ভবঘুরে ভ্রমণ: চাঁদনী রাতে চাঁদপুর

সকাল থেকেই বাসায় কেমন যেনো দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। কেমন যেনো একটা বন্দী অবস্থার মধ্যে আছি আমি এরকম মনে হচ্ছিলো। বাইরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি আর ভিতরে আমার উদাস মন। রিমোটের বোতাম চেপে চেপে টেলিভিশনের চ্যানেল একটার পর একটা বদলে যাচ্ছি কিন্তু উতলা মনে শান্তি আসছেনা। হাতে নিলাম প্রিয় বই, তবুও যেনো শান্তি নেই। মনে হচ্ছে কতোদিন যাবৎ বন্দী হয়ে আছি, এই ইটকাঠের খাঁচায়। অনেক দিন হলো আকাশ দেখিনা, পাখির কিচিরমিচির শুনিনা, নদীর কলকল করে বয়ে যাওয়া জলের ধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনা অনন্তকাল ধরে। মনের অসংখ্য আহাজারি ঘিরে ধরছে আমায়। কি করি কোথায় যাই এরকম ভেবে ভেবে মরছিলাম, তবে কোথাই যেতে হবে এতোটুকু ঠিক বুঝে গিয়েছিলাম। কোথায় যাবো সেট ঠিক করতে করতে কিছুটা সময় লাগলো।  

স্টিমারের ব্যাতিক্রমী মাস্টার ব্রিজ। ছবি: লেখক

পরেরদিন সকালে আবার ঢাকায় একটা জরুরি কাজ আছে তার মানে কয়েক দিনের জন্য দূরে কোথাও হারিয়ে  যাওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। দুপুরের খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে গেলাম বাসা থেকে ব্যাগে করে শুধু হ্যামক আর দুইটা প্রিয় ভ্রমণ বিষয়ক বই নিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেট গিয়েও ঠিক করতে পারলাম না কোথায় যাবো? 

কমলাপুর না সদরঘাট?!?! 

আগের রাতে আকাশে বিশাল থালার মতো চাঁদ দেখেছিলাম, দেখেছিলাম বললে ভুল হবে বারান্দা থেকে চাঁদ দেখা যায়না আটকে যায় উঁচু দালানের মাথায় তাই অন্তর্জালে ছবি দেখে মানসপটে কল্পনা করেছিলাম চাঁদের ছবি। শেষ পর্যন্ত ওই প্রকাণ্ড থালার মতো রূপালি চাঁদ দেখার লোভে বেড়িয়ে পরলাম পথে। তবে এই পথ কোথায় নিয়ে যাবে সেটা আজ পথিকের জানা নেই। কোন মেইল ট্রেনের জানালার পাশে বসে চাঁদটাকে সাথে নিয়ে চলে যেতে পারে হাওর বাওরের মাঝখান দিয়ে জলে ভাসা ট্রেনের কোন এক অচেনা অজানা স্টেশনে অথবা ভরা বর্ষায় নদীর দুকূল বেয়ে উপচে পর জলে চাঁদের আলোর চিকচিক করা সৌন্দর্যের পথে। 

স্টিমারের ছাদে জমে উঠে স্মৃতিচারণ। ছবি: আখতারুজ্জামান

শেষ পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে পূর্নিমার আলোর উদ্ভাসিত আনন্দে ভেসে ভেসে জলের কলকাকলীতে নির্জন রাত কাটানোর জন্য চলে গেলাম সদরঘাটে। রাজধানী ঢাকার নিত্যসঙ্গী জ্যাম আর হাজারো কোলাহলের মধ্য দিয়েই পারি দিলাম। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো ৬:৩০ এ লালকুঠি ঘাটে গিয়ে দেখলাম ব্রিটিশ আমলের তৈরি শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কমলা রকেট লেপচা দাঁড়িয়ে আছে ছেড়ে যাবে যাবে ভাব নিয়ে, হাজারো আলোর বিচ্ছুরণ ঘটানো চাকচিক্যময় বিভিন্ন লঞ্চের থেকেও আমার কাছে অধিক আকর্ষণীয় এই কমলা রকেট। এর প্রতিটা যন্ত্র, ইঞ্জিন, ইঞ্জিনের শব্দ, কেবিন, সেলুন, সবকিছুতেই একটা ইতিহাসের ছোয়া। এই কমলা রকেট একটা চলন্ত জাদুঘর। কতো সহস্র মানুষের হাজারো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এর সাথে। ইতিহাস ঐতিহ্য যারা পছন্দ করেন তাদের কাছে এখনো অন্য রকম এক অনুভূতি এই রকেট সার্ভিস। চাঁদপুর পর্যন্ত টিকেট নিয়ে উঠে গেলাম স্টিমারে সাথে সাথেই মোবাইলটা সাইলেন্ট মুডে দিয়ে দিলাম।

