fbpx

নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়িতে একদিন: ভ্রমণ পর্ব

আরিচা ঘাট নেমে কনকনে একটা শীতের আমেজ পেলাম। সকাল প্রায় ১০টা বেজে গেছে। গগণজুড়ে দেখা যাচ্ছে সূর্যের হাতছানি। তার মিষ্টি রোদে কিছুটা যেন উম পেলাম। প্রকৃতি মা এভাবেই তো তার আদরে জড়িয়ে রাখে তাদের সন্তানদের। আর আমরা তো এই প্রকৃতিরই একটি অংশ। পদ্মার পাড়ের ছোট ছোট হোটেলগুলোতে মানুষের বেশ ভিড় লক্ষ্য করলাম। তাদের ডাকাডাকি হাকাহাকিতে মুখরিত এক কালের আরিচাঘাট। এক পাশে পাবনা নগরবাড়ি যাবার জন্য ট্রলারে লোক ডাকছে আর এক পাশে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী নিয়ে বসেছে ফেরিওয়ালা। আর আমি দু চোখকে শীতল করছি পদ্মার শান্ত রূপে। প্রমত্তা পদ্মা শীতে কি শান্ত অথচ এর অতল গহীনে তলিয়ে গেছে কত বাড়ি ঘর মানুষ। আমি পদ্মার পাড়ের ছেলে। সাধে কি বলে পদ্মা তুই রাক্ষুসী।

সেই নবরত্ন মন্দির। ছবি: লেখক

এখান থেকে খানিকটা হেঁটে লেগুনার দেখা পেলাম তেওতা তেওতা বলে হাক দিচ্ছে। চড়ে উঠলাম লেগুনায়। পদ্মার পাড় ঘেষে চলছে সে ধীরেকু চালে। না চলেই বা উপায় কি। একদিকে রূপের আধার তো অন্যদিকে সংকুচিত রাস্তার আতংকে রাক্ষুসী পদ্মায় পড়ে বিলিন হয়ে যাওয়ার ভয় তো আছেই। এ নদী যে মানব ভোগ নেয়। কিন্তু লেগুনা মামা বড় শেয়ানা, বান্দরবানের চান্দের গাড়ির চালকের মতই শক্ত হাতে লাগাম ধরেছে।

মন্দিরের ভিতর দেবীর মূর্তি। ছবি: লেখক

গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে কবে যে পথ ফুরালো সে তো হেল্পার মামা হায়দারি হাক না দিলে টেরই পেতাম। এই তো আমার সবুজ গ্রাম বাংলা সবুজের মাঝেই হারিয়ে গিয়েছিলাম। যেখানে নামিয়ে দিল লেগুনা সেখান থেকে হাঁটা দূরত্বেই তেওতা জমিদার বাড়ি। দূর থেকে দেখতে পেলাম জমিদার বাড়ির সেই শ্বেতশুভ্র মঠটি। সে যেন এক দুর্বার আকর্ষণ, যেন চুম্বকের মত টানছে পথিককে। তেওতা জমিদারদের তৈরি মঠটি আজও এই গ্রামের প্রধান আর্কষণ হিসাবে রয়ে গেছে। জমিদার বাড়িটি ধ্বংসের পথে হলেও তাদের শেষ স্মৃতি হিসাবে মঠটি রয়ে গেছে।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

সবুজ-শ্যামল গাছপালা ঢাকা এই তেওতা গ্রাম যে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে নজরুলের জন্য। আবার এ গ্রামের জমিদার শ্যামশংকর  রায়ের প্রতিষ্ঠিত নবরত্ন মঠটির কারণেও ইতিহাসের পাতায় লিখা থাকবে নাম। এই মঠকে ঘিরেই তো দোলপূজা আর দুর্গাপূজার রঙিন উৎসব পালিত হতো জমিদার কূলে। আজ দুকূলে কেউ নেই। খা খা করে পুরা জমিদার বাড়ি। আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি এক ঐতিহ্যের কংকালের সামনে। কালের পাতায় হারিয়ে গিয়েও যেন হারাতে না চায়। চুষে নিয়েছে কাল এর দেয়াল, পড়ে রয়েছে শুধু হাড়ের অস্থিমজ্জা।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

