গ্রীন লাইনের স্লিপার কোচে কক্সবাজার

ঢাকা থেকে কক্সবাজার বেশ ভালো কয়েকটি এসি বাস যায়। আমি সাধারণত বাসে কোথাও যেতে হলে ফেইসবুকের Buses & Coaches (সংক্ষেপে বিঅ্যান্ডসি) গ্রুপটাতে খোঁজ নিয়ে দেখি। দুটো কারণে তাদের জিজ্ঞাসা করি যার মধ্যে একটা হচ্ছে বর্তমানে কোন বাসটা সবচেয়ে ভালো সেটা জানা যায়, আর তারা সাধারণত নিরপেক্ষ রিভিউ দেয়।

আমার ছেলের বয়স আড়াই বছর। শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেয়ায় বিমানের ভাড়া দেখে কক্সবাজার যাওয়া ইচ্ছাই চলে গেলে। তিনজনের টিকেট আসা-যাওয়া পড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এসময় বাসের কথা মনে পড়লো। কক্সবাজারের মৌসুম এখনো শুরু হয়নি, তাই সবগুলো বাস চলাচল করছেনা। গ্রীনলাইনের অনলাইনে টিকেট কাটতে যেয়ে দেখি স্লিপারের কোন টিকেট নেই।

বিঅ্যান্ডসির কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম বাচ্চা নিয়ে আমার জন্য গ্রীনলাইনের স্লিপারই সবচেয়ে ভালো হবে। এখন দুটো কোম্পানী স্লিপার চালায়, তারা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ও গ্রীনলাইন। দুটোর মধ্যে গ্রীনলাইনই ভালো হবে। ভাড়া অবশ্য একেবারে কমনা, ২,৫০০ টাকা করে। সুইডিশ স্ক্যানিয়া কোম্পানির গাড়ি এ ডাবল ডেকারগুলো, দেখতেও বেশ সুন্দর।

রাজারবাগের গ্রীনলাইন কাউন্টার। ছবি: লেখক

অনলাইনে টিকেট না পেয়ে ফোন দিলাম গ্রীনলাইনের কল সেন্টারে। সংযোগ পেতে চার মিনিট ধৈর্য ধরতে হলো। অবশ্য সংযোগ পাওয়ার সাথে সাথে কাজ হলো, পরের দিনের গাড়িতেই একেবারে সামনের দুই সিট পাওয়া গেলো, এ২ ও এ৩। আমার নামে বুক দিয়ে রাখতে বললাম, অপারেটর বুকিং নিশ্চিত করে বলে দিলো রাত ১০ টার আগে যাতে টিকেটটা কিনে আনি।

দেরি না করে টিকেট কেটে নিয়ে আসলাম। মোহাম্মদপুর থেকে রাজারবাগ বেশ দূরেই। আবার এ গাড়ি ছেড়ে যায় রাত সাড়ে নটায়, তাই রাজারবাগ যাওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। যাত্রার দুঘণ্টা আগেই বাসা থেকে উবার ডেকে রাজারবাগ রওনা দিলাম। মোটামুটি ফাঁকা পেয়ে রাত পৌনে নয়টায় রাজারবাগ গ্রীন লাইনের কাউন্টারে পৌঁছাতে পারলাম। বেশ বড়সড় কাউন্টার, না হলেও ২০০/৩০০ যাত্রী সহজেই বসতে পারবে।

বাসের ভেতরটা এরকম। ছবি: লেখক

বাথরুমও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কাউন্টারে বসে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা, আমাদের গাড়ি বের করে গেইটের সামনে আনা হলো। আমার ছেলে গাড়ি দেখেই দৌড়ে আসলো, নানো নানো বলে। অজ্ঞাত কারণে সে বাসকে নানো বলে। গাড়ি প্রস্তুত হওয়ার আগেই সে চিৎকার জুড়ে দিলো বাসে উঠবে। গাড়ির গাইড তখন দরজা খুলে দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য উঠতে দিলো, নামাতে গেলেই কাঁদে। অনেক কষ্টে তাকে কিছুক্ষণের জন্য নামালাম।

একেবারে সামনের সিট নিয়ে একটু চিন্তুা ছিলো, দেখা গেলো, নিচতলার একেবারে সামনের দুটো সিটই পুরো বাসের সবচেয়ে ভালো সিট। স্লিপার সিট হবার কারণে এ২ ও এ৩ কে সি২-৩ এর সাথে তুলনা চলে। ধরে নিন আপনি সি২-৩তেই বসেছেন আপনার পা সোজা করে আনতে পেরেছেন এ২-৩ পর্যন্ত। আর নিচতলায় ঝাকিও কম লাগে, যদিও আমি একা থাকলে উপরের ডেকের একেবারে সামনের সিট নিতাম।

সিংগেল সিটটা এরকম। ছবি: লেখক

সিটগুলো বেশ চমৎকার, আধশোয়া হয়ে থাকার মতো। পর্যাপ্ত লেগ স্পেস আছে, পা ছড়িয়ে রাখা যায়। সমস্যা একটাই, ব্যাগ ঢুকিয়ে রাখার জন্য যে জায়গাটা রাখা আছে পায়ের কাছে সেখানে ব্যাগ না দিয়ে রাখলে ব্রেক করলেই আপনি ওটার ভিতরে ঢুকে যাবেন। আমার উচ্চতা ৬ ফুট, আমারও একই সমস্যা হয়েছে, পরে কাধের ব্যগটা সেখানে রেখে দিয়ে পা আটকানোর ব্যবস্থা করেছি।

