fbpx

৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঘা মসজিদ

বাংলাদেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন এবং কম কার্বন নির্গমনকারী সবুজ শহর হিসেবে রাজশাহীর খ্যাতি দেশ-বিদেশ ছাড়িয়ে গেছে। রাজশাহী অঞ্চলে ঘোরাঘুরির জন্য আকর্ষনীয় যে জায়গাগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বাঘা মসজিদ। প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করে কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে সুলতানী আমলের এই ইবাদাতখানা।
কর্মব্যস্ততার মাঝে ঢাকা থেকে একদিনের জন্য গিয়ে রাজশাহীর অন্যান্য আকর্ষণীয় জায়গা সহ এই প্রাচীন মসজিদ প্রাঙ্গণটি ঘুরে আসতে পারেন।

মসজিদের প্রবেশদ্বার। ছবি: লেখক

রাজশাহী জেলা সদর হতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। সুলতান নাসিরউদ্দিন নসরাত শাহ ১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নসরাত শাহ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই মসজিদের সংস্কার করা হয় এবং মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙ্গে গেলে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদে নতুন করে ছাদ দেয়া হয় ১৮৯৭ সালে।

মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিয়ো ভাই। ছবি: লেখক

মসজিদটি ২৫৬ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত। সমভুমি থেকে থেকে ৮-১০ ফুট উঁচু করে মসজিদের আঙিনা তৈরি করা হয়েছে। উত্তর পাশের ফটকের ওপরের স্তম্ভ ও কারুকাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। মসজিদটিতে ১০টি গম্বুজ আছে । আর ভেতরে রয়েছে ৬টি স্তম্ভ। মসজিদটিতে ৪টি মেহরাব রয়েছে যা অত্যন্ত কারুকার্য খচিত।

দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। দেয়াল চওড়া ৮ ফুট গম্বুজের ব্যাস ৪২ ফুট, উচ্চতা ১২ ফুট। চৌচালা গম্বুজের ব্যাস ২০ ফুট উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। মাঝখানের দরজার ওপর ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে। মসজিদটির গাঁথুনি চুন-সুরকি দিয়ে। ভেতরে এবং বাইরের দেয়ালে মেহরাব ও স্তম্ভ রয়েছে।

কারুকার্যময় সুউচ্চ মিনার। ছবি: লেখক

বাঘা মসজিদের দৈর্ঘ্য ২২.৯২ মিটার, প্রস্থ ১২.১৮ মিটার এবং উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর দেয়াল ২.২২ মিটার পুরু। মসজিদটিতে সর্বমোট ১০টি গম্বুজ, ৪টি মিনার (যার শীর্ষদেশ গম্বুজাকৃতির) এবং ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এই মসজিদটি চারদিক হতে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং প্রাচীরের দু’দিকে দু’টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদের ভিতরে-বাইরে সবর্ত্রই টেরাকোটার নকশা বর্তমান। মসজিদের পাশে অবস্থিত বিশাল দিঘীও একটি দর্শনীয় স্থান। এছাড়া বাঘা মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি মাজার শরীফ।মাজার শরীফে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন।

বাঘা মসজিদটির গাঁথুনি চুন এবং সুরকি দিয়ে। মসজিদের ভেতরে এবং বাইরের দেয়ালে সুন্দর মেহরাব ও স্তম্ভ রয়েছে। এছাড়া আছে পোড়ামাটির অসংখ্য কারুকাজ যার ভেতরে রয়েছে আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতাসহ ফার্সি খোদাই শিল্পে ব্যবহৃত হাজার রকম কারুকাজ। এছাড়া মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর পাশেই রয়েছে হজরত শাহদৌলা ও তার পাঁচ সঙ্গীর মাজার। বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহর পুত্র নাসিরউদ্দীন নসরত শাহ জনকল্যাণার্থে মসজিদের সামনেই একটি দিঘী খনন করেন। শাহী মসজিদ সংলগ্ন এ দিঘিটি ৫২ বিঘা জমির ওপর রয়েছে। এই দিঘির চারপাশে রয়েছে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ। প্রতিবছর শীতের সময় এ দিঘিতে অসংখ্য অতিথি পাখির কলতানে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।

