fbpx

কেরানিগঞ্জের সারিঘাটে কায়াকিং: হয়ে যান একদিনের মাঝি

শুক্রবার মানে অফুরন্ত বেকার সময়। আর এই বেকার দিনের ভ্রমণ কথার নতুন সংযোজন ঢাকার ভিতরে নতুন কিছুর খোঁজে ছুটে চলা। সেই সেন্ট মার্টিন ট্রিপে দেখা হয়েছিল গোলু মোলু নাজিম রাব্বি ভাইয়ের সাথে। এরপর সময় বয়ে গেছে স্রোতের মত। তবে কিছ মানুষ যেন আমার জীবনে এসেছে স্থায়ী ভাবে জায়গা করতে নিয়ে। নাজিম রাব্বি ওরফে ভিলেন এমনই লোক। ঘুরতে আসবে পুরান ঢাকা। তার সাথে ঘুরবো আমরা কাশফুলের নরম ছোয়া পেতে কেরানিগঞ্জের সারিঘাট সাথে বুড়িগঙ্গার ক্যানেলে কায়াকিং এই সফরের এনেছিল ভিন্নতার সংযোজন।

সারিঘাটের ক্যানেলে বৈঠা মারে মাঝি। ছবি: লেখক

যথারীতি পুরান ঢাকা ঘুরে আমি আর নাজিম ভাই পোস্তগোলা প্রাইম হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি ঈসমাইল ভাই আসার অপেক্ষা। নামাজ শেষে ক্লান্ত ফুরফুরা মনে দূর থেকে দেখতে পেলাম ঈসমাইল ভাইয়ের ভিউ। আমার গল্পের সাথে যারা এত পথ পেড়িয়েছে তাদের তো ভিউ ফাইন্ডার ঈসমাইল ভাইয়ের কথা অজানা থাকার নয়। তিনজন পথিকের শুরু হল অদ্ভূত যাত্রা। পোস্তাগোলা ব্রিজ পার হয়ে আসলাম হাসনাবাদ। সিড়ি দিয়ে নেমে গেলাম নিচে এখানে সারিবদ্ধ রিক্সা অটো যেন জানাচ্ছে আহবান সারিঘাটে যাবে ক্রিচক্রযান।

সারিঘাট যাবার পথে রিক্সাফি

ছুটে চলছে পথিক। সাদা আকাশে মেঘ-সূর্যের লুকোচুরিতে শরৎ এর আহবান আজ। কোথাও শিমুল তুলার মত কোথাও তন্তুর মত ছুটে বেড়াচ্ছে মেঘেদের দল। তারই সাথে দুপুরের শেষ প্রান্তে এসে জানান দিচ্ছে একটা মিষ্টি বিকালের আহবান। শুভ্রতার ঋতু শরৎ, ময়ুর কণ্ঠী নীল নির্মল আকাশে ঋতু শরৎ আর সাথে রমণির কোমনীয় হাতে কাশফুলের নরম ছোয়া জানায় যান্ত্রিকতা ভুলার আহবান।

দানবীয় কাশফুলের মাঝে মানব বড় ক্ষুদ্র। ছবি: লেখক

সারিঘাট ঢোকার রাস্তায় ঢুকে ভুলে গেলাম আমরা সত্যিই ঢাকার কোন উপজেলায় আছি। এখানে নেই তো সেই যান্ত্রিকতার ছোয়া। ঠিক আধা ঘণ্টা আগে ধুলোবালি শব্দ দূষনের আহাজারির গুঞ্জন শুনে আজ প্রবেশ করলাম কোন ভুবনে। বিবর্ণ ঢাকায় এক রাশ সবুজের হাতছানি দিয়ে যেন বসে আছে সারিঘাটের রাস্তা। আহা প্রকৃতি শুনতে পেয়েছিলে কি সবুজের মিনতি। শীতল করে আমার চক্ষু যুগল। রাস্তার দুপাশে সারি সারি বৃক্ষরাজি পরম মমতায় যেন ডাকছে তার হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকদের। বাংলার এই চির সবুজ রূপই তো উঠে এসেছে কত কবি সাহিত্যিকদের লেখায়। 

কাশফুল হাতে নাজিম রাব্বি। ছবি: লেখক

রিক্সা আমাদের নামিয়ে দিল একেবারে সারিঘাটের ব্রিজের কাছে। বুড়িগঙ্গা নদীর আশেপাশে অনেক ছোটখাট ক্যানেল গড়ে উঠেছে যা সত্যিই আমাদের কাছে অপরিচিত। কেরানীগঞ্জের বিখ্যাত শুভাঢ্যা ক্যানেলের কথা শুনা যায় বেশ, তবে সারিঘাটের এই ক্যানেল নিয়ে ইদানিং পর্যটকদের চর্চার বিষয়ে উঠে এসেছে। একে তো গ্রাম বাংলার একটা ছিটেফোটা রূপ আবাসন প্রকল্পের মাঝ দিয়ে বুক চিড়ে চিৎকার করতে চায় আবার আর একদিকে কাশফুল আর বৈকালিক নৌ ভ্রমণ দিয়েছে নতুন আর্কষণ।

