in

শেকড় সন্ধানীর সাথে নিকলী হাওরে একদিন

অনেক দিন ধরেই প্ল্যান হচ্ছিলো আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানী থেকে একটি ট্যুরের আয়োজন করা। কোথায় করা যায় সে নিয়ে যখন দ্বিধা ও দ্বন্দ। তখন মনের মানসপটে কোথা থেকে যেন নিকলীর ছবি ভেসে উঠলো। সবুজ শ্যামলা অপরূপ এ বাংলার প্রতিটা কোণায় লুকিয়ে আছে গোপন সৌন্দর্য্য। তেমনেই এক সৌন্দর্য্যের নাম নিকলি হাওর। এই ভরা বর্ষায় নিকলীর বুকে নৌকা ভাসালে মনে হবে কূল নাই কিনার নাই চারদিকে থই থই পানি। তারই মাঝে ছুটে চলছে যেন কোন স্বপ্ন যাত্রা। হাওরের এই মায়াবী রূপ উপভোগ করার সময় তো এখনই৷ তো যেই ভাবা সেই কাজ। শরীফ, ঈসমাইল ভাইকে সঙ্গে নিয়ে করে ফেললাম খসড়া প্ল্যান।

হাওরের মাঝে পাটের চাষ। ছবি: লেখক

সেই প্ল্যান অনুযায়ী বেশ ভাল রেসপন্সও পাওয়া গেল। তবে এবার আমাদের টার্গেট ছিল ঈসমাইল ভাইয়ের মামার কেনা নতুন গাড়ি আমাদের ইভেন্টের কাজে লাগানো। তাই ছোট হাসিব, মামা, শিমুল, রাজিব, চান মিয়াসহ আমরা তিনজন অ্যাডমিন মোট ৮ জনের একটি গ্রুপ দাড়া হয়ে গেল। আর এই হাওর সফরে আমাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী হবে টয়েটো এভেঞ্জা সেভেন সিটার গাড়ি।  

নিকলীর সেই বেড়িবাধ। ছবি: লেখক

যথারীতি ইভেন্টের দিন সকালে সবাই হাজির হলাম। আমাদের গাড়ি রওনা হল চানখারপুল থেকে। এইবার ট্যুরের সবচেয়ে বড় আর্কষণ ঈসমাইল ভাইয়ের মামা আর তার মামাতো ভাই হাসিব। চলছে আমাদের গাড়ি সকালে সোনা রোদে। সবাই হাল্কা পাতলা খুনসুটিতে ব্যস্ত। এভাবে যে সময় কোথায় গড়িয়ে গেল টের পেলাম না। টের পেলাম যখন ভৈরবে যাত্রা বিরতি নিল। ততক্ষণে পেটে ছুছো দৌড়াচ্ছে। বলা বাহুল্য আমার সকালে নাস্তা করে বের হয়নি। তো যাত্রা বিরতির ফাঁকে আমাদের ড্রাইভার গাড়িতে গ্যাস ভরে নিল। আর আমরা পেট পূজোর জন্য হোটেল জান্নাতে ঢুকলাম। বেশ পরিপাটি সুন্দর ডেকারেশন যে কোন গ্রাহককে আকৃষ্ট করতে বাধ্য।

জলের জীবন। ছবি: লেখক

খাওয়ার পর্ব শেষে আবার গাড়ি চলছে বাংলার পথে। আজকে শুক্রবার। আমরা কিশোরগঞ্জ শহর অতিক্রম করার পর নামাজ পড়ার তাগিদ অনুভব করলাম। তবে মামা আমার রঙ্গিলা, বাধ সাধিলো। এত সুন্দর গ্রামের পথে হারিয়ে যেতে নেই মানা। গাড়ির এসি অফ করে জানলা খুলে দিলাম। ফুসফুসে প্রবেশ করছে প্রকৃতির ঝিরি ঝিরি হাওয়া। চারদিকে সবুজ আর মাঝে আঁকাবাঁকা রাস্তা। বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছিলাম। এখানে বৃষ্টি হয়েছে সোদা মাটির গন্ধে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। হারিয়ে গিয়েও শুনছি রাজিব, শিমুল, শরীফ ভাইয়ের মধ্যে সিরিয়াস রাজনৈতিক আলাপ হচ্ছে। আমরা পুলেরঘাটের আগে এক জায়গায় যাত্রা বিরতি দিয়ে নামাজটা সেরে নিলাম।

