ঐতিহ্যের সন্ধানে নরসিংদীতে একদিন: ভাই গিরিশচন্দ্রের বাড়ি

সময়কে বেধে রাখা যায় না কোন ঘড়িতে। সে তো চলে যায় বহমান নদীর মত। সময়ের স্রোতে রেখে যায় স্মৃতি। যা অনেক দিন পর রোমান্থন করে মানুষ আনন্দ পায়। সে রকম কিছু স্মৃতি খুড়তে কি ফিরে গেলাম দেড় বছর আগের কোন দিনে? সে সময় ছিল অস্থির সময়। তখন জুয়েল রানা হয়নি টিওবির মডারেটর, তার বয়স ছিল উনিশ কুড়ি বোধহয়। মনের বয়স তো শূণ্যও হতে পারে তাই কি নয়। গোপনে গোপনে কবুল বলে প্রথম বিয়ে সারা তার। সে সব অস্থির দিনে আমায় বড় ভালোবাসতো তিনি। এখন তৃতীয় বার কবুল বলার পর হ্যাম আপকে হ্যায় কৌন।

শিশুটি কি ভাবছিল। ছবি: লেখক

সে যাই হক জীবনে মিষ্টি মধু খুনসুটি না থাকলে তা পানসে হয়ে যায়। সে পানসে ভাব দূর করার জন্য দুই ভাই ২০১৭ সালের মার্চের কোন এক সকালে রওনা হলাম লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি দেখার উদ্দ্যেশে। বাসে বসে বাদাম চিবুতে চিবুতে বোধ হয় শুনিয়ে ছিলাম আমার ছ্যাকা খেতে বেকা হয়ে যাওয়ার গদ্য। আর বাস সাই সাই বেগে যাচ্ছিলো পাঁচদোনার উদ্দ্যেশে। লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি নিয়ে বেশি তথ্য তখন অন লাইনে পাওয়া যেত না। আর এক কিউট ত-মাল ভাইয়ার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে আমাদের পথ চলা। মালের গল্প না হয় আর একদিন শুনাবো। এবার ভূমিকা শেষে গল্প শুরু করা যাক।

কাচার মাঝে পাকা। ছবি: লেখক

আমাদের বাস পাচদোনায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেল তার গন্তব্যে। আমরাও আড়মোড়া ভেঙ্গে ধুমায়িত চা পানের মাঝে আমাদের প্রথম গন্তব্য ঠিক করে ফেললাম। ডাঙ্গায় লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি যাবার আগে আমরা ভাই গিরিশচন্দ্রের বাড়ি ঢু মেরে যাব। ভাই গিরিশচন্দ্র ভাই কিভাবে হলেন। তিনি ছিলেন কুরআন শরীফের বাংলা অনুবাদক। তাই মুসলিম হিন্দু দুই সমাজেই তার সমান মর্যাদা ছিল। সে সময় মুসলিম সমাজে একটা ভ্রান্ত ধারনা ছিল মূল আরবি ভাষা থেকে কুরআনের অনুবাদ হলে গ্রন্থটির পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হবে। সে জুজু বুড়ির ভয় কাটিয়ে ভাই গিরিশচন্দ্র অনুবাদিত করেন কুরআন শরীফ।

বাশের যেন ফোকাস। ছবি: লেখক

যদিও এ বাড়ি শেষ বার যখন গিয়েছিলাম ভঙ্গুর অবস্থা ছিল। সেই ২০১৫ সালের কথা হবে। দুই বছরে এমন কি পরিবর্তন হবে। বাড়ির ভিতর ঢুকে এর অমূল পরিবর্তন দেখে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। সংস্কারের ফলে যেন ইতিহাসের পাতা ফুড়ে বের হয়ে এসেছে ভাই গিরিশচন্দ্রের বাড়ি। ইন্ডিয়ান হাই কমিশনের অর্থায়নে ঐতিহ্য অন্বেষণের সুফি স্যারদের তত্ত্বাবধায়নে এ বাড়ি ফিরে পেয়েছে তার আদি রূপ।  

