fbpx

বিউটিফুল বাংলাদেশ: নওগাঁ – জগদ্দল মহাবিহার ও আলতাদীঘি

সৌরভদা যখন বললেন, আজকে আপনাদের জগদ্দল মহাবিহার দেখাবো, চট করে ভাবনায় এলো, ‘জগদ্দল’ শব্দটা থেকেই কি এর নাম এমন হয়েছে? ‘জগদ্দল’ অর্থ নড়ানো যায় না এমন ভার। এই বিহারে কি এমন কোন জগদ্দল পাথর আছে নাকি? যাইহোক, এইসব প্রশ্ন মাথায় নিয়ে মোটামুটি ভরদুপুরে বিহারে উপস্থিত হলাম।

প্রবেশ মুখে বিহারের পাদটীকা। ছবি: লেখক

বাংলার বুকে চারশ বছর যাবৎ দাপিয়ে বেড়ানো পাল রাজাদের সময় নির্মিত এই জগদ্দল মহাবিহার। রাজা রামপাল গৌড় রাজ্য পুনরুদ্ধারের পর রামাবতী নগরে রাজধানী স্থাপন করেন। খুব সম্ভবত রাজা রামপাল এই রামাবতী নগরে জগদ্দল বিহার নির্মাণ করেন তাঁর শাসনামলে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারা তাদের রাজ্যের সর্বত্র নানারকম বৌদ্ধ মন্দির, মঠ এবং ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলেন। ধারণা করা হয়, রাজা রামপাল প্রায় ৫০টি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। এর মাঝে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, সোমপুর মহাবিহার, বিক্রমপুরী বিহার, বিক্রমশীলা মহাবিহার এবং জগদ্দল মহাবিহারের নাম।

ইতিহাস বলে, এই বিহারটি প্রাচীন বাংলার শিক্ষা-দীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতে, এই বিহারের দুইজন স্বনামধন্য পণ্ডিত ছিলেন দানশীল ও বিভূতিচন্দ্র। প্রায় পঞ্চাশের বেশি গ্রন্থের তিব্বতী অনুবাদ করেন আচার্য দানশীল। রাজপুত্র বিভূতিচন্দ্র ছিলেন একাধারে গ্রন্থকার, টীকাকার, অনুবাদক ও সংশোধক। জগদ্দল বিহারের আচার্য ছিলেন মোক্ষকর গুপ্ত। শুভকর গুপ্ত, ধর্মাকর, প্রভৃতি মনীষী আচার্যরা কোন না কোন সময় এই মহাবিহারের অধিবাসী ছিলেন। এই জ্ঞানসাধন কেন্দ্র এখন মোটামুটি ধ্বংসপ্রাপ্ত। 

খনন কাজের পরবর্তী অবস্থা। ছবি: লেখক

সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চালানো প্রাথমিক জরিপের পর ১৯৯৬ সালে জগদ্দল গ্রামে একটি খননকার্য চালানো হয়। এ সময় এখান থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি পাথরের স্তম্ভ, যা এ প্রত্নস্থলের সময়কাল নির্ধারণে সাহায্য করে। এখান থেকে দেড়শোরও বেশি শিল্প নিদর্শন ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে আছে শিলালিপি, অলংকৃত ইট, মাটির তৈরি বিভিন্ন রকম পাত্র, পোড়ামাটির ফলক, জপমালার পুঁতি, স্বর্ণপিণ্ড ইত্যাদি।  

জগদ্দল বিহারটি বর্গাকার, চারপাশের সমতল ভূমি থেকে এর গড় উচ্চতা ৫.৫ মিটার। ঢিবিটির মাঝখানে আছে একটি খাদ। বিহারে আছে সারি সারি আয়তাকার কুঠুরি। এগুলো সম্ভবত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অনেক জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা রকমের পাথরের কলাম। এগুলো দেখে আমার শুধুই জগদ্দল পাথরের কথা মনে হচ্ছিলো! মূল বিহারটির আশপাশে আরও কিছু ঢিবি আছে। সেগুলোতে এখনো খনন কাজ চালানো হয়নি। 

বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কক্ষ। ছবি: মোস্তাক হোসেন

দেখাশোনার জন্যে সেখানে একজন লোক আছেন। আমরা তো আবার যেখানে যাই, নিজেদের নাম খোদাই করে আসতে ভুলি না। এরকম স্কুলপড়ুয়া কিছু ছেলে-মেয়ে এবং তাদের অভিভাবকও এসেছিলেন সেখানে। ওরা দেয়ালে নিজেদের নাম লিখতে গেলে কেয়ারটেকার ভদ্রলোক ছুটে গেলেন। বললেন, ‘পড়াশোনা করো, অথচ পুরাকীর্তির মূল্য বুঝো না!’ সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি! 

বিহারের একাংশ। ছবি: লেখক

জগদ্দল মহাবিহার থেকে বের হয়ে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম জয়পুরহাটে। এই আরেক মজার ব্যাপার। নওগাঁ থেকে জয়পুরহাট একেবারেই কাছে। এই দুই জেলা আপনি একবারে ঘুরে আসতে পারবেন। জয়পুরহাটে খেয়ে আবার চলে গেলাম ধামইরহাট। 

জগদ্দল বিহার থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরত্বে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছাকাছি আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান। এই উদ্যানেই আলতাদীঘি নামে এক জলাশয় আছে, যাকে বলা যায় সবচেয়ে প্রাচীনতম দীঘি। আয়তনে প্রায় ৪৩ একর। অবশ্যই এই দীঘির পেছনেও চমৎকার গল্প আছে। কথিত আছে, আনুমানিক ১৪০০ খ্রীষ্টাব্দে এ অঞ্চলের রাজা বিশ্বনাথ জগদল রাজত্ব করতেন। সেই সময় এই অঞ্চলে পানির অভাব প্রকট ধারন করেছিল। একদিন রানী স্বপ্নে দেখলেন যে, উক্ত এলাকার পানির সমস্যা নিরসনের জন্য একটি বৃহৎ দিঘী খনন করতে হবে। সেই মতে রাণী রাজাকে বললেন আমি পায়ে হেঁটে যাবো এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আমার পা ফেটে রক্ত না বের হবে ততক্ষণ পর্যন্ত হাঁটতে থাকবো।

উদ্যানের মুখে দীঘির বর্ণনা। ছবি: লেখক

আমি যতোদুর পর্যন্ত হাঁটবো, ততো বড় একটি দিঘী খনন করে দিতে হবে। কথামতো, পাইক-পেয়াদা, বাঁদিসহ রাণী হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে রাণী বহুদুর চলে যাচ্ছিলেন। তখন পাইক-পেয়াদারা চিন্তা করলো, রাণী যদি এভাবেই হাঁটতে থাকেন, তাহলে রাজার পক্ষে এতোবড় দিঘী খনন করা সম্ভব হবে না। তাই তারা হাঁটার এক পর্যায়ে রাণীর পিছন থেকে রাণীর পায়ে আলতা ঢেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠে বললো, রাণীমা, আপনার পা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। তখন রাণীমা উক্ত স্থানে বসে পড়লেন। রাজা বিশ্বনাথ জগদল সে পর্যন্ত দিঘীটি খনন করে দিলেন। রাণীর পায়ে আলতা ঢেলে দেওয়ার প্রেক্ষিতে দিঘীটির নামকরণ করা হয় ‘আলতাদিঘী’।