দেয়ালে দেয়ালে চোখে পড়ে কারুকার্য। ছবি: লেখক

বর্তমানে দিঘিটির চারটি বাঁধানো পাড় নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এ মসজিদ সংলগ্ন জহর খাকী পীরের মাজার রয়েছে। মূল মাজারের উত্তর পাশে রয়েছে তার কবর। এ ছাড়া মসজিদ সংলগ্ন মাটির নিচ থেকে মহল পুকুর আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৭ সালে মাজারের পশ্চিম পাশে খনন কাজের ফলে ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট আয়তনের একটি বাঁধানো মহল পুকুরের সন্ধান মেলেছে। এই পুকুরটি একটি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিন দিক থেকে বাঁধানো সিঁড়ির ভেতরে নেমে গেছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে প্রচুর পোড়ামাটির ফলক। মসজিদের ভেতরে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটু উঁচুতে নির্মিত একটি বিশেষ নামাজের কক্ষ আছে। এ মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে ৩ দিন পর্যন্ত ‘বাঘার মেলা’র আয়োজন করা হয়। এ মেলাটি ৫০০ বছরের ঐতিহ্য।

আনমনে বসে একাকী। ছবি: রাশেদ ভাই

যাতায়াত: ঢাকা থেকে রাজশাহী যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন মাধ্যম রয়েছে। আকাশ-রেল-সড়ক সব মাধ্যমেই রয়েছে যাতায়াতের চমৎকার ও আরামদায়ক ব্যাবস্থা।
আকাশপথে প্রতিদিন বিমান বাংলাদেশ, ইউএস বাংলা ও নভোএয়ারের একাধিক ফ্লাইট রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ প্রতিদিন ঢাকা থেকে ৬ টি ও রাজশাহী থেকে ৩ টি ফ্লাইট, ইউ এস বাংলা ও নভোএয়ার ঢাকা ও রাজশাহী দুইপাশ থেকেই একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করে। আকাশপথে ঢাকা-রাজশাহী ভ্রমণের জন্য ভারা গুনতে হবে ২৬৯৯ থেকে ৮০০০ টাকা পর্যন্ত।

দীঘির জলে ছায়া দেখি। ছবি: লেখক

বিমানের টিকেট ও ফ্লাইট সংক্রান্ত তথ্য জেনে নিতে পারে স্ব স্ব এয়ারলাইন্সের ওয়েবসাইট থেকে: Biman Bangladesh

Novo Air

US Bangla Airlines 

ভ্রমণের আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে রেলপথ অনেকের কাছেই প্রথম পছন্দ।প্রতিদিন ঢাকা-রাজশাহী ৪ টি আন্তঃনগর ট্রেন যাতায়াত করে। ধূমকেতু এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস, সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ও পদ্মা এক্সপ্রেস। এরমধ্যে সদ্য চালু হওয়া বনলতা এক্সপ্রেসে রয়েছে ননস্টপ সুবিধা। ঢাকার কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ছাড়ার পরে পথিমধ্যে আর কোথাও যাত্রা বিরতি নেই যার ফলে মাত্র ৪ ঘণ্টায় পৌঁছে যায় রাজশাহী। অনলাইনে ট্রেনের টিকেট নিতে পারেন Rail Sheba apps ও এই সাইট থেকে https://www.esheba.cnsbd.com/index

সড়কপথে যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন অপারেটর এর এসি/নন এসি বাস রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল থেকে  । ঢাকা থেকে হানিফ, শ্যামলী, দেশ ট্রাভেলস, ন্যাশনাল ট্রাভেলস সহ আরো বিভিন্ন কোম্পানি সার্ভিস দিচ্ছে আমের রাজ্য রাজশাহীতে। ঢাকা – রাজশাহী নন এসি চেয়ারকোচের ভারা ৪০০ টাকা। এসি ইকোনমি ৮০০ টাকা ও বিজনেস ক্লাস ১২০০ টাকা।

মুগ্ধ হয়ে দেখি তোমায়। ছবি: লেখক

দেশের যেকোনো জায়গা থেকে রাজশাহী পৌঁছে স্টেশনের সামনে থেকে বাঘা যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। ভারা প্রতিজন ৬০-৭০ টাকা। বাস থেকে নেমে ভ্যানে করে যেতে হবে মসজিদ প্রাঙ্গনে, ভারা ১০ টাকা। 

রাজশাহী শহরে খাবারের জন্য বেশ কিছু হোটেল আছে যেখানে স্বল্পমূল্যে তৃপ্তি সহকারে খাওয়া যায়। পদ্মা নদীর পাড় ঘেষে অবস্থিত এই শহরে মাছের সহজ লভ্যতার ফলে দাম ও থাকে নাগালের মধ্যে।   সাহেব বাজার মোড়ে বিদ্যুৎ হোটেলে ৮০ টাকায় প্রায় ১০ ইঞ্চি সাইজের আইর মাছের স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে। এছাড়া সিটি ফুড, রূপচাঁদা, অপরূপা হোটেলের খাবারে তৃপ্তির ঢেকুর তুলবে যে কেউ।

 রাজশাহী অনকে পরিচ্ছন্ন শহর, এই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার দায়িত্ব ও আমাদের। তাই ভ্রমণকালীন সময়ে ময়লা আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন।

ফিচার ছবি: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top