মন্দিরের পাশেই বিশাল পুকুর। সেখানে বসে তাকিয়ে আছি দূরের সেই তেওতা জমিদার বাড়ির দিকে। পুকুরে যেন কোন বিষণ্ন ছায়া পড়েছে আজ। ভেবেছিলাম নজরুলের স্মৃতি দেখে অভিভূত হব। হয়েছি হয়তো, সে না হয় অন্য ভাবে। এ রাজবাড়ির খুব কাছেই যমুনা নদী। যমুনা হাওয়ায় প্রাণ যে দোলে। পদ্মা-যমুনার মেলবন্ধন কি এই তেওতাকে দিয়েছে অন্যরূপ?

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

ধীরে ধীরে দু কদম বাড়ালাম জমিদার বাড়ির দিকে। জমিদার বাড়ির মূল ভবনে প্রবেশ করে দেবী মূর্তির সন্ধান পেলাম। দেবী লক্ষ্মীর মূর্তিই হবে বোধহয়। ভবনে জাকিয়ে বসেছে বৃক্ষদের দল। যেন জানান দিচ্ছে তোমার সময়ে যে ফুরিয়ে এসেছে। উত্তর দিকে ভবনগুলো হেমশংকর এস্টেট এবং দক্ষিণ দিকের ভবনগুলো জয়শংকর এস্টেট। আর সেই নাটমন্দিরখানা তো পিছেই ফেলে এসেছি। পুবদিকে লালদিঘী বাড়িটি জমিদারদের অন্দরমহল। সেই আন্দর মহলের সামনেই তো দুটি শান বাধানো ঘাট।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

দক্ষিণ পাশের ভবনের নিচে রয়েছে চোরা কুঠুরী, যাকে এলাকার মানুষ বলে অন্ধকূপ। আর এর মাঝেই ৪ তলা বিশিষ্ট ৭৫ ফুট উচ্চতার নবরত্ন মঠটি আছে উত্তরে পাহারায় দাঁড়িয়ে। দু হাত খুলে স্বাগত জানাবে যেন নতুন পথিকদের। আহা কি প্রশান্তি। যমুনার হাওয়ায় হাওয়ায় যেন ভেসে আসে কোন উদাসি গান।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

‘নীলাম্বরী শাড়ি পরি নীল যমুনায়
কে যায়, কে যায়, কে যায়?
যেন জলে চলে থল-কমলিনী
ভ্রমর নূপুর হয়ে বোলে পায় পায়॥

এই গ্রামের যমুনা নদীর পাড়ে বসেই তো লিখেছিলেন ‘নীলাম্বরী শাড়ি পরি নীল যমুনায়’ কবিতাখানি। সেই যমুনার রূপ না দেখলে তো পাপ হবে। বলিতে তো একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম নজরুল তাঁর ছোট হিটলার কবিতাতেও তেওতার এই গ্রামকে স্মরণে এনেছিলেম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়ের রাশিয়ার মাইলাই গ্রামের বিরাণভূমি হয়েছিল কামানের গোলার আঘাতে। আর তেওতা জমিদার বাড়ি বিরান হয়েছে কালের আঘাতে। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকা যায় না। এই জমিদার বাড়ির পশ্চিমে এক দুই কিলো গেলেই পাওয়া যাবে জল যমুনার চর।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

চলিতে নাহি চাই, চলিয়া যে যেতে হয়। তাই বিদায় বেলায় একটি নজরুল গীতি না হলেই যে নয়। আবার দেখা হবে বাংলার পথে নতুন করে পথিকের দ্বারে।

তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ?
চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিণী বলে না তো কিছু চাঁদ।।
     চেয়ে’ চেয়ে’ দেখি ফোটে যবে ফুল
     ফুল বলে না তো সে আমার ভুল
মেঘ হেরি’ ঝুরে’ চাতকিনী, মেঘ করে না তো প্রতিবাদ।।
জানে সূর্যেরে পাবে না তবু অবুঝ সূর্যমুখী
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখে তার দেবতারে দেখিয়াই সে যে সুখী।
     হেরিতে তোমার রূপ–মনোহর
     পেয়েছি এ আঁখি, ওগো সুন্দর।
মিটিতে দাও হে প্রিয়তম মোর নয়নের সেই সাধ।।

 
আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।
Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/
শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top