আলতাদীঘির অংশ। ছবি: লেখক

প্রাচীন দীঘি আরো আছে, কিন্তু ব্যবহারযোগ্য নেই। আলতাদীঘি সেদিক থেকে ব্যতিক্রম। এই দীঘিতে এখনো মাছের চাষ হয়। এখানে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য আসলে উইপোকার ঢিবি দেখা। শুনে অবাক হয়েছিলাম যখন সৌরভদা বললেন, একেকটা ঢিবি নাকি প্রায় তিন মিটার উঁচু! এই আলতাদীঘিকে প্রাক্তন সরকারের আমলে পিকনিক স্পট হিসেবে গড়ে তোলা হয়। দীঘির অনেকটা অংশ ভরাট করে ফেলা হয় এবং অর্ধেক অংশ লিজ দেয়া হয় মাছ চাষের জন্যে। সেই সুবাদে পানকৌড়িদের আনাগোনা দেখা যায় দীঘির জলে। বর্ষায় গেলে পদ্ম ফুলের সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে। উদ্যানে বিকালের পর খাবারের পসরা নিয়ে বসেন দোকানীরা। বাচ্চাদের খেলনাপাতিও পাওয়া যায়। দীঘির চারপাশের বাঁধানো রাস্তা ধরে হাঁটা যায়। বেশ একটা অলস সময় কাটানো আর কি।

দীঘির পাড়ে বাঁধাইয়ের কাজ চলছে। ছবি: মোস্তাক হোসেন

উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় শালবনও এই আলতাদীঘিতে। আমরা গিয়েছিলাম শীতের সময়, যখন রুক্ষ প্রকৃতি ছাড়া আর কিছু দেখার নেই৷ শালগাছের ধুলোপড়া মলিন রূপটাই শুধু দেখা হলো। শালবনের বুক চিরে যে রাস্তাটা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গিয়েছে, বাজি ধরে বলা যায়, সেই পথে বেশিদূর এগোতে পারবে না কেউ। এতোটাই নীরব আর ঘন জঙ্গল দুইপাশে। 

শালবনে উইপোকার ঢিবি। ছবি: লেখক

জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকেই হঠাৎ চোখে পড়বে শালগাছের গায়ে জড়ানো বিশাল আকৃতির উইপোকার ঢিবিগুলো। প্রথমে দেখে মনে হয়, বালু দিয়ে বানানো ঝুরঝুরে কাঠামো, টোকা দিলেই বুঝি ভেঙে যাবে। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যাবে কি মজবুত বুনন এগুলোর! হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিলে হয়তোবা ভাঙতে পারে। বৃষ্টি হলে নরম হয়ে যায় বাসাগুলো। রাস্তার ধারেও ছোট ছোট অনেকগুলো ঢিবি দেখা যায়। মুশতাক লম্বা মানুষ। ওকে বললাম, যেয়ে দাঁড়াও তো দেখি কতো বড়। দেখা গেল, ওর চেয়েও প্রায় এক/দুই হাত বড় ঢিবিগুলো। 

দুই মানুষ সমান উচ্চতা একেকটা ঢিবির। ছবি: মোস্তাক হোসেন

সন্ধ্যা হয় হয় ভাব। উত্তরবঙ্গের ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে একটু কাঁটা দিয়ে যাচ্ছে। কিংবা হয়তো শালবনের গা ছমছমে অনুভূতিটাই দায়ী! 

জগদ্দল মহাবিহার এবং আলতাদীঘি দেখতে হলে ঢাকা থেকে আপনাকে যেতে হবে নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলায়। ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে প্রতিদিন ধামইরহাটের উদ্দেশ্যে বাস ছাড়ে। ধামইরহাট থেকে ভ্যানযোগে যাওয়া যায় জগদ্দল মহাবিহারে এবং আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানে। থাকতে হবে নওগাঁ শহরে। ধামইরহাটে কোনও আবাসিক হোটেল নেই।

 

নওগাঁর ‘পতিসর কাছারি বাড়ি’ নিয়ে লেখা পড়তে ক্লিক করুন:
বিউটিফুল বাংলাদেশ: নওগাঁ – পতিসর কাছারি বাড়ি

নওগাঁর ‘কুসুম্বা মসজিদ’ নিয়ে লেখা পড়তে ক্লিক করুন:
বিউটিফুল বাংলাদেশ: নওগাঁ – কুসুম্বা মসজিদ

আমার পূর্বের ভ্রমণ কাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন নিচের লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন। দেশের সৌন্দর্য রক্ষায় সচেতন হোন।

ফিচার ছবি: মোস্তাক হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top