স্মৃতিতে উজ্জ্বল কমলা রকেট। ছবি: আখতারুজ্জামান

উঠেই চলে গেলাম ছাদে, মাস্টার ব্রিজটা অন্য সব লঞ্চ বা জাহাজের থেকে আলাদা, তিনতলায় ছোট্ট একটা রুমে মাস্টার ব্রিজ যা হালের লঞ্চ বা জাহাজে নেই। মাস্টার ব্রিজ থেকে স্টিমারের সম্মুখভাগ পর্যন্ত লম্বা করিডোরের মতো জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় নদীর অকৃত্রিম সৌন্দর্য, ভেসে যাওয়া চাঁদের উছলে পরা আলোতে। এই রকেট সার্ভিস চালু হয়েছিলো সেই ব্রিটিশ আমলে এখনো টিকে আছে অনেক প্রতিকুলতাকে সংগে করে, কতোদিন চলতে পারে সেটাই এখন ভাবনার বিষয়।  

মধ্যরাতে চাঁদপুর ঘাটে মধুমতি। ছবি: আখতারুজ্জামান

সন্ধার আকাশটা বেশ মুগ্ধতায় মাখানো, কেমন একটা অদ্ভুদ নীলে ছেয়ে আছে সারা আকাশ। দেখেই মনট ভালো হয়ে গেলো। তাকিয়ে তাকিয়ে আকাশটাকে দেখতে লাগলাম, এই দেখার যেনো শেষ নেই, শত সহস্র বছর তাকিয়ে থেকেও শেষ হবেনা দেখা। চারিদিকে লঞ্চের ভেপুর শব্দ, একটার পর একটা লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, হাজারো মানু্ষের দৌড়াদৌড়ি, হকারের হাকডাক কোন কিছুই যেনো আকাশের নীলকে ছুতে পারছেনা। 

প্রকান্ড থালার মতো চাঁদটা। ছবি: আখতারুজ্জামান

আমি বসে আছি নিশ্চুপ, এরকম একা একা ভ্রমণে অনেক সময় নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়, নিজেকে ভালোমতো সময় দেওয়া যায়, অনেক সময় নিজেকে খুঁজে পেতেও সাহায্য করে এরকম ভ্রমণ। তাইতো প্রায়ই করে থাকি এই কাজটা।

মধুমতিতে হ্যামকে ঝুলাঝুলি। ছবি: লেখক

ভেপু বাজিয়ে জাহাজ ছেড়ে দিলো হাল্কা বাতাসটা ক্রমেই জোড়ে লাগছিলো গায়ে, ওদিকে আকাশে চাঁদটা ক্রমেই দৃশ্যমান হওয়া শুরু করলো, আস্তে আস্তে প্রকাণ্ড একটা থালার মতো আকার নিলো। জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে সাথে সাথে চাঁদটাও সংগী… কে বললো আমি একা যাচ্ছি ? এইতো চাঁদ মামাও আজ যাচ্ছে আমার সাথে…

গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে চলা। ছবি: আখতারুজ্জামান

চতুর্দিক থেকে চাঁদের উজ্জ্বল রূপালি আলো আর ফুরফুরে খোলা হাওয়া গায়ে লাগছে, এরকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সময়। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে চাঁদ নিয়ে পড়া বিভিন্ন কবিতার লাইনগুলো…

চাঁদ আর আমি

আবু নাছের জুয়েল

আজ বহুদিন পর হঠাৎ আবার,
খোলা আকাশ, খালি বাড়ির ছাদ
আরও আছে দূর আকাশেৱ ,
আমার সব সময়ের সাথী ওই চাঁদ৷