চমৎকার পূর্ণ নিমার্ণ। নতুন এ বাড়িটি সাজানো হয়েছে ব্রিটিশ আমলের কাঠ ও আসবাবপত্র দিয়ে। মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে সংস্কার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ইট, চুন, সুড়কি ও যশোরের টালি। উয়ারি বটেশ্বরে তৈরি বিশেষ ধরনের ইটও পরিলক্ষিত করা যাবে এই বাড়িতে। ফিনিক্স পাখির মত যেন পূণর্জন্ম হয়েছে এ বাড়িটির। তবে আশাহত হলাম এপ্রিল মাসে জাদুঘর হিসাবে শুভ উদ্ধোধন করা হবে আর আজ মার্চের কোন একদিনে এসে পড়েছে দুই ঐতিহ্য অন্বেষণকারী।

যেন লুকিয়ে আছো তুমি বৃক্ষের ছায়াতলে। ছবি: লেখক

ঘুরে ঘুরে দেখছি ভাই গিরিশচন্দ্রের বাড়ি। তবে একটা তথ্য অনেকের অজানা রয়ে গেছে হয়তো উনি একধারে কিছু হাদিস গ্রন্থ ও অনুবাদিত করেছে। অবাক করা ব্যাপার তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য। সমাজের মনন ও দর্শনকেই নিজের ধর্ম হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ব্রাহ্ম সমাজের ভিত এক ঈশ্বরের উপর অর্পিত। প্রথাগত ধর্মীয় চর্চার ব্যারিয়ার থেকে বের হয়ে সে যুগে ব্রাহ্ম সমাজ তৈরি করেছিল নতুন মাইল ফলক। মানুষের মাঝে ভেদাভেদ, জাতপাতের শিকল ভাঙ্গতে ব্রাহ্ম সমাজের দরকার ছিল সে সময়। সেইটি করতে গিয়ে কম সমলোচনার স্বীকার হয়নি তৎকালীন জ্ঞানী গুণি ব্যক্তিগণ। যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে এত বিতর্ক তিনিও ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিনিধি।

প্যাচানো সিড়ি। ছবি: লেখক

ব্রাহ্ম সমাজ ঈশ্বরকে দেখেছে এক, ঐক্য ও সর্বব্যাপী হিসাবে। সেই মতবাদে বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে প্রতিটি ধর্মের সাধারণ সত্যের অন্বেষণে তৎকালীন সময় ভাই গিরিশচন্দ্র ইসলাম, গৌর গোবিন্দ রায় হিন্দু, মহেন্দ্রনাথ বোস শিখ, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার খ্রিস্টান এবং অঘোর নাথ গুপ্ত বৌদ্ধ ধর্মের পঠন পাঠনের দ্বায়িত্ব পায়। সেই কাজের অংশ হিসাবেই ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ইসলাম নিয়ে গবেষনা করেছেন। তাই তো বলতে হয় কৃত্তিমানের মৃত্যু নেই।

সেই ২০১৫ সালের অবস্থা। ছবি: লেখক

ভাই গিরিশচন্দ্রের বাড়িতে কিছুটা সময় কাটিয়ে এবার ছুটে চলার পালা নতুন গন্তব্যে। যেতে নাহি চাই, তবুও যে চলে যেতে হয়। বাহিরে ফুল ফুটেছে ডাকছে কোকিল পাখি। কুহু কুহু ডাকে বসন্তের আমেজ চারদিকে। তাই কি কবি দিজেন্দ্রলাল রায় বলে গেছেন,

আয়রে বসন্ত তোর ও
কিরণ মাখা পাখা তুলে
নিয়ে আয় তোর কোকিল পাখির
গানের পাতা গানের ফুলে।

যখন ধ্বংসস্তুপ ছিল। ছবি: লেখক

ভাই গিরিশচন্দ্রের বাড়ি থেকে বের হবার পর এপারে আসলাম চা খাবার জন্য। আজ এত বছর পরেও স্মৃতিগুলো কত মলিন। পাচদোনা মোড়ে মুক্তিযুদ্ধের এক বীর শহীদের কবর দেখেছিলাম। এত বছর পর নাম না মনে পড়লেও তার কবরের সামগ্রিক অবস্থা দেখে আমরা দুজনেই মর্মাহত হয়েছিলাম। জানি না এখন কেমন আছে সেই শহীদের কবর। প্রতারক স্মৃতি কে বিদায় জানিয়ে আমরা ছুটছি এবার নরসিংদী জেলার সদ্য আবিষ্কৃত ঐতিহ্য লক্ষণ সাহার বাড়ির উদ্দ্যেশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top