কম্বল দেয়াই ছিলো, গাড়িতে উঠেই আমার ছেলে সিটের উপর স্লাইড করা শুরু করলো। যথা সময়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে ধীরলয়ে মতিঝিল এসে পৌঁছালো। বাকি যাত্রীরা এখান থেকে উঠার পর আমাদের বাস কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দিলো। বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই ছেলে সুন্দর করে ঘুমানো শুরু করলো, আমরাও একটু হাফ ছেড়ে বাছলাম।

বাসে উঠেই স্লাইডিং শুরু করে দিলো। ছবি: লেখক

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে রীতিমতো উড়ে চললো ডাবল ডেকার বাস। মসৃণ গতি, কিন্তু বাকি সব গাড়ির আগেই যেতে থাকলো। রাত সাড়ে ১১ টার নাগাদ ‘বিরতি’ নামক হোটেলে আমরা যাত্রা বিরতি দিলাম। বাস থেকে নেমে আমরা খিচুড়ি খেয়ে নিলাম। ছেলে এর মধ্যে ঘুম থেকে জেগে গেছে। তাকে খাইয়ে, বাথরুম করিয়ে আবার আমরা গাড়িতে উঠলাম। হিসেব করে দেখলাম এরকম গতিতে চললে ভোর ৬টায় কক্সবাজার পৌঁছে যেতে পারি, বাসে উঠে শুনলাম ঘটনা সত্যি, ইদানিং এ সময়ে পৌঁছাচ্ছে বাস।

বিরতির পর গাড়ির গতি যেন আরো বেড়ে গেলো, আর তাতে আমরা সুন্দর করে ঘুমিয়ে পড়তে পারলাম। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের মসৃণ রাস্তায় আমি চট্টগ্রাম আসার আগে টেরই পেলামনা কোথায় আছি। রাত সাড়ে তিনটার সময় চট্টগ্রাম থামলো গাড়ি, ১০ মিনিটের বিরতি দিয়ে আবার চলতে শুরু করলো। এবার রাস্তা অনেক খারাপ, তা সত্ত্বেও আমাদের তেমন কোন সমস্যা হচ্ছিলনা, শুধু ব্রেক করলে পায়ের কাছের বর্ধিতাংশে ঢুকে যাওয়া ছাড়া। এসি একটু কম লাগছিলো, সেটা গাইডকে বলতেই বাড়িয়ে দিলো।

বিরতিতে দেখা পাওয়া আরও কয়েকটা ডাবল ডেকার। ছবি: লেখক

তুমুল বৃষ্টির মধ্য দিয়ে কক্সবাজারে আমাদের গাড়ি যখন পৌঁছালে তখন সকাল ৬ টা বাজে, মাত্র আলো ফুটেছে। গাড়ি কলাতলী রোড ধরে হানিমুন রিসোর্টের সামনে এসে দাঁড়ালো। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে সবকিছু ঘুছিয়ে নামলাম আমরা। বৃষ্টির সময় এ জায়গায় নামাটা একটু সমস্যাই বটে, তবুও টার্মিনালে নামার চেয়ে ভালো। কারণ কক্সবাজার বাস টার্মিনাল বেশ দূরে।

তবে হানিমুন রিসোর্টের লোকজন আমাদেরকে তাদের সোফায় বসতে বললো, আর এর মধ্যে আমি অটো ঠিক করে নিয়ে এসে নিজেদের হোটেলে চলে যেতে পেরেছি। আমার হোটেল সুগন্ধা বিচেই ছিলো, হানিমুন রিসোর্ট থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বে। কোন চিন্তা না করেই তাই আসার টিকেট কেটে রেখেছিলাম একই বাসের একই সিটে। সে বাসটি রাত সাড়ে আটটায় ছেড়ে সকাল ৬ টায় আমাদের রাজারবাগ নামিয়ে দেয়।

বাস সংক্রান্ত কোন কিছু জানতে চাইলে বিঅ্যান্ডসি গ্রুপটিতে যোগ দিতে পারেন। গ্রুপের লিংক: https://www.facebook.com/groups/coachservive/

আর গ্রীনলাইনের বাসের টিকেট অনলাইনে কাটতে চাইলে এই লিংক থেকে কাটতে পারবেন: http://busbd.com.bd/

এছাড়া গ্রীনলাইনের ওয়েবসাইটে তাদের বাস সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য পাবেন। সাইটের লিংক: http://www.greenlinebd.com/

তাদের ফেইসবুক পেইজের লিংক: https://www.facebook.com/greenlineparibahanbd/

তাদের কল সেন্টারের নাম্বার: 09613316557 । আমি এই নাম্বারেই ফোন দিয়ে বুকিং দিয়েছিলাম।

একটা জিনিস কিন্তু মনে রাখবেন, গ্রীনলাইন কিন্তু সব রাউটে তাদের নতুন গাড়ি দেয়নি। তাই যাওয়ার আগে জেনে নিবেন সে রাউটে কি বাস দেয়া আছে। আমার মতে এখন কলকাতা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের জন্য তাদের বাস সার্ভিস বেশ ভালো। অপরদিকে খুলনা ও বরিশালে আগের বাসগুলো চলে যেগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালোনা।

ফিচার ছবি কৃতজ্ঞতা: সৈয়দ তাহমিদ অন্তু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top