উত্তাল হাওরে ভাসিয়েছি জলের যান। ছবি: লেখক

নামাজ পর্ব সেরে আবার হল পথের শুরু। ঈসমাইল ভাইকে কবি বানানোর ব্যর্থ চেস্টা ব্যস্ত শরীফ ভাই। মাঝখানে আমি পিঞ্চ কাটতে ভুললাম না। চান মিয়ার সাথে খুনসুটি এইটা সব ট্যুরেই কমন ব্যাপার। পুলেরঘাট পার করার পর ডানে মোড়ে নিয়ে যেন অবাক ভুবনে প্রবেশ করলাম। চারদিকে শুধু পানি আর পানি, বর্ষার থই থই পানি। চোখের সামনে ধরা দিল নিকলী হাওর। কূল নাই কিনার নাই চারদিকে জল। মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সুদীর্ঘ বেড়িবাধ দিয়ে যাচ্ছে আমাদের হাওয়া পাওয়া যন্ত্র দানব। আহা কি অপূর্ব দৃশ্য, এক পাশে মুহুর্মুহু আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউ, আর সেই উত্তাল গর্জন পথিকের হারিয়ে যেতে নেই মানা। অপর পাশে শান্ত জলাধারার কুল কুল ধবনির মাঝে ছুটে যাচ্ছে হাঁসের দল। যেন কোন উদাসী বাউল তার একতারায় উঠিয়েছে ঘুম ভাঙানিয়া গান।

কে ভাসে ওই পাল তোলা নৌকায়। ছবি: লেখক

পেটেও ইতিমধ্যে ছুছো দৌড়াচ্ছে। তবে মামার পারফরমেন্সে আমরা মুগ্ধ। বেরিবাধের রাস্তার মাঝেই পড়েছে বেশ কয়েকটা ট্রলার ঘাট। এই রকম কম ভীড়য়ালা এক ট্রলার ঘাটে ছাতির চর যাবার দাম দস্তুর করার পর ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হল। আমরা জল খাবার পর্ব সেরে আসছি এই ট্রলার ঘাটে। মাঝপথে হোটেল পড়েছিল বৈকি তবে মামুর দেহে আজ উদাসি বাউল ভর করেছে বিধায় স্কিপ করে সামনের দিকে আগাতে লাগলাম। আহা এই মনোমুগ্ধকর যাত্রার কি শেষ নেই। আমরা গুণগুণ করে গাইতে ইচ্ছা হয়, ‘এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হবে তুমি বলতো।’ ওই তো দেখা যাচ্ছে বাবলা গাছ। যুবতী বাবলার পাতায় পাতায় শিষকাটা দখিনা বাতাস প্রশান্ত করে দেহ মন।

টারজান এসেছে ছাতির চরে। ছবি: লেখক

বেড়িবাধের শেষ মাথায় আরও ভাল ভাতের হোটেল পাবে ভেবে ক্ষুধাকে আগুন চাপা দিয়েছিলাম। যখন শেষ মাথায় গিয়ে মানুষের ভীড়ে অসহায় ভাবে খুঁজে ছিলাম ভাতের হোটেল তখনই একজন বললো খেতে হলে আবার পিছে ফেলা গাঁয়ে ফিরত যেতে হবে। ধিকি ধিকি ক্ষুধার আগুন জ্বলে। কিছু করার নেই গাড়ি ব্যাকে নিয়ে আবার ছুটলো আগের গন্তব্যে। আগের বার এসে হুড়ামস্তি ভীড় দেখলেও এবার হোটেল বেশ খালি লাগছে। ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়: পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি’ সুকান্ত বলে গেছেন।

আহা ছাতির চর। ছবি: লেখক

তবে এখানে প্রচুর মাছের অপসন দেখে সবাই খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেলাম। তাদের দাবি অনুযায়ী বেশির ভাগই হাওর এবং ভৈরব নদীর মাছ। যাই হোক আমি হাঁসের মাংস দিয়ে উদরপূর্তি করলাম। বাকিরা তাদের মত চিংড়ি, বাইন, পাংগাস মাছ দিয়ে খাওয়া সারলো। হাওরে এসে হাঁস খেয়ে হাসফাস লাগছে গরমে। গরম যখন চরম তখন তো অকূল দরিয়ায় নাও বাইতে হয়। খাওয়া পর্ব শেষে চলে এলাম ট্রলার ঘাটে। শুরু হল এক দূদান্ত যাত্রার।

