in

মহেরা জমিদার বাড়িতে একদিন

জীবন মানে ছুটে চলার নাম। সেই চলার পথে মিলে যে বন্ধু, তাদের দিয়ে পার হই সিন্ধু। সেবার মার্চ মাসের বন্ধের কোপে ছটফট করতে থাকা মন একটু শান্তির পরসের আশায় ত্রাহি ত্রাহি করছিল। বিভিন্ন কারণে এই বড় বন্ধে যেতে পারলাম না লং ট্যুরে। তো ডে ট্রিপই সহি। সেবার আমাদের বিপ্লবী রাজিবদা বোধহয় একখানি ইভেন্টের গান শুনেয়েছিলেন। আজ দু বছর পর এসেও সেই গান যে গুঞ্জিত হয়। যেন কবি গুরুই শুনিয়ে গেলেন আজি হতে দুই বছর আগে, কে শুনিয়েছিলেন গানখানি, কৌতুহল ভরে, আজি হতে দুই বছর আগে।

তার সেই বিপ্লবী ইভেন্ট পড়ে বাস্তবায়িত না হইলে আমরা ভাই ব্রাদাররা মিলে আয়োজিত করলাম মহেড়া জমিদার বাড়ি ঘুরে আসার আয়োজন। সেই আয়োজনের গল্পের ছিটেফোঁটা নিয়ে এত ভূমিকা টানা। যাই হক সেদিন ছিল ২৬শে মার্চ। মহাখালি বাস স্ট্যান্ড থেকে টাঙ্গাইলের বাসে রওনা হলাম আমরা কিছু স্বপ্নশীল যুবক। তবে ৩০+ মানুষ কি যুবকের সংজ্ঞায় পড়ে সে নিয়ে হতে পারে বিতর্ক। তবে সব বিতর্ক কে পিছে ফেলে চলছে আমাদের বাস। আর ট্যুর পার্টনার অবশ্যই ভিউ ফাইন্ডার ঈসমাইল এবং খোঁচাখুঁচি স্পেশালিস্ট চান মিয়া।

রাণী মহল। ছবি: লেখক

আজ সরকারি ছুটি রাস্তাঘাট খালি হবে তাড়াতাড়ি গিয়ে জুম্মার নামাজ ধরবো, আনন্দে ঘুরবো সে কথা ভেবে ধরেছিলাম কোন উদাসি গান। ঈশ্বরের বোধ হয় সেটি সহ্য হল না। ঠেলে দিলেন আমাদের জ্যামের মহাকাব্যে। সেই মহাকাব্যিক জ্যামটাও একঘেয়েমি লাগলো না চান মিয়ার খুনসুটিতে। যা হক সকালে রওনা দিয়ে মহেরা জমিদার বাড়ির গেটের সামনে যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাটা টিক টিক করে জানান দিচ্ছে দুপুর দেড়টার কথা।

পেটে ছুছো দৌড়াচ্ছে। আগে ভজন এরপর ভ্রমণ। পেটে খেলে যে পিঠ সয়। মহেরা জমিদার বাড়ি প্রবেশ করার আগে ক্যান্টিন পরে সেখানে দেখলাম ট্রেনিংয়ের জন্য আসা নওজোয়ানরা বসে খোস গল্প করছে। করবে না কেন? সপ্তাহের এই একটি দিনেই তো পরিবারের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়। আহা কত কান্না হাসির আনন্দধারা বয়ে যাচ্ছে ক্যান্টিনে। তবে সেই আনন্দধারা আমাদের ছুয়ে গিয়ে বিষণ্নতার গল্প শোনাতে লাগলো। কারণ ক্যান্টিনে এখন দুপুরের খাবার আসে নেই আর এখানে আর কোন খাবার দোকান নেই। তবে আছে বৈকি সকালের খিচুড়ি। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। সেই খিচুড়ি ডিম দিয়ে সাটিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললাম। এবার ভিতরের ঢোকার পালা।

কালীচরণ লজ। ছবি: লেখক

৫০ টাকা টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম তিনজন। আহা ঢুকেই যেন অন্য ভুবনে প্রবেশ করলাম। জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে ‘বিশাখা সাগর’ নামে বিশাল এক দীঘি। ১ হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর  এই মহেরা জমিদার বাড়ির অবস্থান। বর্তমানে এইটা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভিতরে আছে বেশ কয়েকটি স্থাপনা এবং প্রতিটা স্থাপনায় আছে নজরকাড়া কারুকার্য। ১৮৯০ দশকের পূর্বে স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে জমিদারদের স্থাপনাগুলো ফুটিয়ে তোলার চেস্টা করা হয়েছে। ঢুকেই প্রথমে চোখে পড়লো রাণী মহল। হালকা গোলাপি কালারের বিল্ডিংখানা এতটা জাকজমকপূর্ণ নয়। এইটি মূলত অতিথি ভবনের উল্টোপাশে অবস্থিত। এই ভবন মূলত জমিদারদের স্ত্রীদের বিনোদনের জন্য গড়ে তোলা হয়। এ মহলের পাশেই তো রাণী পুকুর। জমিদারদের নির্মিত ঘাটের ভগ্নাংশ এখানে এখনও বিদ্যমান। চৌধুরি লজ, কালী চরণ লজের জমিদারদের নন্দনীগণ এখানেই স্নান করতে আসতেন।

