fbpx

জল সবুজের উঠোন জিন্দা পার্ক

হাতে যদি থাকে একটি ছুটির দিন এবং ঘুরতে চান প্রিয়জন বা পরিবার নিয়ে ঢাকার আশেপাশে তাহলে ঘুরে আসতে পারেন সবুজের আবহে গড়া গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি রূপগঞ্জের জিন্দা পার্ক থেকে যা নারায়ণগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। ঢাকা শহরের মধ্যে অবসরে সময় কাটানো কিংবা পরিবার নিয়ে সারাদিন সময় কাটানোর মতো অনেক পার্ক থাকলেও নোংরামি, অশ্লীলতা ও বিভিন্ন কারণে পার্কগুলোতে রুচিশীল কারো উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়না৷ রাজধানীর নিত্য যানযট, হাক ডাক কোলাহল থেকে একটি দিনের জন্য মুক্তি পেতে চাইলে ঘুড়ে আসতে পারেন জিন্দা পার্ক থেকে৷

নিবিষ্ট চিত্তে পাঠরত পাঠক। ছবি: প্রলয় খান

‘পল্লীগ্রাম’ নাম শুনলেই আমাদের মানসপটে ভেসে উঠে একটি ছায়া সুনিবিড় সবুজ ছবি। যেখানে হাজারো পাখপাখালির ডাকাডাকিতে মুখরিত থাকে চারপাশ। চোখ খুললেই দেখতে পাই শিমুল, কদম কিংবা জারুল গাছের ছায়া। গাছে গাছে পাখিদের বাসা সেখানে তাদের অবাধ বিচরণ। পাশেই থাকে স্বচ্ছ পানির জলাধার যা সুপারি আর নারিকেল গাছে ঘেরা, শান বাধানো ঘাটে পা ভিজিয়ে চপলা চঞ্চলা কিশোরীর উচ্ছল চাহনী। চাঁদনী রাতে যেথায় উছলে পরে জোছনা। ঠিক এরকম একটি ছবি দেখতে পাওয়া যায় জিন্দা পার্কে। পার্কের নাম জিন্দা হওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে যে এখানের গাছপালা, প্রকৃতি, পুকুরের জল, পাখির কিচিরমিচির সবকিছুতেই সজীব প্রানবন্ত একটা ছবি ফুটে উঠে।

যেনো গ্রাম্য মেঠোপথের সাকো। ছবি: রুহুল ইসলাম

স্থাপত্যশৈলীর ব্যাবহারে মুন্সীয়ানার পরিচয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পার্কটিতে৷ পার্কটি কোন সরকারি উদ্যাগ বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ নয়। পার্কটি তৈরি হয়েছে এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং তাদের প্রাণান্ত অংশগ্রহনের মাধ্যমে। আশির দশকে মাত্র পাঁচজন স্কুল পড়ুয়া ছাত্রের উদ্যোগে সামান্য কিছু পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘অগ্রপথিক পল্লী সমিতি’।

কেন্দ্রীয় মসজিদ। ছবি: প্রলয় খান

তাদের স্বপ্ন আর শ্রমের ফসল আজকের জিন্দা পার্ক। সময়ের ব্যবধানে বেড়েছে সদস্য সংখ্যা, বেড়েছে পুঁজি।এ দীর্ঘ ৩৫ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ত্যাগের ফসল এই পার্কটি। এ রকম মহাউদ্দেশ্য, এত লোকের সক্রিয় অংশগ্রহন এবং ত্যাগ স্বীকারের উদাহারণ খুব কমই দেখা যায়।

এই পথ যদি না শেষ হয় ! ছবি: প্রলয় খান

অপস ক্যাবিনেট, অপস সংসদ এবং অপস কমিশন নামে পার্কটিতে ৩টি পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে। বর্তমানে জিন্দা গ্রামটিকে একটি আদর্শ গ্রামও বলা হয়৷ গ্রামের সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা ইত্যাদি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এই সমিতির মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এই অগ্রপথিক পল্লী সমিতির স্বপ্নদ্রষ্টা এবং আহ্বায়ক জনাব তোবারক হোসাইন কুসুম। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের আদলে সাজাতে চেয়েছিলেন নিজেদের গ্রামটি। নাম দিতে চেয়েছিলেন শান্তিকানন। পরে অবশ্য গ্রামের নামানুসারে জিন্দা গ্রাম থেকে জিন্দা পার্ক নামটি এসেছে।

জলে ভেসেই কাটিয়ে দেই জীবন। ছবি: রুহুল ইসলাম

জিন্দা পার্কের অবস্থান নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায়। প্রায় ১০০ বিঘা জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা জিন্দা পার্কে রয়েছে একটি কমিউনিটি স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক, নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী বিশিষ্ট একটি লাইব্রেরি, মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান, রয়েছে মহুয়া নামে একটি রেস্তোরা। ২৫০ প্রজাতির ১০ হাজারের বেশি গাছ-গাছালী আছে পার্কটিতে। গাছের এই সমারোহর পরিবেশকে করেছে শান্তিময় সবুজ, কলকাকলীতে মুখর করেছে অসংখ্য পাখীরা। শীতল আবেশ এনেছে ৫টি সুবিশাল জলাধার তাই গরম যতই হোক পার্কের পরিবেশ আপনাকে দেবে শান্তির ছোঁয়া।