সেলফি হবে না বন্ধু। ছবি: শরিফ জামান

জলের রাশি কেটে কেটে যাচ্ছে আমাদের ট্রলার। চারপাশে কূল নাই কিনার নাই। বড় বড় ঢেউগুলো যেন আমাদের গ্রাস করার জন্য ছুটে আসছে। এর মধ্যেই কিছু সপ্নবিলাসী মানুষ ঘর বেধেছে হাওরের বুকে। যেন জলেই বেধেছে বাস জলেশ্বরী। শীতকালে যে হাওড় শুকিয়ে যায়, বর্ষা আসলে বহে তাতে কুল কুল জলরাশি৷ শুধু কি পানির ঢেউ, দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি যেন মনে করিয়ে দেয় আহা এত অন্য রকম কেউ৷ দ্বীপের মত গ্রামগুলো ভেসে থাকে জলে৷ যেন জলের জীবন। বিশাল হাওর তার থেকে বিশাল যেন আকাশ। আর সে আকাশের ছায়া পড়ে জলে। আহা কি আনন্দ তোলে মনে। কখন সে নীল, আবার কখন যে সবুজ, কখনও সে ঘোলা। আহা প্রকৃতির রঙে ছবি তোলা।

সেই উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে চান মিয়া হেড়ে গলায় নীল দরিয়া গাওয়া শুরু করলো। সত্যিই তো দরিয়ার মতই বড় এই হাওড়। যতই দেখছি মুগ্ধ হচ্ছি। ওই তো দূরে দেখা যাচ্ছে ছাতির চর। পাস দিয়ে চলে যায় পাল তোলা নৌকা। নৌকার পাল উড়িয়ে মাছ ধরছে রঙিলা মাঝি আর আকাশে উড়ে যায় সেই ভুবন চিল, আহা তারই মাঝে জলের রাশি রাশি কেটে যায় জলেশ্বরী। কত যে মায়া, হাওড়ের পানিতে পড়ে পথিকের ছায়া।

বিদায় বেলায়। ছবি: লেখক

আমাদের ট্রলার ছাতির চর এসে পড়লো। ছাতির চরে এসে অনুভবে ফিরে এল জলাবনের জলমগ্ন গান, যেন হাওর ফিরে পেয়েছে তার প্রাণ। সাঁতার পারি না সবাই লাইফ জ্যাকেট পরে হাওরের পানিতে দিলাম ডুব। ঝাপাঝাপির করলাম সবাই। বাদ গেল না আমাদের মামাও। ছোট হাসিবের বয়সের কারণে নামতে দিলাম না। চান মিয়া, ঈসমাইল, রাজু ভাইরা যেন ছোট্ট শিশু হয়ে গেছে আজ। তাই কি কবি বলেছিল বয়স একটা সংখ্যা, হুম সে তো সংখ্যাই বটে। তাই আমিও হাত পা ছিড়ে দিলাম ভেসে রইলাম জলে। ভেসে ভেসে ওই সবুজের ফাক দিয়ে এক চিলতে আকাশটাকে দেখছি, যেন সতীনাথ বন্দ্যো শুনাছে আমায় আকাশের গায়ে টক টক গন্ধের কথা। সবুজের মাঝে আমি অবুঝ। এবার যে ভাই ফেরার পালা।

এসে পড়লাম গন্তব্যে। ছবি: লেখক

এবার ট্রলার চলছে উদাসী গন্তব্যের পথে। বিষন্ন আকাশ, পেঁজা তুলার মত ভাসছে মেঘ, নিচে পানি আর মাঝে জলের উপর ভেসে থাকা গ্রাম। চমৎকার একটা গ্রামীণ জীবনের গল্প শুনাতেই যেন বসে রয়েছে নিকলী। তাই কি কবি বলেছেন চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়। আবার ফিরে আসবো এই হাওরের বুকে। ততদিন না হয় স্মৃতি হিসাবে জমা থাক তুমি প্রিয় নিকলী।

Roots Finders – শেকড় সন্ধানী তিনজন সপ্নবিলাসী মানুষের ভ্রমণ গ্রুপ। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

উড়ে যায় ভুবন চিল। ছবি: লেখক

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সীতাকুণ্ড ডায়েরি: চন্দ্রনাথ পাহাড় ও ঝরঝরি ট্রেইল

ব্যাঙ ঝিরি ঝর্ণার সন্ধানে: ভজভটে যাত্রা