এরপরে একে একে পড়ে চৌধুরি লজ, কালীচরণ লজের অবস্থান। চৌধুরি লজের দেয়ালটি অপূর্ব কারুকার্যময়। এর সামনে বিশাল সবুজ মাঠের এক কোণে শহীদ মিনার দেখা যায়, এইটা পরে সংযোজন করা হয়েছে বুঝা যাচ্ছে। রোমান ধাচের ছোয়ায় নির্মিত ভবনটির পূর্বের রং মিস্টি গোলাপি ছিল বুঝা যায়। দোতলা বিশিষ্ট সুন্দর নকশাখচিত এই ভবনের ভেতরে রয়েছে ঢেউ খেলানো ছাদ। তবে নতুন রং করার জন্য ঘষে উঠানো হয়েছে বুঝতে সমস্যা হয় নাই।

চৌধুরী লজ। ছবি: লেখক

জমিদারদের রাজত্বের শেষের দিকে নির্মিত কালীচরণ লজ অন্য স্থাপনা থেকে তার ভিন্নতা যেন পথিকের চোখে জ্বলজ্বল করে ধরা দিচ্ছে। ইংরেজি ইউ শেপের আদলে স্থাপত্যশৈলীর ভিন্নতা আনে ঐতিহ্যের লাবন্যতা। আশেপাশে ফুলের বাগান ও বিভিন্ন ধরনের গাছ ঐতিহ্যে কে দিয়েছে মনজুড়ানি আমেজ। এখন প্রায় মধ্য দুপুর, আর ভবনের ভেতর থেকে সুন্দর আলোর ঝলকানি জানান দেয় যেন সোনালী অতীতের রূপকথা।

এই দুইটি ভবন দেখে আমরা পিছে চলে গেলাম। এখানে এসে দেখা পেলাম বানর আর হরিণের। খাঁচায় বন্দি প্রাণী হায় মানুষকে জানায় ধিক্কার, আমরা যে বুঝেনি এদের বোবা চিৎকার। এদের আসহায় চোখে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। আমরা বড় দুই ভবনের দিকে পা বাড়ানো আগে পুরো কমপ্লেক্সটা ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আনন্দ লজ। ছবি: লেখক

ভবনের পিছনে রয়েছে পাসরা ও রাণী পুকুর। বিভিন্ন রঙের দেশী বিদেশী ফুলের গাছ যেন এই জমিদার বাড়ির শোভা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিভৃত পল্লীতে ছায়াঘেরা, পাখী ডাকা নির্মল নির্ঝর শান্ত পরিবেশ পথিকের মন ভুলানোর জন্য যে যথেষ্ট। আর এই কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পার্শ্বে রয়েছে বিশাল আম্রকানন। আমের মুকুল ফুটেছে সেই বসন্তে, এখন কাঁচা আমের গন্ধ ম ম করছে মহেরা। বিভিন্ন ধরনের খাঁচার পাখি জুড়ায় পথিকের আঁখি। কিন্তু ভাই তারা যে বন্দি কারাগারে। বিভিন্ন জায়গায় লিখা আছে হাদিস থেকে নেওয়া বাণী আর বিভিন্ন মনীষিদের বক্তব্য। আর বাচ্চাদের খেলার জন্য রয়েছে শিশু পার্ক। মোট কথা জায়গাটা পরিবার নিয়ে বেড়ানোর জন্য বেশ আদর্শ বা কোন শীতের সকালে দলবল নিয়ে পিকনিক করতে আসলে সময়টা মন্দ কাটবে না।

চান মিয়া আর ঈসমাইল ভাই দুজনের মনে যেন এক শিশু ভর করেছে।  গাছে গাছে সকাল সন্ধ্যা পাখির কলকাকলিতে মুখর, সৌম্য-শান্ত কোলাহলমুক্ত পরিবেশের মাঝে আজ ঘর বেধেছে দুই যুবক শিশু। কোন ইস্যুই তাদেরকে আটকাতে পারবে না। দোলনায় দোল খেয়ে, মেতেছে উঠানামার খেলায়। আসন গেড়ে জাকিয়া বসেছে দুজন দুপ্রান্তে। একবার চান উঠে তো একবার ঈসমেইল নামে, আবার ঈসমাইল উঠে তো চান নামে। এ খেলার ভুবনকে বিদায় দিয়ে আমরা এবার সামনে এল। এই তো দেখা যাচ্ছে পাশাপাশি মহারাজা ও আনন্দ লজ।

