প্রধান ফটকে প্রহরী চৌকি ছিল। মসজিদের স্থাপত্যে বাংলা স্থাপত্যরীতির প্রভাব পাওয়া যায়। 

কারুকাজ। ছবি: লেখক

মসজিদের মূল গাঁথুনি ইটের হলেও এর সম্পূর্ণ দেয়াল এবং ভেতরের খিলানগুলো পাথরের আস্তরণে ঢাকা। মসজিদের স্তম্ভ, ভিত্তি মঞ্চ, মেঝে ও দেয়ালের জালি নকশা পর্যন্ত পাথরের। মসজিদটি আয়তাকার এবং এতে রয়েছে তিনটি বে এবং দুটি আইল। মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পশ্চিম দিকের দেয়ালের থেকে আলাদা। পশ্চিম দেয়ালের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এবং মাঝামাঝি প্রবেশপথ বরাবর দুটো মিহরাব রয়েছে যা মেঝের সমান্তরাল। উত্তর-পশ্চিম কোণের বে-তে মিহরাবটি একটি উঁচু বেদীর উপর বসানো। মোট মিহরাব আছে ৩টি, যার সবগুলো কালো পাথরের তৈরি। মিহরাবে আঙ্গুরগুচ্ছ ও লতাপাতার নকশা খোদাই করা আছে। নকশাগুলো এতো নিখুঁত আর সুন্দর, না দেখলে বোঝানো যাবে না। 

লতাপাতার মনোহর নকশা। ছবি: লেখক

মসজিদের ছাদে দুই সারিতে ৬টি গোলাকার গম্বুজ আছে। দ্বিতীয় সারির গম্বুজগুলো আকৃতির দিক দিয়ে ছোট। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে ৩টি গম্বুজ নষ্ট হয়েছিল। পরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটি সংস্কার করে। মসজিদের ভেতর ২টি পিলার আছে। উত্তর দিকের মিহরাবের সামনে পাথরের পিলারের ওপর তৈরি করা হয়েছিল একটি দোতলা ঘর। এই ঘরটিকে বলা হতো জেনান গ্যালারি বা মহিলাদের নামাজের ঘর। এখানে মহিলারা পৃথকভাবে নামাজ পড়তেন। ভূমিকম্পে এই জেনান গ্যালারিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এখন পুরুষরা মসজিদের ভেতর নামাজ পড়লেও, মহিলারা মসজিদের পাশে খোলা জায়গায় নামাজ আদায় করেন। মসজিদ ঘেঁষে একটা বিশাল তেঁতুল গাছ আছে। আমরা যখন গিয়েছি, গাছে তেঁতুল ছিল না। আফসোস! 

মসজিদের প্রাচীর। ছবি: মোস্তাক হোসেন

মসজিদের সামনে এবং চারদিকে অনেকখানি খোলা জায়গা আর পাথর বসানো সিঁড়ি, যেটা দীঘিতে গিয়ে নেমেছে। সিঁড়িপথ এবং দীঘির ঘাট খুবই সুন্দর। আলোর ব্যবস্থাও করা আছে যেন সন্ধ্যার পর মুসল্লীদের সমস্যা না হয়। ২০১৭ সালে মসজিদের চারদিকে এবং দীঘির পাড়ে ফুলের বাগান নির্মাণ এবং আলোকসজ্জার কাজ করা হয়। 

দীঘির পাড়ে। ছবি: মোস্তাক হোসেন

মসজিদের প্রবেশ পথের ‌একটু দূরে বাক্স আকৃতির একখণ্ড কালো পাথর দেখা যায়। এটিকে অনেকে কবর বলে মনে করেন। জানা যায়, জনৈক কৃষক হাল চাষের সময় তার জমিতে পাথরটির সন্ধান পায়। সম্ভবত তার প্রচেষ্টায় পাথরটি জমি থেকে তুলে এনে রাস্তার পাশে রাখা হয়েছিল। এই পাথরের গায়ে আরবিতে লেখা রয়েছে, ‘আল মালেকু মা হুমম মোকারারামা আবুল মোজাফফর হোসেন শাহ বিন সৈয়দ আসরাফ আল হোসেন।’ যার অর্থ ‘তিনি শাসক যিনি পরাক্রমশালী ও সন্মানের অধিকারী সৈয়দ আশরাফ আল হুসেনের পুত্র আবুল মোজাফফর হোসেন শাহ।’ এ থেকে ধারণা করা হয়, পাথরের খণ্ডটি হুসেন শাহের স্মৃতি বিজড়িত।

কুসুম্বা মসজিদ। ছবি: মোস্তাক হোসেন

মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে মসজিদের সামনে একটি দান বাক্স রাখা আছে। জানা যায়, সেই দান বাক্স প্রতি তিন মাস অন্তর খোলা হয় এবং দান বাক্স থেকে প্রাপ্ত টাকায় মসজিদের শোভা বর্ধনের কাজ চালানো হয়। প্রতিদিন প্রচুর ধর্মপ্রাণ মানুষ এই মসজিদে ইবাদত এবং মনের ইচ্ছাপূরণের উদ্দেশ্যে মানত করতে আসেন। আর এই পর্যটকদের ঘিরে মসজিদের আশেপাশে বেশ কিছু দোকানপাটও গড়ে উঠেছে।

কিভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে কুসুম্বা মসজিদ যেতে হলে শুরুতে চলে যাবেন নওগাঁ শহরে। শ্যামলী, হানিফ, এসআর ট্রাভেলসের এসি, ননএসি সরাসরি ঢাকা থেকে নওগাঁর বাস পাওয়া যাবে। বাসে গেলে নামবেন নওগাঁর বালুডাঙ্গা বাস টার্মিনালে। রেলপথে যেতে চাইলে লালমনি এক্সপ্রেস বা রংপুর এক্সপ্রেসে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে সান্তাহার স্টেশনে নেমে সেখান থেকে অটোতে যেতে পারবেন। বালুডাঙ্গা থেকে বাস অথবা সিএনজিতে যেতে হবে মান্দায়, নওগাঁ থেকে মান্দার দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। সেখানে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়ক থেকে তিন মাইল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কুসুম্বা গ্রামে মসজিদটির অবস্থান। 

কোথায় থাকবেন:
রাতে থাকার জন্যে নওগাঁ শহরে বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল রয়েছে। হোটেল অবকাশ, হোটেল যমুনা, হোটেল ফারিয়াল অন্যতম। এছাড়া মান্দায় থানা ডাকবাংলো আছে, যেখানে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে থাকা যায়।

নওগাঁর ‘পতিসর কাছারি বাড়ি’ নিয়ে প্রথম পর্বের লেখা পড়তে ক্লিক করুন:
https://www.vromonguru.com/all-divisions/rajshahi-division/beautiful-bangladesh-naogaon-potishor-kachari-bari/

আমার পূর্বের ভ্রমণ কাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন নীচের লিংকে: https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন। দেশের সৌন্দর্য রক্ষায় সচেতন হোন।

ফিচার ছবি: মোস্তাক হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top