fbpx

নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়িতে একদিন: ইতিহাস পর্ব

সময় তো বয়ে যায় সময়ের স্রোতে৷ তবে কিছু স্মৃতি রয়ে যায়৷ সময় তখন ২০১৬ সাল৷ আমার বড় সাধ হল পরিব্রাজক হব। হাঁটবো বাংলার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত৷ বই পড়া, সে তো রক্তে মিশে ছিল। কোথায় যাওয়া যায় সে কথা চিন্তা করার সাথে সাথে মনে পড়লো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত মানিকগঞ্জের তেওতা জমিদার বাড়ির কথা। শুনেছিলাম আরিচা ঘাট থেকে খুব কাছেই। শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর কোল ঘেষে সবুজ-শ্যামল বৃক্ষের আচ্ছাদনে ঢাকা সেই তেওতা গ্রামেই তো কাজী’দার স্মৃতি হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সে ডাক উপেক্ষা করার ধৃষ্টতা কি ভাবে দেখাতে পারি।

কোন এক কাক ডাক ভোরে বের হলাম ঘর ছেড়ে হলাম আরিচা ঘাটের পথে। শীতের সকাল, চারদিকে কুয়াশা জাকিয়ে বসেছে। শহরে কি হায় শীতের সকালের বৈচিত্র্য উপভোগ করা যায়। সকালের প্রথম বিআরটিসি বাসেই উঠে পড়লাম আরিচাঘাট যাবার উদ্দ্যেশে। পথে যেতে যেতেই না হয় রোমন্থন করি তেওতাকে ঘিরে কাজী নজরুলের ইসলামের গল্প।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

তেওতা জমিদার বাড়ির বয়স সে তো তিনশত বছর ছাড়িয়েছে কবে। সপ্তদশ শতকের শুরুতে পঞ্চানন চৌধুরি নামক এক জমিদার। জনশ্রুতি অনুসারে, পঞ্চানন চৌধুরি ছিল হতদরিদ্র এক কিশোর। তবে সে কিশোরের ভাগ্য খুলে যায় দিনাজপুর অঞ্চলে তামাক উৎপাদন করে। কর্ণকুহরে বেজেছিল কাঁচা পয়সার ঝনঝনানি। প্রচুর অর্থ-কড়ির মালিক হওয়ার পড় এই তেওতা গ্রামে নির্মাণ করেন প্রাসাদটি। মৃত্যুর পর তার ছেলে কালী শংকর এই জমিদারির মালিক হন।

কালী শংকর এ যেন এক রহস্যময় মানব। তার ব্যাপারে তেমন কিছু না জানা যায়নি। তার ঔরসজাত দুই পুত্র জয় শংকর ও তারিনী শংকরকে (জন্ম, ১৮০০-১৮১০ দশকে) রেখে তিনি মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ধরণির মায়া ত্যাগ করেন। এ বাড়ির ইতিহাসের কথা বলতে গেলে পাতার পর পাতা ভরে যাবে সে পথে না হয় না গেলাম। তবে একটা কথা না বলেও থাকা যায় না, বেনারসে তেওতাদের বংশধর পরবর্তীতে রাজা উপাধি গ্রহণ করে রাজবাড়ি নির্মাণ করে। সেই রাজবাড়ি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস এবং সত্যজিৎ রায়ের তৈরি চলচ্চিত্র ‘অপরাজিতা’র মাধ্যমে অমর হয়ে আছে শিল্প সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

বিভূতি বাবু ঘুরে এসে পড়ি নজরুলে। নজরুলের পদধূলিতে মুখরিত হয়েছিল এই তেওতার মাটি। যমুনার নদীর পাড়ে এই গ্রামে কি মায়া ছিল। মায়া তো ছিল বটে। না হয় কেন এ গ্রামে বার বার আসবেন দুলির কবি ভাই। ভাইজোনের প্রবর্চন সে তো চলে আসছে কত যুগ ধরে, এই প্রজন্মে এসেও হৃদয় পুড়ে। যমুনার পাড়ে সবুজ শ্যামল বৃক্ষের ছায়া ঘেরা এ গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছেন আমাদের কবি ভাই। গান, কবিতায় আসর জমিয়ে ফেলতেন কাজী’দা। পুরো গ্রাম যেন জেগে উঠতো নজরুলের আগমনে। কখনও বা কোন জ্যোৎসা রাতে জমিদার বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে চাঁদের আলোয় স্নান করে করুণ সুরে বাঁশি বাজিয়ে মুগ্ধ করতেন রাতজাগা পাখিদের, আর সেই সুরে কি মায়া ছিল জেগে উঠতো আশেপাশে দুই তিন ঘরের মানুষ। মুগ্ধ হইয়ে শুনতো নজরুলের বাঁশির সুর। সেই মুগ্ধ শ্রোতার তালিকায় যে ছিলেন প্রমিলা দেবী।