এরকম বেশ কয়েকটি ট্রি হাউজ রয়েছে গাছে গাছে। ছবি: প্রলয় খান

পারিবারিক পিকনিকের জন্য জিন্দা পার্ক এখন বেশ পরিচিত জায়গা। কাঠের ব্রিজ পার হয়ে দিঘির মাঝামাঝি তৈরি করা বাঁশের টিরুমে বসে প্রিয়জনের সঙ্গে এক কাপ চা কিংবা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকার সময়গুলো দারুণ উপভোগ করবেন। লেকের মাঝে আরো কয়েকটি বসার জায়গা রয়েছে যেগুলোতে বাশের সাকো কিংবা প্লাস্টিকের ড্রাম্বের সাহায্যে ভাসমান সেতু করা হয়েছে।

সবুজের মিশেলে মুন্সীয়ানার সাথে তৈরি স্থাপনা। ছবি: প্রলয় খান

টিকেট মূল্য:
প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিজন ১০০ টাকা। ছোট বাচ্চাদের ৫০ টাকা। খাবার নিয়ে প্রবেশ করলে টিকিটের মুল্য হবে ১২৫ টাকা। এছাড়া লাইব্রেরিতে প্রবেশমুল্য ১০ টাকা এবং পুকুরে নৌকায় ঘুরে বেড়াতে পারেন, খরচ পড়বে ৩০ মিনিট ২০০ টাকা।

পানিতে ভাসমান সেতু। ছবি: মুন ভাই

পার্কিং খরচ:
পার্কিং খরচ গাড়ি ভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা।

জিন্দা পার্ক যাওয়ার উপায়:
ঢাকা থেকে জিন্দা পার্ক এর দূরত্ব ৩৭ কিলোমিটার। ঢাকার যেখানেই থাকুন না কেন প্রথমেই চলে যেতে হবে কুড়িল বিশ্বরোড। কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে থেকে বিআরটিসি বাস কাউন্টার থেকে কাঞ্চন ব্রিজের টিকিট কেটে নামতে হবে কাঞ্চন ব্রিজ। এ পর্যন্ত ভাড়া পড়বে ২৫ টাকা। কাঞ্চন ব্রিজ থেকে জিন্দা পার্ক বাইপাসে যেতে লেগুনা বা অটোতো ভাড়া নিবে ২০ টাকা। বাইপাসে নেমে নির্দেশনা অনুযায়ী হেঁটেই পৌঁছাতে পারবেন পার্কের গেট পর্যন্ত। কাঞ্চন ব্রিজ থেকে রিক্সায়ও যেতে পারবেন ভাড়া পড়বে ৮০-১০০ টাকা। রিক্সা করে সরাসরি পার্কের গেটে চলে যাওয়া যায়।

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর। ছবি: আশিক সারোয়ার

ফেরার সময় একইভাবে অটো বা রিক্সায় কাঞ্চন ব্রীজ চলে আস্তে হবে। সেখান থেকে বিআরটিসি বাসে কুড়িল বিশ্বরোড। কাঞ্চন ব্রিজ থেকে ১৫ মিনিট পর পর বাস পাবেন।
এছাড়া কুড়িল বিশ্বরোড থেকে সিএনজি নিয়েও সরাসরি পার্কে যাওয়া যায়। ভাড়া ৩০০-৪০০ টাকা।

খাবার দাবার:
খাওয়ার জন্য পার্ক এর ভিতর মহুয়া স্ন্যাকস অ্যান্ড মহুয়া ফুডস রেস্টুরেন্ট আছে। এখানে বিভিন্ন রকম দেশীয় খাবার পাওয়া যায়, যার প্যাকেজ মূল্য জনপ্রতি ২২০ থেকে ৬৭০ টাকা। পিকনিকের জন্যও এখানে খাবার অর্ডার দেয়া যায়। সেক্ষেত্রে নির্ধারিত দিনের অন্তত একদিন পূর্বে অর্ডার নিশ্চিত করতে হবে। যোগাযোগ: 01715025083, 01716260908

নারিকেল সুপারি গাছে ঘেরা জলাধার। ছবি: প্রলয় খান

এছাড়া জিন্দা পার্ক থেকে বের হয়ে পার্কের গেটের সামনের রাস্তায় অবস্থিত ‘নাহার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ খাওয়া দাওয়া সারতে পারেন। জনপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বেশ ভালো মানের লাঞ্চ করতে পারবেন। তবে পার্কে ঘুরা শেষে ৩০০ ফিট এসে নীলা বাজারেও খেতে পারেন। ৩০০ ফিটে হরেকরকম খাবারের দোকান আছে এবং খরচও কম হবে। তবে বাহির থেকে খাবার নিয়ে পার্কে যেতে চাইলে অতিরিক্ত ২৫ টাকা জন প্রতি দিতে হবে।

হারিয়ে যাবো আজ অরণ্যে। ছবি: মুন ভাই

থাকার ব্যবস্থা:
জিন্দা পার্ক এ ঘুরতে ঘুরতে যদি কখনও মনে হয় যে রাতে থেকে যেতে পারলে মন্দ হতো না, সেক্ষেত্রেও কোন চিন্তার কারণ নেই। কারণ রাতে থাকার জন্যে আছে মহুয়া গেস্ট হাউজ।

জিন্দা পার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ:
ওয়েবসাইট: http://zindapark.com
ই-মেইল: [email protected]
ফোন: ০১৭১৬২৬০৯০৮, ০১৭১৫০২৫০৮৩, ০১৮১৬০৭০৩৭৭

ফিচার ছবিঃ রুহুল ইসলাম। 

ভ্রমণগুরু তে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট পড়তে চাইলে এই লিংকে ক্লিক করুন।    

Back to top