বট-পাকুড়ের সবুজ সংসারে

ধামরাই… ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের একটি উপজেলা। ধামরাই বললে প্রথমেই মনে পড়ে রথযাত্রা। হ্যাঁ, ধামরাইয়ের রথযাত্রা খুব বিখ্যাত। আর কুমোরপল্লীর কারণেও এই উপজেলার বেশ সুখ্যাতি আছে। ঘোরাঘুরি সূত্রে গিয়েছিলাম মাস কয়েক আগে। আজকে শোনাবো সেখানের দুটো গাছের গল্প। দুটো গাছ না বলে, এক দম্পতির গল্পই বলা যায়। ৫০০ বছর বয়সী দম্পতি গাছ। 

গাছের বিস্তৃতি। ছবি: তামান্না আজমী

আমরা গুলিস্তান থেকে বাসে উঠলাম। গুলিস্তান বা গাবতলী যেকোন জায়গা থেকেই ধামরাইয়ের বাস পাওয়া যায়। ডি-লিংক, শুভযাত্রা সহ আরো কিছু আছে। ধামরাইয়ের ঢুলিভিটা বাসস্ট্যান্ডে নেমে প্রথমে ধানতারা বাজারে চলে গেলাম ভ্যানে করে। কড়া রোদ অথবা ঝুম বৃষ্টি যাই হোক, ঢাকার বাইরে গেলে এবং সেখানে ভ্যান পাওয়া গেলে আমাদের এই বাহনটায় উঠতেই হবে৷ বিশেষ করে তেহজীব খুব পছন্দ করে। ধানতারা বাজারে গরম গরম পরোটা, ডিম ভাজা আর চা দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। বাজার থেকেই আবার অটো বা ভ্যান বা রিকশায় করে চলে যাওয়া যায় ষাইট্টা গ্রামে। বললেই হয়, বটগাছ দেখতে যাবো। 

সকালের নাস্তা। ছবি: তামান্না আজমী
চায়ে গরম! ছবি: তামান্না আজমী
রঙিন ভ্যানে রঙিন হাসি। ছবি: তামান্না আজমী

ধামরাইয়ের যাদবপুর ইউনিয়নের ষাইট্টা গ্রামে রাস্তার পাশেই কালের সাক্ষী হয়ে একটি বটগাছ এবং একটি পাকুড় গাছ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। এই গাছদুটোকে ঘিরে এখন ভ্রমণপিয়াসুদের কৌতুহলের শেষ নেই। প্রথম কারণ, এর মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এবং রূপ। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, গাছ দুটোর পেছনের চমৎকার মিথ। ৫০০ বছরের এই বট ও পাকুড় গাছকে স্থানীয়রা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করেন। এখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বটগাছটির নিচে কালীমন্দির নির্মাণ করে সেখানে বিভিন্ন পূজা-অর্চনা, বিজয়া বা বাসন্তী মেলাসহ নানারকম অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকেন।

গাছের একাংশ। ছবি: তামান্না আজমী

গাছটি প্রায় ৫ বিঘা জমির ওপর এর ডালপালা ও শিকড়ের প্রভাব বিস্তার করেছে, কারণ এই গাছের ডালপালা কেউ কাটার সাহস করেন না। কারণ অনুসন্ধানে জানা গেল এই দম্পতির বিয়ে-সংসার নিয়ে যাবতীয় ইতিহাস। ষাইট্টা গ্রামের দেবীদাস বংশের পূর্বপুরুষ তাদের জমির ওপর এই বট-পাকুড় গাছটি রোপণ করেছিলেন। বটগাছ নারী আর পাকুড় গাছ পুরুষ। এমন ধর্মবিশ্বাসে দাস বংশের পূর্বপুরুষরা ঢাকঢোল, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিয়ের উপকরণসহ ব্রাহ্মণ দ্বারা বৈদিকমন্ত্র পাঠ করে বট ও পাকুড় গাছের বিয়ে সম্পন্ন করেন এবং অনেক লোকের খাবারের আয়োজন করেছিলেন।

সারি বাঁধা গাছের অংশ। ছবি: তামান্না আজমী

এভাবেই বট ও পাকুড় গাছ দুটি স্বামী-স্ত্রীরূপে সুখময় পরিবেশে অবস্থান করে আসছে প্রায় ৫০০ বছর ধরে। আর এতো বছরে তারা এতোটাই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গিয়েছে যে এখন আলাদা করে চেনাই যায় না কোনটা বট আর কোনটা পাকুড়! কি রোমান্টিক!