মেঘের ভেলা দেখা যায় দূরে, কাশফুল কোথায়? ছবি: লেখক
কাশফুল সব ঘাসফুল হয়ে গেছে। ছবি: লেখক

আমরা ক্যানেলের সামনে নেমে ঝটপট ছবি তুলে নিলাম। কি সচ্ছ ক্যানেলের জল। এর সাথে বুড়িগঙ্গা নদীর ইন্টার কানেক্টেড আছে। আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ছে জলে, মুগ্ধ পথিক দাঁড়িয়ে আছে স্থলে। ভেনিসের সাথে তুলনা করা ধৃষ্টতা দেখানো সুযোগ কই। কিন্তু ছোট ছোট ডিঙি নৌকা যখন ব্রিজের নিচে দিয়ে চলে যাচ্ছে তখন মনে হয় ভেনিসের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি আমাদের দুয়ারে আঘাত নাড়ছে। বুড়িগঙ্গার ক্যানেলগুলো এভাবেই আহবান করে ঢাকার মধ্যে এক মুঠো সবুজের নিঃশ্বাসে ডুবে যেতে৷ গাছ ছায়া দেয় শখের মৎস শিকারীদের, আকাশ ছাদ হয়ে থাকে ভ্রমণ পিপাসুদের৷ নৌকার পাটাতনে ছাতা নিয়ে ভালোবাসার উমে ডুবে থাকে কপোত-কপোতী। জলের পাতার মত জীবন।

বাংলার ভেনিস। ছবি: লেখক

জলের জীবনের স্বাদ তো কায়াকিং করার সময় আরও নেওয়া যাবে। এবার ডুবা যাক না হয় কাশফুলের ভুবনে। শরৎ বিদায় নিবে নিবে এমন অবস্থায় কাশফুলের সেই স্বর্গরাজ্যেও দেখা দেয় শূণ্যতার হানা। আকাশে সেই উদাসী মেঘের ভেলাও যেন জানান দিচ্ছে মন ভাল নেই শরৎ এর। তাই তো আকাশের ওই নীল দিগন্তে আলস মেঘের হাতছানির মাঝে যেন সূর্য মেতেছে কানামাছি খেলায়। আমাদের কাশফুলের একটু নিবিড় স্পর্শের আকুতি যেন ফেলতে পারিনি প্রকৃতি। সাদা ঢালির মত সাজিয়ে হয়তো স্বাগত জানায়নি। তবে দক্ষিণা বাতাসে চুপি চুপি জানিয়ে গেছে তার নির্যাস। আর সেই নির্যাসের ঘ্রাণেই যেন পাশে হেঁটে চলা তিন রমণিকে দেখলাম বাধনহারার মত দৌড় দিতে। আহা পুরুষ যেমন পাহাড়ে উঠলে হয়ে যায় বাধনহারা, নারীরাও কেন থাকবে পিছিয়ে তারা যেন কাশফুলের মাঝেই পান সেই বাধনহারার ডাক।

কায়াকফি। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

আমরা একটা ঢিবির মত জায়গা পেলাম। উপরে উঠে দেখতে পেলাম দূর দিগন্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাশফুল। পানের বরজে কাশফুলের বেশি দরকার হয়। তাই তো শরতের শেষে খালি হয়ে যাচ্ছে এই কাশফুলের স্বর্গরাজ্য। সূর্যের উত্তাপ ছড়িয়ে গেছে এর মাঝে। তার আলো তৈরি করছে কাশফুলের রাজ্যে সোনালী আমেজ। ডিএসএলআর এ ধরা পড়লো আমাদের ঈসমাইল ও রাব্বি ভাই ঠিক ক্ষুদ্র মানবের মত। দানবীয় কাশফুলের মাঝে যেন ক্ষুদ্র মানব হারিয়ে যাচ্ছে গভীর থেকে গভীরে। বিকাল প্রায় শেষ। এবার আমরা সবাই দৌড় দিলাম কায়াকিং পয়েন্টের দিকে।