এ রকম বাণীতে ছিল ভরপুর। ছবি: লেখক

মহেরা জমিদারদের বাড়িগুলোর মধ্যে সব থেকে বেশি আকর্ষণীয় স্থাপনা হলো আনন্দ লজ। নীল সাদা মিশ্রনে ভরা স্থাপনাটির সামনে আছে আটটি সুদৃশ্য কলামের সারি। তিন তলা বিশিষ্ট ঝুলন্ত বারান্দা যেন এ ভবনকে শেকড় সন্ধানীর চোখে করেছে আরো দৃষ্টিনন্দন। এ লজের সামনে কৃত্রিম হরিণ, বাঘ ও পশু-পাখির ভাস্কর্য সমূহ শ্রী কিছুটা কমালেও চমৎকার বাগানটি যেন পুষিয়ে দিয়েছে।

বাইজেন্টাইন স্থাপত্য শৈলীর ছিটেফোঁটা যেন পড়েছে পাশের মহারাজা লজে। ভবনের সামনে আছে ছয়টি সুদৃশ্য কলামের সারি। হোয়াইট হাউসের মত সাদৃশ্য ধবধবে সাদা এই লজের সামনে রয়েছে সিঁড়ির বাঁকানো রেলিং ও ঝুলন্ত বারান্দা। ভবনটিতে মোট কক্ষ আছে বারো (১২) টি, সামনে বাগান ও পেছনে একটি টেনিসসহ কোর্ট রয়েছে। বর্তমানে ভবনটি শুটিং স্পট হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

আনন্দ ভুবনে দুই যুবক শিশু। ছবি: লেখক

দেখতে দেখতে প্রায় দিনের আলো ফুরিয়ে এল। তবে মহেরার জমিদারদের হৃদয়বিদারক গল্পটি শোনাবে বলে কি বেলা শেষে পাঠকদের ধরে রেখেছি। আহা মহেরা। মহেরার জমিদারগণ ছিলেন শাহা বংশের। বংশীয় মর্যাদায় ছিলেন বনেদী ব্যবসায়ী। সেই কলকাতা থেকে মহেরার এসেছিল বাণিজ্যের টানে। তাদের ছিল ডালের ব্যবসা। সেই মহেরার জমিদারি পত্তন হয় ১৮৯০ সালে বিন্দু সাহা, বুদ্দু সাহা, হরেন্দ্র সাহা ও কালীচরণ সাহা নামক চার ভাইয়ের হাত ধরে। আর এই শাহা বংশের পরবর্তী বংশধররা ‘রায় চৌধুরী পদবী’ লাভ করেন।

দেশের ভাগের বেদনাময় স্মৃতি নিয়ে এ বংশের দুজন সদস্য ছাড়া সবাই প্রস্থান করে এই মাতৃভূমি ছেড়ে সুদূর কলকাতায়। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হবার পর জমিদারদের দাপট ও কমে যায়। তবু তারা এই মাটির টানে পড়ে ছিলেন। ধীরে ধীরে চলে এল সেই ১৯৭১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছে মুক্তিকামী জনতা। আহা মহেরা তুমি কি অপেক্ষায় ছিলে এক নির্মম গণহত্যার সাক্ষী হতে।

চিন্তা মগ্ন লেখক। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

১৯৭১ সালের ১৪ই মে পাক হানাদার বাহিনীর কড়াল থাবা পড়ে এই জমিদার বাড়িতে। জমিদার বাড়ি হামলার সময় এ বাড়ির কূলবধূ যোগমায়া রায় চৌধুরীসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে নিয়ে যাওয়া হয় চৌধুরি লজের সেই মন্দিরে পিছনে। মৃত্যুর ঘণ্টা তো তখনই বেজেছিল। এক সারিতে দাঁড় করিয়ে তাদের নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। পতন হয় মহেড়ার শেষ বংশধরের। শেষ উত্তরসূরি যারা বেঁচে ছিল পাড়ি জমায় কলকাতায়।

এক সময় দেশ স্বাধীন হয় কিন্তু ফিরে আসে না আর মহেড়ার শেষ জমিদাররা। পরিত্যক্ত এই জমিদার বাড়ীটিকে ১৯৭২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মান্নান পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার স্কুল হিসাবে ঘোষিত করেন। ১৯৯০ সালে যা ‘পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই জমিদাররা অন্যান্য জমিদারদের মত অত্যাচারী ছিল না। করেছিল এলাকায় উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ। তবু মেনে নিতে হয় তাদের করুন পরিনীতি।

শেষ বিকালের বিদায় বেলায় তুমি রবে স্মৃতিতে। ছবি: লেখক

পুরান বাড়ি আপনার সাথে কথা বলবে যদি আপনি তার ভাষা বুঝেন। এর প্রতিটি ইট প্রতিটি দেয়াল জানাবে আপনাকে বেদনা বিধুর ইতিহাস। মহেড়া এখন পিকনিক স্পট, পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার। তবে আমার মত ইতিহাস খোঁজা মানুষের কাছে মহেড়া এক হাসি কান্না আর্তনাদের ইতিহাস। এবার যে ভাই যাবার পালা। বিদায় বেলায় বলতে হয় চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয় আবার ফিরে আসবো নতুন কোন শহরে নতুন বেশে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:

https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:

https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার সন্ধানে: তুক অ দামতুয়া

ভারতীয় ভিসা আবেদন করার নিয়ম ২০১৯