এভাবেই জড়িয়ে থাক! ছবি: তামান্না আজমী

স্থানীয়দের মতে, রাতের বেলা এই গাছের নিচে ছোট ছোট শিশুরা নাচগান করে। অনেকেই নাকি দেখেছেন। রাতে তাই এর পাশ দিয়ে ভয়ে কেউ যাতায়াত করেন না। আর কথিত আছে, কেউ এই গাছের ডালপালা কাটলে নাকি সে খুব অসুস্থ হয়ে যায় এবং পরে মারা যায়। তাই নিদেনপক্ষে কেউ এর ডালও ভাঙে না। 

মা, দোল খাই? ছবি: তামান্না আজমী
যতোদূর চোখ যায়, গাছ দেখি। ছবি: তামান্না আজমী

আমি তো ভ্যান থেকে নেমে গাছটার কাছে যাচ্ছি আর অবাক হচ্ছি। মনে হচ্ছিলো, একটা তোরণ দিয়ে ঢুকে পড়লাম সবুজ একটা ঘরের ভেতর। যে ঘরে মাথার উপর কংক্রিটের সিলিং নেই। আছে টিয়ে সবুজ, গাঢ় সবুজ, কালচে সবুজ পাতায় ছাওয়া একটা ছাদ। উপরে সবুজ রেখে নিচে শীতলপাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ার জন্যেই এই জায়গাটা। অথবা হ্যামকে ঝুলে সবুজের ফাঁকে এক টুকরো আকাশের নীল খুঁজে বের করার জন্যেও হতে পারে আদর্শ। গাছের ডালে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে দোল খাওয়া কিংবা ডালগুলোর ফাঁকে ফাঁকে লুকোচুরি খেলার জন্যেও অবশ্যই দর্শনীয় হতে পারে জায়গাটা। 

তেহজীব এত্তো বড় গাছ দেখে খুশি। ছবি: তামান্না আজমী
ঠিক যেন ছবির ফ্রেম! ছবি: তামান্না আজমী
আমরা বনফুল গো! ছবি: তামান্না আজমী

এখানে আসলেই গ্রামের প্রকৃতির নির্মল শান্ত একটা পরিবেশ পাওয়া যাবে। সত্যিকারের গ্রামের রূপ চোখে পড়বে পুরো যাদবপুর ইউনিয়নে। ষাইট্টা গ্রামটা একটু বেশিই সবুজ। গ্রামে ঢুকতে পিচ ঢালা পাকা রাস্তার দুই পাশে সবুজ ধান গাছে বাতাস যখন দোল দিচ্ছিলো, কি সুন্দরই না লাগছিল! আর দেখলাম প্রচুর লেবু বাগান। ধামরাই কিন্তু লেবুর জন্যেও বিখ্যাত। 

পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি। ছবি: তামান্না আজমী
বিস্তৃত ধানক্ষেত চোখে পড়ে। ছবি: মোস্তাক হোসেন
হায় হায়রে, দিন যায়রে, করে আঁধার এ ভুবন।
ছবি: তামান্না আজমী

আমাদের সাথে বৃষ্টির সম্পর্কটা বরাবরই ভালো। সেদিনও বৃষ্টি হয়েছিল। এক টুকরো সবুজ মেঘলা দিনের পরে আরো অনেক সবুজ হয়ে গিয়েছিল। 

আমার অন্যান্য ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন নিচের লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বিঃদ্রঃ গাছের গায়ে কাটাকুটি করে নাম-পরিচয় লেখাটা অনুচিত। গাছের ডাল ভেঙে নায়কোচিত বীরত্ব দেখানো অন্যায়। ঘুরতে যেয়ে জায়গা নোংরা করা থেকে বিরত থাকুন। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।  

ফিচার ছবি: তামান্না আজমী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top