আমায় নিবা মাঝি। ছবি: লেখক

বিধিবাম। সব কায়াক গিয়েছে বনে, আমরা যাই কোন সনে। নিজেদের নাম্বার দিয়ে হাঁটা দিলাম। কায়াক পয়েন্টের পাশেই পানের দোকান। শৌখিন মন কে তো বাধা দায়। বিশ টাকা দিয়ে একটা ফুল পান কিনে মুখে পুড়লাম। ঈসমাইল ভাই চায়ের দোকানে বসে ডুবে গেছে জগতের ভাবালুতায়। ভাবালুতার জগৎ থেকে ফিরে আবার চলে এলাম আমরা কায়াক পয়েন্টে। এবার একটি তিন সিটের কায়াক পেয়ে গেলাম। তিন জন বসতে পারলেও বৈঠা দেওয়া হয় দুইটা। উঠে বসলাম তিন ভুবন মাঝি। কায়াক চালানোর কৌশল খুবই সহজ, ডানে বামে নেওয়ার কৌশল রপ্ত করলেই হল। বৈঠা ডানে মারলে বামে, বামে মারলে ডানে যাবে। উলটা বাড়ি দিলে থেমে যাবে।

আহা আনন্দ। ছবি: লেখক
শেষ বিকালের সূর্য, যেন আগুনের গোলা। ছবি: লেখক

জলের রাজ্যে চলা শুরু করলো আমাদের কায়াক। চারদিকে কি শান্ত পরিবেশ। হাঁসের দল আমাদের পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে যাচ্ছে। দুপাশে সবুজের মাঝে হারাতে আজ নেই মানা। শাপলা ফুলগুলো মুখ বুজে আছে জলের তলে। প্রকৃতিও ডুবে আছে অদ্ভূত ছলে। আমরা সেই ব্রিজের নিচ দিয়ে কায়াক নিয়ে গেলাম যেন ভেনিসের প্রবেশ দ্বার দিয়ে আরেক জোনে ঢুকে গেলাম। কিছু শখেরর মৎস শিকারী আজ বড়শি নিয়ে বসেছে মাছ ধরতে। তার মাথার উপরে জেগে আছে ডুমুর গাছ। নিঝুম প্রকৃতির মাঝে নৈঃশব্দে চলে যায় আমাদের কায়াক, জলে সৃষ্টি হয় ছলাৎ ছলাৎ তরঙ্গ। কোথায় দিয়ে যায় সময় চলে গেল টেরই পেলাম না। মাঝখানে চরের মত জায়গায় কায়াক বেজে যাওয়া ছাড়া তেমন বাধা ছাড়াই পৌঁছে গেলাম যেখান থেকে হয়েছিল শুরু।

জলের মত আকাশ। ছবি: লেখক

কায়াক পর্ব শেষ হলেও। গল্পটা এখনও কিছুটা ছিটফোটা বাকি। এবার রিজার্ভ সিএনজি ঠিক করে পথিক যাচ্ছে জাজিরা বোট ঘাটের পথে। আমাদের শরীফ ভাই আসছেন হেরিটেজ ওয়াক শেষে। জাজিরা বোটঘাটের বারবিকিউ মাছের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে ইতিমধ্যে ভোজন রসিকদের দরবারে। আবার সেখানে যাওয়ার পথে গড়ে উঠেছে ছোট বড় অনেক রেস্টুরেন্ট। ঢাকার এত কাছে গ্রামীণ পরিবেশে এর মাঝে পরিবার নিয়ে একটু সময় কাটাতে তাই ছুটে আসে আশেপাশের এলাকাবাসি। আমরা সুরমা মাছের বারবিকিউ খেয়েছিলাম। তবে সেই গল্প না হয় আর একদিন হবে, এবার গল্প গুলোর বাড়ি যাবার পালা।

জাজিরা বোট বাজারের বারবিকিউ বড় লোভ জাগায়। ছবি: লেখক

গল্প শেষে গুরত্বপূর্ণ তথ্য না দিলে গল্পকারের পেটের ভাত হজম হচ্ছিলো না। তাই দিয়েই দিলাম।

যেভাবে যাবেন:
ঢাকার যেকোন জায়গা থেকে পোস্তগোলা এসে, সেখান থেকে সিএনজিতে ১০ টাকা দিয়ে ব্রিজ পার হয়ে হাসনাবাদ আসতে হবে। হাসনাবাদ থেকে অটোরিক্সা বা সিএনজিতে সরাসরি সারিঘাট কায়াকিং পয়েন্ট। অটোরিক্সাতে ভাড়া ৩০ টাকা। সিএনজি তে জন প্রতি ভাড়া ১০ টাকা।

খরচাপাতি:
কায়াকিংয়ের জন্য খরচ ৩০ মিনিটের জন্য জনপ্রতি ৭৫ টাকা। সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত কায়াকিং করা যায়।

এই সুরমা মাছের বারবিকিউ ভক্ষণ করেছিলাম তিনজন। ছবি: লেখক

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Back to top