বহু দিন পর আজ আবার দেখছি ওই চাঁদ,
যেমনি ছিল আজো আছে ঠিক তেমনি৷

আমার ছোট বেলায় মায়ের ঘুম পড়ানি
আয় আয় চাঁদ মামা কিংবা,
কোন গল্পে যেখানে,
সুতা কাটে চাঁদের ওই বুড়ি৷

একে একে আজ ছেড়ে গেল সবাই
মা, বাবা, কাজলা দিদি ,আর ভাই৷

আজো আছি আমি আর ওই চাঁদ,
হারিয়েছি আপন অনেক,
হয়েছে আপন অনেকে,
নতুনের ভিড়ে পুরাতন আমি,
আছি শুধু যাবার আপেক্ষায়৷

বহু দিন পর একলা এ রাতে,
চাঁদটাকে দেখে শুধু হিংসে হয়,
চলে গেলো মোর কত আপন জনা,
হারিয়েছি কত বন্ধন,
বহুদিন আগে ছিল যেমন চাঁদ,
আছে যেন আজো ঠিক তেমনি৷

রূপ আর যৌবনে কমেনি তো তার,
বেড়ছে বরং বেশি,
হারাবে না চাঁদ তুমি কখনো,
হারিয়ে যাব এই আমি৷

এরকম ভাবতে ভাবতেই জাহাজ চলে আসলো মেঘনা নদীতে, এরকম ভরা বর্ষায় এতো শান্ত নদী দেখবো ভাবিনি। চাঁদের রূপালি আলো নদীর জলে এক অদ্ভুদ সুন্দর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে যা না দেখলে বোঝার সাধ্য নেই।  এক ঘোর লাগা চাঁদের মায়ায় জলে ভেসে কেটে গেলো সময়।

ঘাট ছেড়ে চলে যায় কমলা রকেট। ছবি: আখতারুজ্জামান

অবশেষে জাহাজ চলে আসলো চাঁদপুর ঘাটে, নেমে গেলাম। এখানে জাহাজে উঠার জন্য অসংখ্য মানুষের ভিড়। মূলত চট্টগ্রাম থেকে বরিশাল যাওয়ার এটা সহজ একটা মাধ্যম। চট্টগ্রাম থেকে সন্ধ্যায় ট্রেনে চাঁদপুর এসে রকেট স্টিমারে বরিশাল যাওয়া যায় কম সময়ের মধ্যেই। তারপর লঞ্চ ঘাটে গিয়ে ধোয়া উঠা গরম ভাত খেলাম করকরে ইলিশ ভাজা আর পোড়া মরিচ দিয়ে।

দিন রাত ভাজা হচ্ছে ইলিশ। ছবি: আখতারুজ্জামান

আবার ফিরতে হবে এইরাতেই, কোনভাবেই চাঁদের আলোর এই সৌন্দর্য মিস করা যাবেনা, মধুমতি জাহাজ রাত দুইটায় ঘাট দিবে চাঁদপুরে তখন উঠতে হবে।

ভোরের সদরঘাট। ছবি: লেখক

একসময় এমভি মধুমতি আসলো, উঠে হ্যামকটা ঝুলিয়ে দিলাম একদম সামনে গিয়ে। চাঁদ দেখি আর জাহাজ এগিয়ে যায়, একসময় কখন যেনো ঘুমিয়ে গেলাম ঘুম থেকে জাগলাম বৃষ্টির ফোটা গায়ে পরায়,  উঠে দেখি জাহাজ মুন্সিগঞ্জ চলে আসছে তারপর একসময় সদরঘাট তারপর বাদামতলি। এভাবেই শেষ হয়ে গেলো একটি বিক্ষিপ্ত ভ্রমণ সাথে করে নিয়ে আসলাম একরাশ ভালোলাগা অথবা নিজের জন্য কয়েকদিন ভালো থাকার জ্বালানি।

নিরবতা ভেঙে ছুটে চলা নিরন্তর। ছবি: লেখক

এই ভ্রমণে আমি কোন ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলিনি, আপনারাও ভ্রমণ কালে আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন।

ফিচার ছবিঃ আখতারুজ্জামান।

স্টিমার সার্ভিস নিয়ে বিস্তারিত জানার জন্য এই পোস্টটি দেখতে পারেন: https://www.vromonguru.com/all-divisions/dhaka-division/rocket-steamer-bangladesh/

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখতে চাইলে ভিজিট করুন এই লিঙ্কে https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top