জমিদার কিরণশঙ্কর রায়ের আমন্ত্রণে নজরুল প্রথম এই তেওতা জমিদার বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন। আর সে সময় দেখা হয়েছিল প্রমিলা দেবীর সঙ্গে। জমিদারদের পাশের বাড়ির প্রতিবেশী বসন্তকুমারের মেয়ে দুলি (প্রমীলা) ছিলেন তখনকার জমিদার কিরণ শঙ্কর রায়ের স্নেহের পাত্র। বেড়াতে এসে আমাদের কাজী’দা প্রতি রাতেই বসাতেন গান-বাজনার জলসা। দুলি তখন চঞ্চল, চপল বালিকা। গানের ফাঁকে ফাঁকে পান খেতেন আমাদের কাজী নজরুল। আর সে পান দেবার মহান দ্বায়িত্ব ছিল দুলির উপর। এভাবে কি পানের লেনাদেনা করতে গিয়ে চোখাচোখি হয় দুজনার।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

চোখচোখি থেকে প্রেম, প্রেম থেকে প্রণয়। বিয়ের পর তেওতার জমিদার কিরণ শঙ্কর রায়ের আমন্ত্রণে আবার আসেন এই তেওতা গ্রামে। সেবার এখানে থেকেছিলেন প্রায় দুই সপ্তাহ। নজরুল আসবে আর গান-কবিতার জলসা বসবে না সে কি হয়। তখন দর্শকের আসনে জমিদার পরিবারের পাশেই বসতেন প্রমিলা দেবী। আর আমাদের কবি ভাই যখন ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ…’ অথবা, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেব খোঁপায় তারার ফুল।’ গান গাইতেন তখন রক্তিম লাল হত দুলির গাল। আহা এ রকম প্রেম কি কেউ করতে পেরেছে। আমাদের কবি ভাই এর কাছ থেকে প্রেমও শিখার আছে।

ভবঘুরে আমাদের কবি ভাই যেখানে গিয়েছেন সেখানেই তিনি কিছু না কিছু তার সৃষ্টিকর্মের ছাপ রেখে গেছেন। তেওতার স্মৃতি নিয়েও আছে তার অসংখ্য গান, কবিতা। এমন একটি সৃষ্টিকর্ম হচ্ছে শিশুতোষ কবিতা লিচু চোর। তেওতার জমিদারদের স্থানীয়রা বাবু বলেও ডাকতো। তাদের ছিল বিশাল পুকুর। আর সেই পুকুর ঘিরে ছিল তালগাছে সারি থাকায় বলা হত তালপুকুর। প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে এই তালপুকুর পাড়ের একটি লিচু গাছে লিচুর চুরি করতে গিয়ে একটি বালক সেই বাগানে মালি ও কুকুরের তাড়া খায়। আর সে সময় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ছিলেন আমাদের কাজী’দা। রচিত হয় তার বিখ্যাত কবিতা লিচু চোর।

তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: লেখক

‘বাবুদের তাল-পুকুরে হাবুদের ডাল-কুকুরে সে কি বাস করলে তাড়া, বলি থাম একটু দাড়া…
আমিও বাগিয়ে থাপড়দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল, দেখি এক ভিটরে শেয়াল!’

নজরুল এর পরেও কয়েক দফা এসেছেন এই গ্রামে। শেষ এসেছিলেন ১৯২২ সালে প্রমিলার সঙ্গে। সে বছর সেপ্টেম্বর মাসে নজরুলের লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশিত হয় ধূমকেতু পত্রিকায়। বৃটিশ বিরোধী এই কবিতাটিতে নজরুলের ক্ষুব্ধ মনের প্রকাশ পাওয়া যায় জ্বালাময়ী শব্দের অন্তরালে। হুলিয়া জারি করে ব্রিটিশ সরকার নজরুলের বিরুদ্ধে। প্রমিলা দেবীকে নিয়ে এই তেওতা গ্রামেই সে সময় আত্মগোপনে ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

ইতিহাসের পাতায় এতটা ডুবে ছিলাম দেখতে দেখতে কখন যে আরিচা ঘাটে বাস এসে পড়লো তা টের পেলাম না। এইবার ইতিহাস পর্ব শেষ করে শুরু হল আমার ভ্রমণ পর্ব।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:

https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top